দয়া, ওয়ার্ডেন লোকটার অভিধানে দয়া বলে কোনো কথা নেই। কষাই কোনো ছাগ শিশুকে না কেটে দয়া করে ছেড়ে দিতে পারে, সে ছাড়বে না। সেই যেমন নড়াচড়া করলে কাঁকড়া আরও জোরে কামড়ে ধরা ঠ্যাংয়ের জোর বাড়িয়ে দেয়, তাতে নিজের ঠ্যাং যদি ভেঙে যায় তাও যাক। সেই রকম কোনো কাজ পারব না পারছি না বললে ওয়ার্ডেন আরও চাপ বাড়ায়–সেই কাজ তাকে দিয়ে করিয়েই রেহাই দেয়। আমি যখন বলেছি যদি মরে যাও তবু সেটা করতেই হবে। এমন সেনা কমান্ডার তুল্য অনমনীয় সে।
আজ তাই বেচারা পাল, এক পা টেনে টেনে খুঁড়িয়ে হাঁটা একজন প্রতিবন্ধী মানুষ না বলতে পারল না। সেই প্রবল শীতে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে ভিজে একটা ভারবাহী পশুর মতো হাঁটা দিল সামনে সিগারেট দোকানের দিকে। তার ডিউটি শেষ হতে এখনও ঘন্টা দুয়েক বাকি। এই সাত স্যাঁতে জামা কাপড় গায়ে রাত দশটা পর্যন্ত থাকতে হবে তাকে। ওয়ার্ডেনও সেটা জানে। জানে বলেই এক পৈশাচিক আনন্দ তার চোখে মুখে ঢেউ খেলছে। গেটে দাঁড়িয়ে আশ মিটিয়ে সে দেখছে পালের হেঁটে যাওয়া।
আমিও তাকে দেখি। মনে হয় যেন পাল নয়, পা টেনে টেনে যে হেঁটে যাচ্ছে সে আমি, আমারই খণ্ডিত সত্ত্বা, দুর্বল অসহায়…। বুকটা কী এক বেদনায় যেন মুচড়ে ওঠে। কী এক ক্রোধে যেন বুকের কোনও নিভৃত কক্ষে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই কবে কতযুগ আগে একটা সিনেমা দেখেছিলাম–ছবির নাম দিবার’,নায়ক অমিতাভ বচ্চন। মনে পড়ে যায় সেইছবির একটা সংলাপ। আগলে হপ্তা আউর এক আদমি ইনকার করে গা।
একটা কারখানা-মজুর বিজয় যেখানে সদ্য কাজে যোগ দিয়েছে। সে মাইনে পাবার দিন দেখে যত মজুর মাইনে নিচ্ছে প্রত্যেকের মজুরি থেকে একটা অংশ কিছু গুণ্ডার দাদা সেলামি বাবদ জোর করে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তার শ্রমে ঘামের মূল্য লুঠ হয়ে যাচ্ছে।
একজন বৃদ্ধ মজুর পারিবারিক কিছু অসুবিধার কারণে সেদিন দাদা সেলামি দিতে আপত্তি জানায়, গুণ্ডাদের দয়া চায়। তখন গুণ্ডারা তাকে বেদম মারধোর করে টাকা কেড়ে নেয়। সব মজুর দাঁড়িয়ে দেখে, কেউ গুণ্ডাদের বাধা দেয় না।
সমাজে সর্বত্র তো এই চলছে। অন্যায়কারিরা সংখ্যায় খুব কম, তবু তারা দৌরাত্ম করে যেতে পারে। কারণ মানুষ এগিয়ে এসে বাধার পাহাড় হয়ে সামনে দাঁড়ায় না। সেনা দাঁড়াক, তবে আজ আমি দাঁড়াব। যেন জগতের সব দুর্বল অসহায় মানুষের প্রতিনিধি আমি। আর সব অত্যাচারী মানুষের প্রতিনিধি ওই ওয়ার্ডেন। মনে মনে বলি, আগলে বার এক আদমি ইনকার করেগা।
.
