***
এক হাজার টাকা অনুকে পাঠিয়েছিলাম। টাকা হাতে পেয়েই সে আট দশ বছরের বনবাস পর্ব থেকে একটু মুক্তির আশায় তার আই.সি.ডি.এস.-এর চাকরি থেকে এক মাস ছুটি নিয়ে এসে পড়েছে কলকাতায়, আমার ঠিকানায়। তাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে এসেছে সেই কেনারাম। এটা তার কোনো নিঃস্বার্থ সেবা নয়, পুরো গাড়ি ভাড়া সহ পথ খরচা সব হিসেব কষে আদায় করেছে। অনুকে আমার স্কুলের সামনে এনে আমার সাথে দেখা করিয়ে দিয়েই সে ফিরতি বাস ধরেছে। সে কাপসীতে একটা রেডিমেড বস্ত্রের দোকান দিয়েছে। এখন বড় বাজার থেকে কিছু মাল কিনে রাতের ট্রেন ধরে ফিরে যাবে। তাই আমার অনুরোধও থাকতে রাজি হল না। অবশ্য সে রাজি হলে বিড়ম্বনায় পড়তে হতো আমাকে। ফলে যা হলো সেটা আমার পক্ষে খুব একটা মন্দ নয়।
অনু যখন আমার স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় তখন বেলা দশটা মতো বাজে। একজনের মুখে খবর পেয়ে ছাদ থেকে নীচে নেমে আসি। কেনাকে বিল্টুদায় দিয়ে তাকে নিয়ে স্কুলে ঢুকতে যাব, পথ আটকায় দাস। ইনি সেই লোক যিনি বোজ চারখানা পত্রিকা পড়েন। মানুষের একটা দোষ বা গুণ। যে পড়াশুনো করে সে বিদ্বান হয়ে যায়। আর কোন বিদ্বান নির্বোধের মত কোনো কাজ করে না। যা করে তা দশদিক দেখে, ভেবে, তবেই করে।
একজন লোক এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে, আমি তৃষ্ণার্ত, এক গেলাস জল দাও। যে বোকা, সটান জল ভরা গেলাস, হাতে ধরিয়ে দেবে। আর যে বিদ্বান, বিচার বিবেচনা করবে। যে জল চাইছে সত্যি তৃষ্ণার্ত তো?নাকি জল খাবার ছুতোয় উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে চাইছে ঘরে এই সময় ক’জন লোক থাকে, আলমারিটা কোন দিকে, কোন যুবতী আছে কী না! সত্যিই যদি তৃষ্ণার্ত হয়, জানতে হবে, এত ঘর ফেলে সে আমারই দরজায় এল কেন? এর পিছনে কোনো চক্রান্ত নেই তো! বুঝতে হবে আজ জল দিলে কাল পরশু আবার আসবে কী না। ভেবে দেখতে হবে, জল দিলে আমার মন নরম ভেবে আবার বাতাসা চেয়ে বসবে কী না!
