অভ্যাস মত সেদিন তিনি ছুটির পরে নিজের অফিস ঘরের দরজা ভেজিয়ে ব্যাগ গোছাচ্ছিলেন। অফিসে বড় বড় চার ছটা আলমারি আছে। যে যা দান করে যায় তা ওই সব আলমারিতে সযত্নে রক্ষিত থাকে। তা থেকে কিছু কিছু ব্যাগে ভরে নেন। অনেক দুরে বাড়ি ওনার বাস তারপর ট্রেন তারপর আবার বাস বাসে ট্রেনে আজকাল খুব ভিড়। খুব বেশি ভারি ব্যাগ বহন করা কষ্টকর, তাই অল্প অল্প বহন করেন। এতে কষ্টটা কম হয়ে যায়, নরম কোমল মহিলা দেহ ধকল পায়না। কিন্তু সেদিন বোধহয় ব্যাগটা একটু বেশি ভারি হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বস্ত দারোয়ান বিহারির দরকার পড়েছিল ব্যাগটা বাসে তুলে দিয়ে আসার জন্য। কে জানে সেই বিশ্বস্ত দারোয়ানই বেইমানি করলো, নাকি বোবা বাচ্চাদের বদমায়েশি। একটু পিছিয়ে পড়ে ছিলেন টিচার ইনচার্জ আগে যাচ্ছিল বিহারি। হঠাৎ বড় গেটের সামনে তার পথ আটকে দাঁড়ালো কটা বোবা ছেলে। কি সাহস! বিহারির বার বার ‘মেরা নেহি এ বড় দিদিমণি কা ব্যাগ’ বলা সত্ত্বেও খুলে ফেললো সেই ব্যাগের চেন। তখন বড় লজ্জায় পড়ে যেতে হল স্কুল টিচার ইনচার্জকে। ওরা শুধু বোবাই তা নয়, বোকাও। কিছুতে এদের বোঝানো গেল না যে এটা চুরি নয়। তবে স্কুলের কর্মচারিদের সেটা বোঝাতে পেরেছিলেন।
চুরি কাকে বলে? চুরি হচ্ছে পরের দ্রব্য না বলিয়া নেওয়া। লক্ষ্য করার বিষয় এখানে পরের দ্রব্য বলা হয়েছে। কিন্তু যে দ্রব্য নিজের তা নিয়ে যাওয়াকে কোনমতে চুরি বলে না। আর বলতে চাইলে বা কাকে বলবেন, উনিই তো সর্বেসর্বা, তাহলে তো নিজের কানে নিজেই বলতে হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে উনি নিজের দ্রব্য নিজে নিয়ে যা করেছেন সেটাকে আর যা বলা হোক, বাচ্চারা যা বলছে তা নয়। খুব বেশি হলে এটা বলা যেতে পারে যে স্কুলের বাচ্চাদের না দিয়ে উনি অন্য কাউকে এসব দিতে চেয়েছিলেন। সেটা প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একটা ভুল হতে পারে কিন্তু চুরি কি করে হবে? ভুল আর চুরি কি এক? ভুল কার না হয়? এবং এই স্কুলে তো সবারই ভুল হয়। যার যেমন ক্ষমতা সে সেই অনুসারে ভুল করে থাকে। যার উপর সবজি বাগানের ভার সে ভুল করে লাউটা মুলোটা হোস্টেলের রান্না ঘরে না পাঠিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে। যার উপর বাজার করার ভার বারোটাকা কিলোর চাল কিনে ভুল করে ষোল টাকা লিখছে। যার উপর স্কুলের পাখা, লাইট, চেয়ার-টেবিল কেনার বা মেরামতির ভার সে তত ভুল পাহাড়ের উপর বসে আছে। ভুল বাদ দিলে এখানে মানুষই খুঁজে পাওয়া যায় না। তাহলে একা আমার ভুল কোথায়? একথায় সবাই ম্যাডাম কি বলছেন তা বুঝে নেয় এবং খুব হাসে। তবে মুখ টিপে।
