আজ তিনি চলে এসেছিলেন ছাদে স্নান করবেন বলে। শীতকাল হলে আলাদা কথা। তখন। উনি ক্কচিৎ কদাচিৎ স্নান করেন। জল গরম করিয়ে নেন। তবে এটা তো গরম কাল। এখন স্নান করায় কোনো দোষ নেই কষ্টও নেই।
ছাদে একটা জলের কল আছে যেখানে বাসনপত্তর মাজা ধোয়াও হয়। স্নান করার শখ হলে উনি এখানে চলে আসেন। বাল্যবন্ধুর স্কুল, উনি যেখানে যা ইচ্ছা তা করবেন বাধা কে দেবে? ওনার রোজ দুতিন ঘন্টা ফোন করা নিয়ে টিচার ইনচার্জ একদিন কিছু একটু বলেছিলেন। উনি তাকে এমন ঝাড় দেন যে পালাতে পারলে বাঁচেন।
উনি যে ঘরে থাকেন গ্রাম দেশের কয়েকটা দরিদ্র কিন্তু মেধাবি ছেলে থাকে। বাবা মায়ের সে ক্ষমতা ছিল না পড়াবে। বড় সাহেবের হাতে পায়ে ধরে ব্যবস্থা করেছে এখানে থাকা খাওয়া পড়ার। তারা কলকাতার নানান কলেজে পড়ে। হয়ত তারা রাত জেগে পরীক্ষার পড়া তৈরি করছে তখনই বাল্যবন্ধুর শখ হল একটু দেবব্রত বিশ্বাসের রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনবেন। টেপ রেকর্ডার ক্যাসেট সব আছে ওনার। ব্যস ফুল ভলিউমে চালিয়ে দিলেন–আকাশ ভরা সূর্য তারা…। তখন পড়ুয়া ছেলেদের সামনে দুটো পথ খোলা থাকে–হয় বই বন্ধ করে গান শোনা, নয়তো বই বগলে নিয়ে চলে যাওয়া অন্য কোনোখানে। নালিশ করবে। কার কাছে করবে নালিশ? টিচার ইনচার্জ?
সে একদিন এমন ঝাড় খেয়েছে যে নিজের নালিশ নিয়ে বড় সাহেবের কাছে ছুটছে। সেদিন বেশ সাবান টাবান দিয়ে ছাদে বসে চান করেন সারেন বাবু। তারপর লুঙ্গি গামছা আন্ডারওয়ার সব গামলায় ফেলে হেলে দুলে নেমে যান নীচে, নিজেদের ঘরে। যাবার আগে আমাকে হুকুম দিয়ে যান–ওগুলো ভালো করে ধুয়ে ছাদে মেলে দিও। শুকিয়ে গেলে আমার ঘরে দিয়ে এসো।
কথাটা শুনি কিন্তু মাথায় থাকে না। আমার এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান থেকে বের হয়ে যায়। গামছা আন্ডারওয়ার যেমনকে তেমন জলের গামলায় পড়ে থাকে। বিকালে হাতের কাছে গামছা না পেয়ে ছাদে এসে দেখেন বাল্যবন্ধু তখনও গামছা গামলায় ভাসছে।
মনোরঞ্জন।
বলুন।
আমার লুঙ্গি গামছা কই?
যেখানে রেখে ছিলেন সেখানেই আছে।
ধোওনি, কেন?
আন্ডারওয়ার ধুতে ঘেন্না করে।
ঘেন্না করে। বাবু অবাক এবং ক্রুদ্ধ। চোখে যেন আগুন জ্বলে ওঠে তার। গলায় গরম ভাপ–আমি চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ।
জানি তো।
কী? কী জানো?
