লোকটি পেশায় একজন ডাক্তার এবং জাতিতে বামুন। দেশ ভাগের কারণে দেশ ছেড়ে এলেও উনি যে রিফিউজিদের মত ক্যাম্পে গিয়ে ঢোকেননি, কলোনিতে পরের জমি জবরদখলও করেননি, নিজের টাকায় বাড়িঘর বানিয়েছেন সে নিয়ে ওনার খুবই গর্ব ও অহংকার।
মানুষের মধ্যে কত যে ভাগ বিভাগ তা কিছুতেই আমি বুঝে উঠতে পারি না। মানুষের সাথে মানুষের অবাধ মেলামেশার দরজা কতভাবে যে বন্ধ করার অপচেষ্টা করে চলেছে মানুষ, তার তল খুঁজে পাই না। এখন জানলাম বাঙালদের মধ্যে আরও একটা উপভাগ রয়েছে, যারা রিফিউজি বা কলোনি বাসিন্দা নয়।
আমার ছোট্ট জীবন এতদিন যে দুই ক্যাম্পের সীমানার মধ্যে কেটেছে, সেখানে কোন বামুন কায়েত ছিল না। ফলে বর্ণব্যবস্থা জিনিসটা যে কী তাও আমার খুব একটা জানাবোঝর অবকাশ ঘটেনি। বিয়ে বা শ্রাদ্ধের মন্ত্র পড়াতে বাইরে থেকে মাঝে মধ্যে যে দু একজন বামুন ক্যাম্পে আসত, তারা কখনও জাতিগর্বে বুক ফোলাবার মত সাহস দেখাতে পারত না। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় নিজেকে সংযত করে রাখত। এই বাড়িতে এসে প্রথম বর্ণবাদের কুৎসিত কদাকার রূপটা প্রত্যক্ষ করলাম। বুঝতে পারলাম যে হিন্দু ধর্মের মানুষ বলে আমরা পরিচয় দিয়ে গর্বিত হই, সেই ধর্মে আমাদের স্থান কোথায়।
আমি নমঃশুদ্র, যাদের আগে চণ্ডাল বলা হোত, এরা সে কথাটা জানে। ফলে বাড়ির লোক আমাকে এমন ঘৃণিত জীব বলে মনে করে যেন আমি কোন ছোঁয়াচে রোগের রোগী। ভাত খাবার সময়ে ডাক্তারের গিন্নি একটা কলাই করা বেড়ানো থালায় যেন ছোঁয়া না লেগে যায় এমন ভাবে উঁচু থেকে ছরছর করে ভাত তরকারি ঢেলে দিত। যা উঠোনের এক ধারে বসে কাঙালের মতো খেয়ে নিজের থালা নিজে ধুয়ে আনতে হত। সে থালা ওরা ঘরে ঢোকাতনা। গোয়াল ঘরের মধ্যে রাখা থাকত। আমার ঘুমাবার জন্য বরাদ্দ স্থান ছিল গোয়ালের একধারে গাদা মারা ঘুঁটের বস্তার উপর। গরুর চোনার গন্ধে আর মশার কামড়ে সারা রাত ঘুমাতে পারতাম না। ঘুমাতাম দিনের বেলায় গরু চড়াতে গিয়ে, মাঠের কোন গাছ তলায় গামছা পেতে। সেই ঘুমের কারণেই একদিন পিঠেপড়েছিল কঁচা কঞ্চি বাড়ি। আমি সেদিন গরুরপাল নিয়ে রেল লাইনের দিকে চলে গিয়েছিলাম ট্রেন দেখব বলে। ট্রেন আসতে দেরি ছিল তাই গরু মাঠে চড়তে দিয়ে আমি শুয়ে পড়েছিলাম এক গাছের ছায়ায়। যখন ট্রেন এল অবলা জন্তুগুলো সে আওয়াজে আতংকিত হয়ে ছুট দিল ঊর্ধ্বশ্বাসে যে যেদিকে পারে। আর তাতেই পা পিছলে গর্তে পড়ে পা ভেঙে গেল একটা গরুর। সেই অপরাধে ডাক্তার আমার পিঠে ভাঙলেন পাঁচনবাড়ি।
