বলি–আমার যদি দোষ বলেন তো দোষ, আর গুণ বলেন তো গুণ। ছোট বেলা থেকেই আমার অভ্যাস, আমি কারো ধার বাকি কিছু রাখিনা। যে আমাকে অপমান করে সে অপমান সময় সুযোগ এলে সুদে আসলে ফিরিয়ে দিই। উনি আজ আমাকে দিলেন, সব আমার কাছে জমা রইল। দুদিন আগে আর দুদিন পরে–একদিন এ দান আমি ফিরিয়ে দেব। ঋণ রাখব না।
রামকৃষ্ণদেব বলেছেন–যে সয় সে রয়, যে না সয় সে নাশ হয়। আমার জিনগত ত্রুটি হল মোটে সইতে পারি না। তাই রইতে পারি না কোথাও। বার বার স্থান অস্থান বদলে বদলে যায় জীবনের।
অপমানটা অনুর বুকেও নিদারুণ ভাবে বেজেছে। বলে সেচলো আমাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসবে। আমি মায়ের ওখানে যাব। যখন তোমার সময় হবে তালদি যেও। না পারলে না যেও। কিন্তু আমাকে আর কোনোদিন তোমাদের এই স্কুলে আসতে বোলো না। এর চেয়ে তো আমাদের জঙ্গলের গোণ্ড আদিবাসীরা অনেক ভদ্র অনেক ভালো। মানুষকে সম্মান দিতে জানে। ছিঃ
আদিবাসীরা ভালো, কারণ তারা রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ, মার্কস পড়ে না। যেদিন তা পড়বে ওরাও এই রকম জংলি হয়ে যাবে। এটা রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দের দোষ নয়। বিদ্বান হয়ে যাওয়ার দোষ। এই বিদ্যাকে সঠিক চিনেছিলেন চারু মজুমদার। তাই বোধহয় বলেছিলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যে যত পড়ে, সে তত মুখ হয়।
.
জীবন এক যন্ত্রণার নাম। জীবন এক ভারবাহী পশুর মতো পথের পাথরে হোঁচটে ঠোক্করে ক্ষত বিক্ষত হতে হতে এগিয়ে চলার নাম। জীবন এক যুদ্ধ। ফিরে দাঁড়ানো, প্রত্যাখ্যান করা সেও জীবনের ধর্ম। জীবন এক নির্মম অভিজ্ঞতার নাম। পথের বাঁকে বাঁকে কুড়িয়ে নেওয়া নুড়িতে শূন্য ঝুলি পূর্ণ করে নেওয়া। কে বলতে পারে কোন নুড়ির বুকে কী রঙ গোপন আছে। কোন পাথরটা–পরশ পাথর।
আমি কী কোনোদিন জানতাম যে জেলখানার উঁচু দেওয়ালটা একদিন কঠোর থেকে কঠোরতর মনে হয়েছিল, আজ সেই জেলবাসের পুঁজি ভাঙিয়ে লেখক হয়ে যাব।
তাই এখন আমার মনে হয় এই যে লাঞ্ছনা এ-ও ব্যর্থ যাবে না। যে বিষ আমি আজ পান করছি একদিন অমৃত হয়ে উঠে আসবে কলমের ডগায়। একদিন…।
.
একজন লোকের নাম–পালদা। এই স্কুলে সে দারোয়ানের কাজ করে। খুব ছোটবেলায় তার পোলিও হয়েছিল। এই রোগে শরীরের একটা দিক সম্পূর্ণ অসাড় অবশ হয়ে গেছে। হুইল চেয়ার তো লাগে না, তবে হাঁটতে তার খুবই কষ্ট হয়। বেঁকে বেঁকে ফেন পা খোঁড়া, কোনো কাঁধে জোয়াল চাপানো জন্তুর মতো অতি কষ্টে শরীরটাকে টেনে টেনে সামনে আগায়।
লোকটা অতি শান্ত সংযত অতি নিপাট একজন ভালো মানুষ। কারও কোনো ঝামেলায় থাকে না। আসে ডিউটি করে বাড়ি চলে যায়। নিপীড়ক ওয়ার্ডেন এই লোকটাকেও ছাড়ে না। কোনো মানবিকতা, দয়া-দরদ দেখায় না, সুযোগ পেলেই তাকে পীড়ন করে। সুযোগ না পেলে সুযোগ বানিয়ে নেয়। সে হাজিরা দিতে আসে সাইকেলে। যে পথে আসে হাজার একটা পান বিড়ি সিগারেটের দোকান। ইচ্ছা করলেই সাইকেল থামিয়ে সে কোনো দোকান থেকে সিগারেট কিনে নিতে পারে। কোনোদিন কেনে না। ডিউটিতে এসে গেটে সাইকেল দাঁড় করিয়েই পকেট থেকে কিছু খুচরো পয়সা বের করে কেউ একজনকে বলবে–একটা ফ্লেগ নিয়ে এসো।
.
