সেদিন দুপুরটা বেশ আনন্দে কেটে গেল আমার। এতদিন পর পরিবার পরিজনকে কাছে পেয়ে মনটা খুশিতে ভরে গেছে। খুশি মনেই রাতের রান্না শেষ করে বোবা বাচ্চাদের খাইয়ে দিলাম। তারা চলে গেল ঘুমাতে আমার হেল্পারও বাড়ি চলে গেল। এরপর আমরাও খেয়ে নিলাম। এবার আমরাও ঘুমাব।
কোথায় ঘুমাব আমরা? অনুর প্রশ্নের জবাবে বলি–এতবড় ছাদ। যেখানে হোক শুয়ে পড়লেই হল। তখন আমার মনে ছিল না যে এখানে একজন ইতর প্রজাতির অসভ্য প্রাণী আছে। যে তার ক্ষমতার মদমত্ততায় শ্রীল অশ্লীল সব সীমা পার করে যেতে পারে।
ব্যাপারটা তার মাথায় সারাদিনে একবারও আসেনি, নাকি একেবারে শেষ সময়ে ওস্তাদ খেলোয়াড় যে রকম তুরুপের তাসটা দেখায় সেই ভেবে চুপ করে ছিল তা কে জানে। তখন সে শেষ বিল্টুদায় জানিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমেও গিয়েছিল। দু’দশ ধাপ নেমে আবার উঠে এল ছাদে।
… আর একটু পরে সারা স্কুল নিঝুম হয়ে যাবে। শুধু স্কুলই কেন বিশ্বচরাচর ঢলে পড়বে ঘুমের ঘোরে। আকাশে এখন চাঁদ উঠেছে। আজ বা কাল হয়তো পুর্ণিমা, তাই চাঁদ এখন পূর্ণাবয়ব। মধ্যরাতে আধা গ্রাম আধা শহর এই অঞ্চলের মাঠপাথার ভেসে যাচ্ছে রূপপাগলা উজ্জ্বল জোছনায়। দক্ষিণ দিকে থেকে বইছে মৃদুমন্দ বাতাস। দিনের দাবদাহ শেষে দক্ষিণা বাতাসে শরীর মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এখন বড় মন কেমন করা পরিবেশ। এই রকম পরিবেশে দীর্ঘ বিরহের পর প্রিয় সান্নিধ্য পেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়। শরীরে শোনিতে শ্বেত কণিকায় বিদ্যুৎ প্রবাহ দৌড়ায়।
আমারও এমন হবে। অনুরও হবে। প্রায় দুবছর কাল দুজন দুজনকে ফেলে দুরে আছি। আজ এতদিন পরে নিরালা এক অবসরে দুজন দুজনকে কাছে পাবো। এই অবস্থায় আমি যে রকম–অনুর মনেও নিশ্চয় শতেক কল্পনার ফানুস উড়েছে রামধনুর সাত রঙ মেখে। সঙ্গ সুখ কামনায় শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে বার বার।
সেই সুখের কল্পনার ফানুসটাকে ফাটিয়ে দিতে হবে। ফাটিয়ে দেবার মধ্যে একটা বিভৎস আনন্দ রসের সন্ধান পেয়েছে ওয়ার্ডেন। তাই ছুটে এসেছে ছাদে। আহঃ উপোসি স্বামী উপপসি স্ত্রী দুজন দুজনকে যখন একান্তভাবে চাইছেবিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে দুজনকে। এক বিছানায় স্বামী আর এক বিছানায় বউ। দুজন দুদিকের বিছানায় শুয়ে ছটফট করবে। পেটে এক আকাশের খিদে, খাবার আছে হাতের নাগালে, অথচ খেতে পারছে না, সেই আক্ষেপে শরীর মন পুড়বে, ঘুম আসবে না কারো চোখে, সে যে কী নিদারুণ মজা।
তখন আমি রান্নাঘর থেকে সবে ছাদের এক কোণে–যেখানে অনু ছেলে মেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়েছে সেদিকে পা বাড়িয়েছি আমাকে ডাকে ওয়ার্ডেন–শোনেন। একটা কথা শুনে যান।
বলেন।
বউদি কোথায় ঘুমাবে?