এখন সেই টিচার ইনচার্জের ঘরে যেতে হল আমাকে। বড় গুরুতর অভিযোগ আমার নামে। বাচ্চাদের অসুস্থ করে দিয়েছি। সে ঘরে ম্যাডাম ছাড়া আর একজন আছে। তার বাড়ি ওই বড়দির পাশের গ্রামে। ছেলেটার সবচেয়ে বড় গুণ গান গায় আর দারুণ হাসে। ছবিও আঁকতে জানে। সব মিলিয়ে একজন শিল্পী মানুষ। একে ম্যাডাম নিয়ে এসেছেন বাচ্চাদের অংকন শেখাবার জন্য। গান তো আর শেখাতে পারবে না। কি আর করবে, আঁকাই শেখাক। মুকাভিনয় শেখাবার জন্য একজন, নাচ শেখাবার জন্য একজন, আগে এই দুজনকে আনা হয়েছে। যদিও মুকাভিনয়ের মাস্টার ছাত্রদের চাইতেনাচের দিদিমণিকে মুকাভিনয়ে মুগ্ধ করার জন্য এবং নাচের দিদিমণি মুকাভিনয়ের মাস্টারকে নৃত্যকলায় বস করার জন্য শিক্ষক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেলেছে। তবু এটা সত্যি স্কুলের কিছু ছেলে কিছু মেয়ে ওই দুটো কলায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে। এবার অংকন কলায় পারদর্শী হোক। সপ্তাহে দু দিন সে ওই শিক্ষা দিয়ে যায়। সেই দুদিন সে ম্যাডামের সাথেই বাড়ি ফেরে। লোকের সামনে ম্যাডামকে বড়দি বললেও, আসলে সে দুর সম্পর্কের বউদি। এখন দেওর বউদির হাস্য পরিহাস নয়, অত্যন্ত গুরুগম্ভীর একটা আলোচনা চলছিল। সেটা হচ্ছে, যদি তুলি বড় বাজার থেকে না এনে বারুইপুর থেকে আনা হয় তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়। এটা লিচুর সময়। বারুইপুরের লিচুর খুব নাম ডাক। রংয়ের বিলে লিচুর দামটা ঢুকিয়ে দিলে কেনাটা বেশ আরামদায়ক হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় দরজায় গিয়ে বলি, আসবো বড়দি?
এসো। বড়দি অংকন মাস্টারের দিক থেকে আমার দিকে ফিরলেন তারপর বললেন–তুমি এককালে নাকি বিপ্লব করতে গিয়ে জেলে গিয়ে ছিলে যার বুকে মানুষের জন্য দরদ নেই, ভালোবাসা নেই আন্তরিকতা নেই, সে কি করে বিপ্লব করতে পারে!
বলি, আপনি কি বিশ্বাস করেন বাচ্চাদের খাবারে আমি খইনি ফেলে দিয়েছি?
ফেলে যে দিয়েছো সেটা বলছি না। পড়ে যেতে পারে। পড়ে যাওয়াটাও কোনো বড় ঘটনা নয়। কিন্তু আসল হল দরদ। যার বুকে দরদ থাকবে তার হাত থেকে যদি তেতো খাবার পরিবেশন হয় তা ওই হাতের ছোঁয়ায় মিষ্টি হয়ে যায়। আগে যা হয়েছে তা হয়েছে। তখন বেতন পেতে না, যেমন ইচ্ছা কাজ করেছো, আমার বলার কিছু ছিল না। কিন্তু এখন যদি কাজে কোনো ফঁকি দাও বা অযত্ন করো আমি কিন্তু স্টেপ নিতে বাধ্য হবো। সোজা সাসপেন্ড করে দেবো।
আমি ম্যাডামের প্রবচন শুনে ছাদের দিকে তাকাই। ভয় হয়, ঘরের ছাদ না খসে পড়ে। শুনেছি কবে কোথায় নাকি একটা প্লেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। আকাশ ছিল পরিষ্কার, প্লেনে কোনো যান্ত্রিক গোলযোগও হয়নি। তবে এ দুর্ঘটনার কারণ কি? পরে প্লেনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ব্ল্যাক বক্স খুঁজে পেয়ে যাত্রীদের কথপোকথন রেকর্ড করা টেপ থেকে যা জানা গেল, তা হচ্ছে পাশাপাশি বসা এক সুদখোর আর এক কষাই ধর্ম মানবতা অহিংসা জীবসেবা এসব নিয়ে আলোচনা করছিল। এতেই শান্ত আবহাওয়া বিরূপ হয়ে যায়। দুর্ঘটনায় পড়ে যাত্রীবোঝাই প্লেন। কেন কে জানে, আমার ধারণা হয়, ম্যাডামের মুখে এই সব অশোভন বাক্য প্রকৃতি সহ্য করবে না। ভূমিকম্প হয়ে যেতে পারে।