আপনি চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ। তাতে কী হল? আপনার আন্ডারওয়ার তো আর তা না। ও আমি ধুতে পারব না। আমি রাধুনি, ও সব ধধাওয়া আমার কাজ নয়।
এরপরই বেধে গেল তুমুল ঝগড়া। বাবু সে ঝগড়ার ইতি করলেন শেষ কথা বলে–আমি কেস্টোরে কমু। তোমার বহুত ত্যাল হইছে। যারে যা না কওনের তা কইতে আছে। পাইছো কী তুমি।
আর একটা ঝগড়া হয়ে গেল টিচার ইনচার্জের সাথে। তখন বেলা প্রায় আড়াইটা বাজে। সেই সময় চান করে খেয়ে সিঁড়ির উপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছি। বিশ্রাম বলতে একটু পড়া একটু লেখা। এখন নব উদ্যমে আবার লেখা শুরু করেছি। ‘অদল বদল’ মাসিক পত্রিকায় প্রতি মাসেই একটা করে গল্প ছাপা হচ্ছে, এ ছাড়া সাপ্তাহিক ‘বহুজন নায়ক’ পত্রিকায় ধারাবাহিক জীবন চণ্ডাল উপন্যাসটাও আছে। দিতে হচ্ছে কিছু অন্য পত্রিকার জন্যও নতুন লেখা। এই সময়টাতেই অনেক পত্রিকায় লিখেছিলাম কিছু লেখা।
এখানে এক বিখ্যাত টিভি সিরিয়াল নির্মাতার একটা প্রাসাদোপম বাড়ি আছে। সে মাঝে মাঝে তার শুটিং করতে পুরো ইউনিট নিয়ে স্কুলে চলে আসে। বড় সাহেবের অনুমতি আছে। ফলে সেদিন পুরো স্কুল একটা স্টুডিও হয়ে যায়। এখানেই সেই পরিচালকের সাথে কেরানী রায়ের আলাপ পরিচয়। একদিন তাকে পাকড়াও করে, আপনার সিরিয়ালে আমাকে একটা পার্ট দিন।
অভিনয় করেছেন কখনো? জানতে চায় পরিচালক।
করিনি। তবে অনেক নাটক সিনেমা দেখেছি। একটা চান্স দিয়ে দেখুন আমি ঠিক পিরবো।
অনুরোধ ঠেলতে পারলেন না পরিচালক মহাশয়। সেই দিনই উনি তার সিরিয়ালে একটা পার্ট দিলেন কেরানী রায়কে। সেটা একটা ডাক্তারের রোল। চেহারাটা রায়ের ঠিক ডাক্তারের মত বানাতে মেকআপম্যান প্রায় দেড় ঘন্টা সময় নিয়েছিল। সেজেগুজে রায় বসে রইল আরো প্রায় এক ঘন্টা। তারপর এল সেই শট নেবার মহেন্দ্রক্ষণ। খুশি খুশি মনে সে পৌঁছাল শুটিং স্পটে। একটা লোক চিৎপাত হয়ে ঘাসের উপর পড়ে আছে। রায় ওরফে ডাক্তার এগিয়ে গিয়ে তার নাড়ি দেখল। তারপর কার উদ্দেশ্যে যেন বলল–হি ইজ ডেড। সাথে সাথে পরিচালকের গলাকাট। তারপর শট ওকে। জীবনে সেই প্রথম আর সেই শেষ অভিনয়। এই অভিনয়েই তার নতুন নাম হয়ে গেল ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। তবে সবটা আর লোকে বলে না। বলে শুধু, ডাক্তার রায়।
আমি যে একটু লেখাপড়া নিয়ে আছি সেটা অনেকের ঠিক পছন্দ ছিল না। যার মধ্যে অন্যতম অফিসের কেরানিবাবু ডাক্তার রায়। ওনারই সেই বিখ্যাত উক্তি কুঁজোর চিৎ হয়ে শোবার শখ। যে উক্তিকে পরবর্তীকালে আনন্দবাজার পত্রিকার পাতায় অমর করে দেবেন সাংবাদিক ঋজু বসু।
ডাক্তার রায়-এর বিবেচনায় আমি এইভাবে সময়ের অপচয় না করে সেই সময়টা স্কুলের কাজে খরচ করি, যদি তার বা টিচার ইনচার্জের ফাইফরমাস খার্টি, সেটা যথার্থ হয়। ফাইফরমাস বলতে একটু চা ফা বানানো, বোতলে বোতলে জল ভরে বাবুদের বিশ্রামাগারে পৌঁছে দেওয়া, বাজারে দোকানে গিয়ে টিফিনটা, পান সিগারেটটা কিনে আনা। চতুর্থ শ্রেণির সব কর্মী এসব করে। কেউ না বলে না, শুধু আমি বলি। তাই আমার উপর ডাক্তার রায়ের রাগ। সেই রাগ প্রকাশ হয় ব্যঙ্গ বিদ্রূপ উপহাসের মাধ্যমে।