বড় সাহেব বেশিরভাগ দিনই সন্ধের পর এখানে আসে। সে আসা মাত্র হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কে কত তৎপর প্রদর্শন বাতিক চেগে ওঠে। তার মুখ থেকে হাঁ বের হওয়া মাত্র লোকে হাওয়া ধরতে ছুট মারে। ওয়ার্ডেনও জনগণের কাছে সেই সেবা সেই মনোযোগ দাবি করে। কিছু মানুষও তো তেমন আছে যারা ক্ষমতাবানদের তোষামোদ, লেজুরবৃত্তি করতে ভালোবাসে। ফলে কিছু পরিমাণে সেও সেবাযত্ন পায় বইকি। ওয়ার্ডেনও স্কুলে এলে কিছু লোক তটস্থ হয়ে ওঠে। কীভাবে দাদাকে তুষ্ট করবে সেই ভাবনায় অস্থির হয়ে ওঠে। সে গেটে পা রাখা মাত্র ব্যস্ত সমস্ত হয়ে কেউ না কেউ ছাদের দিকে মুখ করে চিৎকার ছোঁড়েরঞ্জনদা, চা বসাও।… দা এসে গেছে। যেন এক মিনিট দেরি হলে চা বিহনে দাদার প্রাণ চলে যাবে।
একদিন চা পান শেষ করেই অভ্যাসবশে খুচরো পয়সা বের করে আমার দিকে এগিয়ে দেয় হাতটা–যান চট করে একটা ফ্লেগ নিয়ে আসুন।
আজ আমি সে পয়সা তুলে নিয়ে ছুট মারি না। দাঁড়িয়ে থাকি রণক্ষেত্রে ঘটোৎকচের মতো। আসুক একাঘ্নীবান, বুক পেতে নেব।
বলি–আমি এখন যেতে পারব না।
যেতে পারবেন না মানে!
উনুনে ভাত বসানো আছে। গলে যাবে।
যাবেন আর আসবেন। কত সময় লাগবে। যান এক ছুটে গিয়ে নিয়ে আসুন। সিগারেট না খেলে আমার মাথা গরম হয়ে যায়।
বলি–এত যদি নেশা আসার পথে একটা নিয়ে এলেন না কেন? পথের দুধারে তো কত দোকান।
ওয়ার্ডেন আমার মুখে দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
বলি আমি–কথায় বলে নিত্য মরাকে কে দেয় কাঠ আর নিত্য উপোসীরে কে দেয় অন্ন। এক আধদিন হলে সে ঠিক আছে। রোজ কে আপনার জন্য হাতের কাজ ফেলে দোকানে দৌড়বে। সে যে যায় যাক। আমি যাব না। আমাকে আর কোনোদিন বলবেন না।
আপনি আমার আন্ডারে কাজ করেন?
করি।
তাহলে আমি যা বলব আপনি শুনতে বাধ্য।
না, মোটেই বাধ্য নই। আপনি বলবেন তাল গাছের মাথায় চড়ে যাও আর আমি চড়ে যাব। একদম নয়। তাছাড়া এটা আপনার ব্যক্তিগত কাজ, স্কুলের কিছু না। আপনি আমাকে ওই কাজে লাগাতে পারেন না। সেটা বেআইনি।
যেন ভূত দেখার মতো আমাকে দেখে ওয়ার্ডেন। দেখে তাকে ঘিরে থাকা স্তাবকের দলও। মানুষের জীবনে এমন এক একটা সময় আসে যখন ঘুরে দাঁড়াতে হয়। প্রত্যাঘাত করতে হয়। লাভের চেয়ে তাতে ক্ষতি হয়তো বেশিই হয়, তবু মনের কাছে নিজের মাথাটা অনেক উঁচু দেখায়। নিজের কাছে নিজের সম্মান বেড়ে যায়।
এখন আমার মনে হয় ছোট হোক–তবু একটা আঘাত তো দিতে পারলাম এক দাম্ভিককে। এটাই অনেক।
***
আজকে আবার আর একবার বাল্যবন্ধুর সাথে আমার ঝগড়া হয়ে গেল। সেই চুরির কেসের পর থেকে উনি সর্বদাই আমার উপর রেগে আছেন। ছুতোনাতায় ছোট বড় কথা বলেই চলেছেন। তবে আজকের ঝগড়াটা বেধেছে আমারই দোষে। আজকে সত্যিই আমার দোষ।
