তখন বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা। টিচার অফিসস্টাফ সব এসে গেছে। টিচার ইনচার্জ এসে বসে পড়েছেন তার কক্ষে। এসব ফোনে এখন ফোন করায় সমস্যা। তাই দারোয়ান দাসকে বলি, কী যে করি। একটা ফোন করা খুব দরকার। কিন্তু কোন ফোন থেকে করব। বড়দির ঘরে বড়দি বসে আছে। অফিস ঘরে রায়দা আর সবাই কাজ করছে।
রায় সোনারপুর অঞ্চলের এক সিপিএম নেতা। পার্টির খুব গুরু দায়িত্ব পালন করেন তাই সেই কাজে প্রচুর সময় দিতে হয় বলে স্কুলে আসার সময় যদিও একটু বের করতে পারেন, বেশি সময় থাকতে পারেন না। এই এসেছেন এক্ষুনি চলে যাবেন। তবে যে এক আধঘন্টা সে এখানে থাকবে পুরো স্কুল কঁপবে। তখন বোঝা মুশকিল হবে ইনি অফিসের কেরানিবাবুনা স্কুল শিক্ষামন্ত্রী।
ইনি সব সিপিএম কর্মী নেতাদের মতোই এক কৃতকর্মা পুরুষ। যে কেরানির চাকরি করে লোকে সংসার চালাতে হিমসিম খায়, উনি যে সময় এই কাহিনি লিখছি বাড়ি গাড়ি সহ অনেক কিছুর মালিক হয়ে গেছেন। মাঝে কিছু টাকা পয়সার হিসেবে গরমিল করে বড় সাহেবের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, তখন মনে হয়েছিল বোধহয় চাকরিটা আর থাকবে না। জেলও হতে পারে। সে ঝামেলা মিটে গেছে এখন। গরমিলের টাকা তার মাইনে থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে।
এখন বলে দাস, যখন ফোন করা খুবই দরকার বড় সাহেবের ঘরে চলে যান। ওখান থেকে করে নিন।
কেউ কিছু বলবে না তো।
কে বলবে। সবাই তো করে। আমি বলছি আপনি যান না।
যাবো?
হ্যাঁ যান।
দাসের কথায় ভরসা করে বড় সাহেবের অফিস কক্ষে ঢুকে পড়ি। উনি সবদিন আসেন না। আসেন দশ পনের দিনে একবার। তখন এই কক্ষে বসেন। ইচ্ছা করলে শুতেও পারেন। কামরার একদিকে খাট বিছানা পেতে রাখা আছে। আছে এ.সি. আছে পত্র-পত্রিকা রঙিন টিভি।
সেই কামরায় ঢুকে এক মিনিট কথা বলেছি, হঠাৎ চিৎকার। পাশের কামরা থেকে পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে ধেয়ে এল টিচার ইনচার্জ। ওয়ার্ডেন এবং রায় দুইজনে গিয়ে উত্তেজিত করে দিয়েছে, একী বড়দি, আপনি আছেন। আপনি না থাকলে তখন আলাদা ব্যাপার। আপনি থাকতে আপনার কোন অনুমতি না নিয়ে সোজা সভাপতির ঘরে ঢুকে ফোন করছে, এতো আপনাকে অপমান করা।
এটা খুবই তাতানো কথা। তাই তেতে গেছে বনেদি বাড়ির বিদুষী বউ। কেন তাতবে না? যখন এর জন্য তার কোনো ব্যক্তিগত ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
ইনি এক অপমানিত মানবী। অপমানিতের মরম বেদনায় তিনি মর্মাহত। আর তাই যে অপমান তিনি অমানবিক মানব সমাজ থেকে পেয়ে থাকেন, সেটাই সহস্রগুণ বৃদ্ধি করে ফিরিয়ে দেন সামাজিক মানুষকে, যারা তার নিম্নে আছেন। ইনি টিচার ইনচার্জ এবং পদাধিকার বলে স্কুল পরিচালন সমিতির সেক্রেটারিও বটে। এখন আর সেই বাবু সেক্রেটারি নেই যিনি আগে ছিলেন।