এত সব বিষয় আগেভাগে অতি অল্প সময়ে যে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাকেই বলে বিদ্বান-বিচক্ষণ-বুদ্ধিমান। দ্বারোয়ান দাস তাই।
বলে সে, রঞ্জনদা একটা কথা বলি, কিছু মনে করবেন না। আপনি তো এখানকার সব নিয়ম জানেননা। বড়দির অর্ডার, কোনো বাইরের লোক উইদাউট পারমিশন, স্কুলে ঢুকবে না। আপনার এসিস্টানের বর কী ঝামেলা বাঁধিয়েছিল মনে আছে তো! এখন যদি আপনার সাথে বউদিকে স্কুলে ঢুকতে দেই, যদি আমাকে বড়দি চাপ দেয়, কার অর্ডারে তুমি এদের যেতে দিয়েছে, আমি কোনো জবাব দিতে পারব না। তাই আমি বলি কি বউদি বাচ্চারা এখানে একটু বসুক। বড়দি হোক কী সুপার কেউ একজন এসে গেলে–আসবার সময় তো হয়ে গেছে, তাদের কারো পারমিশন নিয়ে তখন বউদিকে ভিতরে নিয়ে যাবেন। আর যদি আপনি নিজের দায়িত্বে নিয়ে যেতে চান, যেতে পারেন। তখন যদি বড়দি কিছু বলে আমি কিন্তু বলব যে, আমি বারণ করেছিলাম। তখন সব দায়িত্ব কিন্তু আপনার। এখন ভেবে দেখেন কী করবেন। আমার যা বলার আমি বলে দিলাম।
একটা পুরো দিন, একটা পুরো রাত ওরা বাসে রিকশায় ট্রেনে, ফের বাসে চেপে কয়েকশো মাইল পথ পার হয়ে এখানে এসেছে। অনু, আর সাথে আমার দুটো বাচ্চা। এখন ওদের চান খাওয়া বিশ্রাম দরকার। কিন্তু তার কোনো উপায় নেই। অগত্যা তাদের বসিয়ে রেখে আসি সেই বটগাছের গোড়ায়। তবে বড়দি–মানে টিচার ইনচার্জ এলে তাকে বলে ওদের ভিতরে নেওয়া গেল।
বললেন তিনি, এমনিতে কোনো বাইরের লোক থাকতে দিতে পারি না। তবে ওনারা অনেক দূর থেকে এসেছেন, আজকের দিনটা রাখুন। কাল কিন্তু অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে নেবেন।
সে আমি করব। ওনার বলার দরকার ছিল না। আমার শাশুড়ি এখন তালদিতে আছেন। ভাড়ার ঘর। সেখানেই পৌঁছে দেব।
অনুকে নিয়ে এসে ছাদের যাবার সিঁড়িতে বসার ব্যবস্থা করে দিলাম। ছাদেই জল আছে, স্নান করা যায়। হোস্টেল সুপারের কাছে অনুরোধ করে ওদের খাবার ব্যবস্থাটা করা গেল।
দুপুরে বাচ্চাদের ক্লাস থাকে। তবে ক্লাস না থাকলেও তারা ছাদের দিকে আসে না। আসবার আদেশ নেই। শুধু খাবার সময় আদেশ কিছু শিথিল করা হয়। দুপুরে সিঁড়িতে, আর রাতে বৃষ্টি বাদল না থাকলে ছাদে ওরা খায়। নীচে রান্না খাবার ঘর নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত একদুবছর এই অবস্থা আরো চলবে।
রাতের খাওয়া শেষ হলে বাচ্চাদের হোস্টেল রুমের গেটে তালা পড়ে যায়। ফলে ছাদ একেবারে ফাঁকা। আমি এই ছাদেই থাকি। আমার হেল্পার সকালে এসে কাজকর্ম সেরে দুপুরে বাড়ি চলে যায়। আবার আসে বিকেলে বাড়ি যায় রাত দশটা সাড়ে দশটায়। দুপুরে বা রাতে আমার লেখাপড়া সেও এই ছাদে বা সিঁড়িতে বসে চলে।
প্রাথমিক সমস্যা মিটে যাবার পর বউ বাচ্চাদের দিকে একটু ভালো করে তাকাবার ফুরসত পেলাম। দীর্ঘ দু-বছরের অদর্শনের পর আমি যেন আমার সন্তানদের কাছেই কেমন অচেনা হয়ে গেছি। তারা সর্বক্ষণ কাছে পেয়েছে মাকে, তাকেই গভীর ভাবে চেনে। তাই মায়ের গা ঘেসে শুয়ে বসে থাকছে, আমার কাছে আসছে না। বস্তার জেলার চারদিকে তারা এত ভিড় এত দোর দালান গাড়ির মিছিল দেখেনি। সেখানে সবদিকে পাহাড়, ঘন বনে শাল, সেগুন, বীজা, মহুয়া এই সবের আকাশ ছোঁয়া বৃক্ষ। এখন এত লোকজন হৈ চৈ দেখে তারা কিছুটা ভীত কিছুটা বিহ্বল।