সিগারেট সে খুব ঘন ঘন খায় কিন্তু একবারে এক প্যাকেট কোনোদিন কিনবে না। নেশা চাগাড় দিলেই একজনকে ফের দোকানে পাঠাবে আর একটা কিনে আনতে। তার যুক্তি, পকেটে থাকলে বেশি খরচা হয়ে যায়। দিনের মধ্যে দুঘন্টা ডিউটি করে, এই দু ঘন্টায় কমপক্ষে চার বার কাউকে না কাউকে ছুটতে হয় তার নেশার খোরাক আনতে। এক আধবার আমার ভাগেও এই কর্মের ভার পড়ে। তার একটু সাইকেল থামানোর কষ্ট, দুটো মিনিট সময়ের অপচয় বাঁচাতে আমি তিনতলা থেকে সিঁড়ি ভেঙে নামি, সিঁড়ি ভেঙে উঠি-আধ মাইল পায়ে হাঁটি। আমার কষ্ট তার কাছে কোনো কষ্ট নয়, তার সাইকেল থেকে নামাটাই বড় কষ্ট।
আগে এমন ছিল না, তখন মানুষ মানুষের দুঃখ কষ্ট বুঝত। সেই সংবেদনশীল মনটা কী করে যে মরে গেল! এখন পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র একদল আধা জন্তু আধা দানবের বড় দাপাদাপি চলছে।
এক একটা সময় এমন আসে, যাকে ইতিহাসে কালোদিন অন্ধকার যুগ এই সব অভিধায় অভিহিত করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে এখন সেই অরাজক অন্ধকার পর্ব চলছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেওয়া দুর্বৃত্তায়নের নীচে দমচাপা মানুষ বাঁচাও বাঁচাও আর্তনাদ করছে। কে কাকে বাঁচাবে? সব মানুষই এখন ভীত ত্রস্ত বাকহারা।
সেটা ছিল পৌষ কী মাঘ মাসের রাত্রির আটটা সাড়ে আটটা। সারাদিন থম মেরে–শেষে বিকেল থেকে বৃষ্টি নেমেছিল ঝিরঝির করে। সেই সাথে কনকনে বাতাস। শীতে সারা অঞ্চল কুঁকড়ে গিয়েছিল সেদিন। বৃষ্টির সেই বরফ জল গায়ে লাগলে যেন লোমকুপ থেকে শরীরের মধ্যে ঢুকে কামড় বসাচ্ছিল হাড়ে। হাত পায়ের আঙুল বেঁকে বেঁকে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় সাইকেল চালিয়ে গেটে এসে থামল ওয়ার্ডেন। অভ্যাস মতো পকেট হাতড়ে বের করল পয়সা। উঃ রে বাপ, ঠাণ্ডায় যেন জমে গেলাম। আনো তো পালদা একটা ফ্লেগ। সিগারেট না টানলে আর চলবে না। বলে এগিয়ে দিল পয়সা ধরা হাত পালের দিকে।
ওয়ার্ডেনের দেহ রেন কোটে ঢাকা। বাড়ি থেকে বেরই হয়েছে বৃষ্টির মধ্যে। পাল যখন এসেছে তখন আকাশ ছিল পরিষ্কার, ছাতা, রেনকোট আনবার দরকার ছিল না। এখন এই বৃষ্টিতে ভিজে সেই বাসরাস্তায় অচল অক্ষম শরীরটা শামুকের মতো টেনেটেনে সিগারেট আনতে যাবার কথায় তার দুটো চোখে এক অসহায় আর্তনাদের ছবি ফুটে উঠল। এমনভাবে তাকাতে লাগল, যেন সে বিশ্বপিতার কাছে কাকুতি করছে দয়া কর প্রভু।
