বলে–আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। যা বলছি তা করুন। এটা হোস্টেল–হোটেল না। হোটেলে যা চলে হোস্টেলে চলে না। বউদিকে নীচে পাঠিয়ে দিন।
অনুবড় বিব্রত। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যায় না, তবে বুঝতে পারি যে বিষয় নিয়ে বাদানুবাদ হচ্ছে তা তার কাছে শ্রুতিমধুর নয়। কথা যাই হোক তার অন্তর্নিহিত অর্থটা তোত অশ্লীলই। স্বাভাবিক কারণে এক অনাধুনিক মানসিকতার গ্রাম্য সংস্কারে লালিত নারীর মনন চিন্তনে তা কটু এবং অপ্রিয়। সে চায় আমি আর এই বিষয়ে একটাও কথা না বলি। অনেক রাত তো গেছে, এ রাত না হয় এমনি চলে যাক।
কথা আর আমিও বলি না। বলে কী লাভ? এখন যে লোকটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কথা বলছে, সে তো একা কথা বলছে না। তার সাথে কথা বলছে তার সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবস্থান। তার শিক্ষা, সংস্কৃতি, রক্তের গ্রুপ, বংশগতি সব কিছু। একে যে ভাষায় বলে বোঝানো যাবে সে ভাষা আমার নেই।
কী আর করি, অনুকে নিয়ে হোস্টেলের একটা খাটে শুইয়ে দিই। আমি জানি তিরিশ চল্লিশটা বড় বড় ছেলের মধ্যে একজন মহিলাকে এভাবে ঘুমাতে পাঠানো অন্যায় অশোভন। ঘুমের ঘোরে তার শরীরের কাপড় সরে যেতে পারে, ধ্রুবপদের লেখক লিখেছে–বোবাদের কাম চেতনা ভীষণ প্রবল। কেউ তার শরীর ছুঁতে পারে। তবু বাধ্য হই এক অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত করতে। বুকের মধ্যে ধিকি ধিকি আগুন জ্বলে আমার। এ আগুন অপমানের আগুন। চির অপমানিত অক্ষম মানুষের মনের মধ্যে অহর্নিশি যে আগুন জ্বলে, তা কোন না কোনো একদিন দাবানল হয়ে যেতে পারে। দর্পী দম্ভী অহঙ্কারিরা তা জানে না।
এখন এই মধ্যরাতে ছাদে দাঁড়িয়ে তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার সেই প্রাজ্ঞ-মহাগুরুর মুখটা মনে পড়ল।যিনি বলেছিলেন–এখানে ওখানে সাবধানে, এদেশে ওদেশে পৃথিবীর সর্বত্র শক্তিমানদের হাতে নির্বল, ধনবানদের হাতে নির্ধন, ক্ষমতাবানদের হাতে সাধারণ মানুষ নিগৃহীত অপমানিত অত্যাচারিত হচ্ছে। অতীতে দিনে হয়েছে, আজ হচ্ছে আগামী দিনেও হতে থাকবে। কোনদিন এর বিনাশ নির্মূল হবে না।
শাস্ত্রে বলে, যখন পৃথিবী পাপে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, অর্ধামিকের দ্বারা ধার্মিক লাঞ্ছিত হয়, ভগবান অবতার রূপে পৃথিবীতে আসেন এবং পাপীদের বিনাশ করে পুনঃ শান্তিস্থাপন করেন, ধর্মরাজ্য প্রবর্তন করেন। বারবার আসতে হয় তাকে, বার বার কারণ পাপ আর পাপীকে স্বয়ং ভগবানও সম্পূর্ণ বিনাশ করতে পারে না। তার বীজ কোথাও না কোথাও গুপ্ত রয়ে যায়। যা আবার কিছুকাল পরে পল্লবিত হয়ে ওঠে। পৃথিবীকে মানুষের অ-বাসযোগ্য করে ফেলে।
