সে অনেকদিন আগের ব্যাপার। কিন্তু শরীর পুড়ে যাক বা কেটে যাক, তার ক্ষত তো শুকিয়ে যায়-দাগ যায় না। মানুষের মনে সে দাগ তখনো আছে, বিশেষ করে ওই চতুর্থ শ্রেণির অশিক্ষিত অসভ্য কর্মচারিদের। তারা আর বড়দিকে সেই চোখে দেখে না সেই সম্মান করে না যা তার পদাধিকার বলে প্রাপ্য। তারা আড়ালে আবডালে বড়দিকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে যেসব কথা বলে, তা কোনো ভদ্রমহিলাকে নিয়ে বলাটা খুবই খারাপ।
আর যেটা আরো খারাপ সেটা হল, যখন তাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হয় তারাই একজনের নামে আর একজন চুকলি করে যায়-জানেন বড়দি ও বলে আপনি নাকি…। বড়দি যা বোঝেন তা হল–সব শালাই হারামির বাচ্চা। তাই মওকা পেলে দুজনকেই ধেসে দেন। এতে খানিকটা হলেও গাত্রদাহ-অপমান-অসম্মানের জ্বালা মেটে। যেটা অনেকের মতে মশা মারতে কামান দাগা।
এই হয়, এটা হওয়াই স্বাভাবিক নিয়ম। স্নেহের মতো ক্রোধও নিম্নগামী। যে আমার উপরে বা সমকক্ষ তাকে যখন কিছু বলতে পারি না, নীচের জনকে মারি! লোকে বউ কেন পেটায়? পেটের সন্তানকে কেন পেটায়? এইভাবে নির্গত হয় আক্রোশ।
এখন টিচার ইনচার্জ আমার উপর আক্রোশ ঝাড়লেন–আপনি এখান থেকে ফোন করছেন কেন?
এখানে চাকরিতে ঢোকার পর অনুকে প্রথম যে চিঠিখানা লিখেছিলাম তাতে বলেছিলাম, অনেক ঘাটের জল খাবার পর জীবনতরী এতদিনে সঠিক তীরে এসে ভিড়েছে। বিদ্যালয় হচ্ছে সরস্বতীর মন্দির। এখানে সব বিদ্বান মানুষ থাকেন। যাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। আশা করছি একদিন এরা আমার পরিচয় পাবে। সেদিন নিশ্চয় আমার সাধনার একটা স্বীকৃতি আসবে। সবাই ভালোবাসবে আমাকে।
এখন সেই অনুর সামনে আমার উপর বড়দি এক ক্রুদ্ধ বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে দেখে বিব্রত আমি আহতঙ্গায়রদি-আমিও তো এই স্কুলের কী। সবাই ফোন করে আর আমি একটা দরকারি ফোন করতে পারব না?
পারবেন। তবে সে জন্য আমার পারমিশন নিতে হবে। নিয়েছেন?