ঘুটিয়ারি শরিফ একটা মুসলমান প্রধান অঞ্চল। এখানে গাঁজিবাবা নামক এক পিরের মাজার আছে। যাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আগমন ঘটেছে কিছু বিহারি মুসলমানের। যারা বাঙালী মুলমানদের মত অতটা” নিরামিশ” প্রবৃত্তির নয়। এখানকার এক রেল লাইনের ধারে এনে বসানো হয়েছে পূর্ববঙ্গ থেকে বিতাড়িত একদল ছিন্নমূল মানুষকে। পুরাতন ক্ষতে খোঁচা দিতে এদের কাছে নিয়মিত আসাযাওয়া করে থাকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের লোকজন। ফলে এ সময়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে থম থম করে একটা চাপা উত্তেজনা। যা যে কোন সময় ফেটে পড়বার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান।
ডাক্তার লোকটি খুবই চালাক। সে খুব বুদ্ধি করে স্থানীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের ক্ষমতাবান লোকেদের সাথে মনের ঘৃণা হিংসা ক্রোধ মনে চেপে রেখে একটা সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলার চেষ্টা করে থাকেন।
একদিন ডাক্তার পাশের গ্রামের কয়েকজন মাতব্বর গোছের মুসলমানকে নিমন্ত্রণ করে নিজের বাড়ি নিয়ে এল পায়েস খাওয়াবে বলে। যদি এখানে কোনদিন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, সেদিন এই পায়েস তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করবে এই তার ধারণা। কিন্তু ডাক্তারের গিন্নি এত সব কুট কৌশল জানে না। যাদের জন্য দেশত্যাগ করে আসতে হয়েছে সেই গরুষোর নেড়ের জাত উঠোনে এসে দাঁড়াবে, বারান্দায় এসে বসবে, খাবে, সে তার ঘোর অপছন্দের। আজ বারান্দায় বসবে, কাল রান্নাঘরে ঢুকবে। তাহলে আর জাতধর্মের কী রইল!
গিন্নির গজগজানিতে কর্ণপাত না করে ডাক্তার তাদের বারান্দায় নিয়ে গিয়ে বসতে দিলেন। যে বারান্দায় “স্বজাত” হয়ে আমি কোনদিন উঠতে পারিনি, সেইখানে নিয়ে বসানো হল বিধর্মী ম্লেচ্ছদের। গরজ বড় বালাই যে। শোনা যায় মুসলমান শাসনকালেও এমন হোত। নিম্নবর্ণের যে মানুষ হিন্দু উচ্চবর্ণের কাছে কোন মান সম্মান সাম্য ব্যবহার পেত না, যেই সে নিজের জাত ত্যাগ করে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করত সাথে সাথে বৰ্ণহিন্দুদের কাছে সম্মানীয় হয়ে উঠত। রাজার জাত বলে কথা। তখন সম্মান না দিলে অবজ্ঞা দেখালে পেয়াদা এসে যখন প্যাদাবে, কোন বাপবাঁচাবে? এই কারণে নাকি দলিতশ্রেণির বহু মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল।
সে যাইহোক সমস্যা হল তারা পায়েস খেয়ে চলে যাবার পর। তখন আর ডাক্তারের গিন্নির গলায় কোন রাখঢাক রইল না। চিৎকার করে তিনি ডাক্তারের বেআক্কেলে কাণ্ডজ্ঞানের জন্য ভর্ৎসনা করতে লাগলেন। আর আমার উপর আদেশ হল গোবর জল গুলে যেখানে তারা দাঁড়িয়েছিল, বসে ছিল, সর্বত্র তা ছিটিয়ে শুদ্ধ করবার। তারা যে থালায় খেয়েছে তা ধুয়ে সাফ করবার। এসময়ে তিনি আমাকে “অচ্ছুত হওয়া সত্ত্বেও” মুসলমানের চেয়ে উচ্চে স্থান দিয়েছিলেন।