সরকারি আইন মোতাবেক স্কুলের সকল কর্মচারি তার আদেশ মানতে বাধ্য। মানুষকে বাধ্য পোষ্য অবনত আজ্ঞাবহকরায় যে কী আনন্দ সে একমাত্র সেই জানে যে এই আনন্দধারায় অবগাহনের সুযোগ পেয়েছেন। তিনি সেই আনন্দ অবগাহনে নিমজ্জিত থাকেন। প্রতি মুহূর্তে অধস্তন–বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের চমকাতে থাকেন।
এমনিতে তাঁর বাসস্থান এক মফঃস্বল শহর। ওনার পড়াশোনা সব সেই শহরে। তবে কলকাতায় যে মজা তা কি ওই ছোট্ট শহরে আছে? এখানে কত দর্শনীয় স্থান। নিকোপার্ক, নলবন, সায়েন্স সিটি, বোটানিকাল গার্ডেন, যাদুঘর, চিড়িয়াখানা। স্কুল ছুটির পর উনি বেরিয়ে পড়েন ভ্রমণে। গাইড হিসাবে সাথে নেন এই স্কুলেরই এক মাস্টারকে। সারা কলকাতার দর্শনীয় স্থান সমূহ দর্শনের পর উনি চলে যান তার বাড়িতে। না গিয়ে বা কী করবেন। অতরাতে তো নিজগৃহে যাবার ট্রেন থাকে না। আর কোন ভদ্রঘরের মেয়ে বা বউয়ের তো হোটলে থাকা মানুষ ভালো মনে নেয় না।
তবে কোনো অসুবিধা হয়না। মাস্টার মশায়ের বাড়িটা বড় এবং সে এখনো বিয়ে থা করেনি। সেখানে বড়দি নিজের পয়সায়াম্ৰকখানা ক্লিাল বৃঙিন টিভি কিনে রেখে দিয়েছে। সিডি, ডিভিডি মাস্টারের কেনা। ফলে ইচ্ছা হলে সেখানে বসে বিদেশি বা দেশী অ্যাকশন বেশি সংলাপ কম সিনেমা দেখার সুখ পেতেও বাধা নেই।
এইভাবে বেশ সুখেই তার কাটছিল দিন। কিন্তু সেই সুখের ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিল এই স্কুলেরই আর এক শিক্ষিকা। সে মাষ্টারকে আরো দূরে-দীঘা, পুরীর দ্রষ্টব্য স্থান সমূহ দর্শনের নিমিত্তে গাইড হিসাবে নির্বাচিত করে বসল। আর তখনই একদিন মহাধুন্দুমার। সেদিন টিচার ইনচার্জ আর মাস্টারের মধ্যে যে অঙ্গভঙ্গিতে যে বাক্য বিন্যাসে ঝগড়া শুরু হল তা শুনে যে কেউ ধারণা করে বসবে–এটা বিদ্যাদেবী সরস্বতীর অঙ্গন নয়–হয় কোনো মাছের বাজার, নয় ঝি ট্রেনের কোনো কামরা বা সোনাগাছির কোনো গলি। অথবা এক সাথে তিনটেই। তখন মাস্টারের লাগামহীন মুখ দিয়ে যে মধুর বচন বের হল তাতেই জানা গেল টিভি ডিভিডির গল্প।
এরপর যা হয়–স্কুল পরিচালন সমিতির একটা জরুরি মিটিং বসল। তাতে একটা আদেশ একটা নির্দেশ একটা উপদেশ দেওয়া হল শিক্ষক মশাইকে। এক, সে আর ক্লাস করতে পারবে না। পুনরাদেশ না হওয়া পর্যন্ত এগারোটা থেকে চারটে–একা টিচারর্স রুমে বসে থাকবে। দুই, সোনি কোম্পানির ওই দামি টিভিটা ফিরিয়ে দিতে হবে। তিন, এটা উপদেশ, দিলেন প্রাক্তন সেক্রেটারি, বিয়ে করে নাও। চারদিকে যা রোগ শুনি, এ্যাকবার হইলে আর বাঁচবা না।