ওই তো বিছানা বিছিয়ে শুয়েছে। একটা রাত তো, কেটে যাবে।
না, এখানে শোয়াবেন না। আপনি যেমন থাকেন–ছাদে থাকুন। বউদিকে হোস্টেল রুমে পাঠিয়ে দিন। অনেক খাট খালি আছে, তার একটায় গিয়ে শুয়ে পড়ুক।
তার গলার সুর নরম কিন্তু তাতে যেন মেশানো আছে ধারালো লোহার গলানো ছুরি। অন্ধকারেও তার চোখ দুটো জ্বলছে। যে চোখের দৃষ্টিতে ফুটে আছে হিম শীতল সর্পিল বক্রতা। এই চোখ আমি চিনি। আর চিনি বলেই তার দুরভিসন্ধিতে রাগে শরীর জ্বলে আমার।
তার দাদারা নেতা। দাদাদের ক্ষমতায় সে ক্ষমতাবান। তাবলে সে সব কিছুতে ক্ষমতার দাপট দেখাবে? এটা তো সরাসরি অন্যায়, ইচ্ছাকৃত দমন পীড়ন অত্যাচার। হতে পারে সে আমার বস, তবু আমাকে আমার স্ত্রী বাচ্চার সাথে থাকতে দেবে না, এত অধিকার তার কী আছে? আছে, কারণ সে বড় সাহেবের প্রিয়পাত্র। এর সব অধিকার আছে।
তবু বলি, কেন? আমার বউ নীচে যাবে কেন? সে যদি এখানে থাকে আপনাদের কী অসুবিধা?
সেই সাতাত্তর সালে যখন বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে, তখনও সে হাফ প্যান্ট ছাড়েনি। তখনই এলাকায় তার ভাইয়েদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছিল। যত সে বড় হয়েছে চারপাশে দেখেছে একদল নত ন্যুজ ভীত মানুষ। যাদের মারলে দাঁড়িয়ে মার খায়, ধমকালে চুপ করে শোনে। তাই এদের যে সমীহ করতে হবে, সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে তা কখনো তার মনে হয়নি। বলতে বলতে এখন বলাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কী বলছে কী তার অর্থ বোঝার মতো বিবেচনা শক্তিও আর নেই।
তাই এখন সে আমার প্রশ্নের জবাবে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে–হোস্টেলে বড় বড় ছেলেরা থাকে। ওরা কথা বলতে পারে না, কিন্তু বোঝে তো সব। সব বোঝে সব জানে। আপনি আর বউদি ছাদে থাকলে তার কী মানে সে ওদের কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। এতে ওদের স্বভাব চরিত্র খারাপ হয়ে যেতে পারে।
টের পাই আমার মাথায় আগুন জ্বলছে। সে আগুন আর আমার আয়ত্বে থাকতে চাইছে না।
বলি–এত বড় বড় বাচ্চা, ওরা সব জানে সব বোঝে। তা ওদের তো বাপ মা আছে, ছোট ছোট ভাইবোনও আছে। ভাই বোন কেমন করে জন্মাচ্ছে সে নিজে কী কার্য কারণে জন্মেছে তাও তো জানে বোঝে। এতে তাদের স্বভাব চরিত্র খারাপ হয়ে যায় না? আমি ছাদে বউ নিয়ে ঘুমালে নীচের তলায় থাকা বাচ্চা খারাপ হয়ে যাবে?
এক মুহূর্ত থমকে থাকে ওয়ার্ডেন, সে এখানে যুক্তি পালটা যুক্তি এসব শুনতে তো আসেনি। এসেছে আমাকে একটা মানসিক বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলে তার জিঘাংসু প্রবৃত্তির খোরাক সংগ্রহ করতে। এসেছে তার নগ্ন তামশ মনোবৃত্তির কদর্য বহিঃপ্রকাশ দ্বারা অপমান করতে।