এই জন্যই ভগবান এক পরশুরাম অবতারে একুশবার ক্ষমতায় মদমত্ত ক্ষত্রিয়কুলকে নিধন করে পৃথিবীকে ক্ষাত্রমুক্ত করেছিলেন। একুশবার কেন? একবার কেন নয়? ডাইনোমোরাস আর জন্মাবে না কারণ তার বীজ বিলুপ্ত। অত্যাচারি বার বার জন্মাবে কারণ বীজ মজুত আছে। তাই, বাঁচতে হলে মানুষকে বার বার কুঠার তুলতে হবে। পরশুরাম হতে হবে, ভগবান হতে হবে। এই মহা সংগ্রাম নিরন্তর চলবে। চালাতে হবে।
আমি এক অতি সাধারণ মানুষ। আমি দেখিনি তবে শুনেছি, এই দেশে নাকি এক সময় ইংরেজ শাসন ছিল। তারা নাকি ভীষণ অত্যাচারি ছিল। সেই অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে মানুষ উঠে দাঁড়িয়েছিল। তারা চলে গেল। তাদের শূন্য আসনে যারা গিয়ে বসল, কালে কালে তারাও সব একই রকম অত্যাচারি হয়ে উঠল। সত্তরের দশকের সেই কালো দিন আমি নিজের চোখে দেখেছি।
আবার তাদের সরিয়ে মানুষ নিয়ে এল আর এক নতুন শাসক। ক্ষমতা হাতে পাবার সাথে সাথে মরিচঝাঁপির নৃশংস নর সংহার-ধর্ষণের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছিল তাদের পথ চলা। হাজার হাজার নিরন্ন-প্রতিবাদী মানুষের মৃত দেহ মাড়িয়ে নেতাই পর্যন্ত গিয়ে থামবে তাদের স্বৈরাচারের রথ–! থামাবে সেই মানুষই।
তারপর আসবে অন্য কেউ। কে আসবে, কেমন হবে সেই শাসক তা এখনো অজানা। জানিনা তখন মানুষ তার কুঠারখানা বর্জন করতে পারবে কী পারবে না। সে বলবে সময়।
আমি সে সময় থেকে অনেক দূরে, দশ বারো বছর পিছনে দাঁড়িয়ে আছি এক খোলা আকাশের নীচে। আমার হাতে কুঠার নেই আছে ছোট একটা দু টাকা দামের কলম।
***
অনু এখন তার মায়ের কাছে আছে। একমাস থাকবে। আমি মাঝে মাঝে তালদিতে যাই। তালদিতে মাছের বড় বাজার। জ্ঞান হবার পর এই প্রথম আমার ছেলে মেয়ে ইলিশ মাছের স্বাদ পেল। বস্তারে যা পাওয়া সম্ভব নয়।
একদিন অনু এসেছে স্কুলে। আমরা যাবো সোদপুর। যোগেন সেনগুপ্ত এই সময়ে সেখানে থাকেন। তিনি অনুকে শুধু যে চেনেন তা নয়–ভালোও বাসেন। তিনি কলকাতায় আছেন জেনে অনু একবার দেখা করতে চায়। বহুকাল তার সাথে দেখা নেই তাই আমারও ইচ্ছা দেখা করার। “বহতা নদী আর রমতা যোগী” জীবন যোগেনদার। কখন যে কোথায় থাকে তা সে নিজেও জানেনা। মনে ভাবি, আমরা যে যাচ্ছি সোদপুরে তার বাড়িতে, সেটা একবার ফোন করে জানিয়ে দেওয়া দরকার। ফোন স্কুলে আছে বেশ কয়েকটা। সব কর্মচারিই দরকারে এখান থেকে ফোন করে থাকে। বাল্যবন্ধু তো একটা ফোন রোজ সকালে সাতটা থেকে নটা দশটা পর্যন্ত একাই কজা করে বসে থাকে। কথার পরে কথা-যেন গোটা উপন্যাস পড়ে যায়। আবার সন্ধে থেকে অনেক রাত পর্যন্ত চলে এই পাঠ। মাদার অবশ্য একবারে এত কথা বলে না, তবে দিনে পাঁচ দশবার তারও দরকার পড়ে ফোন করার। সে তা করে থাকে। তাই আমার মনে হয় একটা ফোন আমিও করতে পারি।