দাসদাকে তো বলেছি। তিনি তো পারমিশন দিয়েছেন। কী দাসদা আপনি বলেননি ফোন করতে। ভুল হলে সে তো দাসদার। উনি বলতেন যে আপনার পারমিশন লাগবে। নিতাম পারমিশন।
এ কথায় টিচার ইনচার্জের কোনো প্রতিক্রিয়া হল না। কী এক কারণে যেন উনি স্থির করে নিয়েছেন আমাকে আমার বউয়ের সামনে যতখানি অপমান করা যায় আজ উনি তা করেই ছাড়বেন।
আমি এর আগে অল্প কিছুদিনের জন্য এক স্কুলে কাজ করেছিলাম। সেখানে দেখেছি স্কুলের কেউ কোনো অন্যায় করলে হেড মাস্টার তাকে নিজের কামরায় ডেকে নিতেন। তারপর ছোট ছোট শব্দে যা বলতেন তা অনেক বড় বড় বাক্যেরও বাপ।
আসলে এটাই তো হয়, আসল রাজা আর রঙ্গমঞ্চেল্প রাজা সাজা রাজা দুজনের এই প্রভেদ। আসল রাজাকে কোনো বন্দীর প্রাণদানের আদেশ গলা ফাটিয়ে গর্জন করে বলতে হয় না। তার দরকার পড়ে না। হাতের বুড়ো আঙুল কাত করলেই হয়ে যায়। কিন্তু মঞ্চের রাজাকে দৌড়াতে হয় দাপাতে হয় হাঁফাতে হয়।
এই হেড তো আসল হেড নয়। ধরে চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া একটা পুতুল মাত্র। যার টিকিটা ধরে আছে অন্য কেউ; যাকে দেখা যায় না। সে যেমন নাচায় উনি তেমনই নাচেন। সকলি হয় তাহারই ইচ্ছায়–উনি নিমিত্ত মাত্র। তবে
তবে কখনো কখনো রথ পথ মূর্তি নিজেকে দেব ভাবে। একজন দাড়িঅলা বুড়ো বলে গেছে। ওনারও সেই ভ্রম হয়েছে। অ্যাই এ্যাম হেড অব দি ইনস্টিটিউশন।
.
এই চেয়ার-উনি যেটায় বসে থাকেন, সেই চেয়ারে আগে অন্য একজন বসত। আমি তাকে দেখিনি, শুনেছি তার নাম ছিল সন্দীপ মাস্টার। তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ন্যায় নিষ্ঠাবান আদর্শপরায়ণ একজন শিক্ষক। যখন তখন তাকে যে কোনো কাগজ এগিয়ে দিলে চোখ বুজে সই করে দিতেন না। কী এবং কেন, সত্য তথ্যের অনুসন্ধান নিতেন। প্রশ্নের জবাবে অযুক্তি কুযুক্তি দৃষ্ট হলে আর কোনভাবে তার না কে হা করানো যেত না।
এটা একটা সমস্যা। ফলে কোনো এক অদৃশ্য আঙুলের ইশারায় এই স্কুলের একটা চক্র সক্রিয় করে তোলা হল সন্দীপ মাস্টারের বিরুদ্ধে। আমি ঠিক জানিনা সেই চক্রের পিছনে এই স্কুলের যারা সর্বময় কর্তা, কেউ ছিলেন কিনা। আমার পক্ষে এটাও বলা সম্ভব নয় যে সেই সময় কর্তাদের কেউ রাজভবন কেউ আলিমুদ্দিনে থাকেন কিনা? সে জানতেন সন্দীপ মাস্টার। কিন্তু তিনি মুখই খোলেননি। কী এক ভয়ে চুপচাপ পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে নিরুদ্দেশে চলে গেছেন। আর জীবনে কোনদিন এই স্কুলের ত্রিসীমানায় আসেননি।
এখন টিচার ইনচার্জ তার অস্ত্র পরিবর্তন করে। শেল, শুল, গদা, ধনুক বিবিধ মারণাস্ত্র তার অস্ত্রশালায়। ঠিক আছে, মানছি দাসদা বলেছে। আপনি গিয়ে ফোন করতেন। বউদিকে কেন সাথে করে নিয়ে গেছেন? আপনি স্টাফ কিন্তু উনি কে? এটা কী পাবলিক বুথ নাকি যে যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়ে যাবেন। এটা অফিস, এখানে একটা ডিসিপ্লিন আছে। যা ইচ্ছা তা করা যায় না, এটা মনে রাখবেন। কথা শেষ করে বীর দর্পে তিনি যেমন এসেছিলেন তেমনই ফিরে নিজের অফিস ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।
তার ব্যবহারে এখন দারোয়ান দাস ভীষণ বিপন্ন। বলে সে, মনোরঞ্জনদা, আমি একদম বুঝতে পারিনি দাদা যে বড়দি এইরকম খেপে উঠবে। বুঝলে কক্ষনো আপনাকে ও ঘরে ফোন করতে পাঠাতাম না। সবাই করে তাই আমি ভাবলাম।
