হক কথা, মূল্যবান কথা ওয়ার্ডেনের। এক বদমায়েস বলেছিল–কী বলব দাদা, মারতে মারতে জুতো ছিঁড়ে ফেলেছিল তবু আমি অপমানবোধ করিনি।
আবার কখনো কখনো অপমানও ফিরে আসে মহা সম্মান হয়ে। ঘটনাটা আমার জানা। আমি তখন বস্তারে থাকি। মধ্যপ্রদেশের বস্তার জেলার জেলা শাসক ছিলেন ড. ব্রহ্মদেও শর্মা। এই জেলা তেন্দুপাতা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। যে পাতায় বিড়ি বানানো হয়। এই বিড়ি পাতার মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে ড. শর্মার সঙ্গে তৎকালীন মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন সিং-এর সাথে বিরোধ বাধে। অর্জুন সিংয়ের মনে হয় একশো বান্ডিল পাতা ভাঙার মজুরি বারো টাকা দিয়ে ঠিকাদাররা কোনো অন্যায় করছে না। ড. শর্মার মনে হয় ঠিকেদাররা ভোলাভালা আদিবাসী মানুষগুলোর সরলতার সুযোগ নিয়ে ঠকাচ্ছে। দু জনার বিরোধ চরমে উঠলে ব্রহ্মদেও শর্মা চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন। এবং বস্তার জেলার আদিবাসীদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন ভারত জন আন্দোলন নামে এক সংগঠন। এই আন্দোলনে অন্য বহু সংগঠন যোগ দেয়। বিশেষ করে ছত্তিশগড় মুক্তিমোর্চা ও জনযুদ্ধ গোষ্ঠী। জল জঙ্গল জমিন হো জনতাকে অধীন এই দাবিতে সে আন্দোলন বস্তার ছাড়িয়ে মধ্যপ্রদেশের সব জেলায় বিস্তৃতি লাভ করে। এই আন্দোলনের ফলে তেন্দুপাতার উপর থেকে ঠিকেদারি প্রথা খতম হয় এবং ধাপে ধাপে মজুরি বেড়ে যারো থেকে পঞ্চাশ টাকা হয়ে যায়।
এটা ঠিক যে অর্জুন সিং কংগ্রেস নেতা এবং সে তেন্দুপাতার মজুরি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে। কিন্তু সাথে সাথে এটাও ঠিক যে ঠিকাদাররা কেউই কংগ্রেস নয়, তারা আগে ছিল জনসংঘ এবং এখন বিজেপি। এদের একটা বড় ঘাঁটি আছে। বস্তার জেলার সবচেয়ে বড় শহর জগদ্দলপুরে। এরা বিড়ির পাতার ঠিকেদারি সমাপ্ত হওয়ায় এবং ভারত জন আন্দোলনের মাধ্যমে আদিবাসী মানুষকে সচেতন সংগঠিত করায় ব্রহ্মদেও শর্মার উপর সন্তুষ্ট ছিল না। একদিন এরা নাগালে পেয়ে গেল ড. শর্মাকে। সে ছিল একা এরা ছিল অনেক। তারা ড. শর্মাকে ধরে তার জামা-কাপড় সব ছিঁড়ে গায়ে গোবর জল ঢেলে চোরের মত কোমরে দড়ি বেঁধে সারা শহরময় ঘোরালো। পরের দিন তার নগ্নদেহ সহ ছবি সংবাদ ছাপা হল মধ্যপ্রদেশের সবকটা বড় কাগজে। দিল্লি বসে সে খবর পড়লেন আর্য সমাজি নেতা স্বামী অগ্নিবেশ। তারপরই তিনি চারশো অনুগামী নিয়ে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ধর্ণায় বসে পড়লেন সংসদ ভবনের সামনে। যে ব্রহ্মদেও শর্মার অপমানে বস্তার জেলার বিজেপি বড় আনন্দ পেয়েছিল সেই বিজেপির সর্বোচ্চ নেতা অটলবিহারী তাদের কর্মীদের অসদাচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। প্রতিশ্রুতি দিলেন পুনবার এমন ঘটনা না ঘটার। ব্রহ্মদেও শর্মা যে ঘটনায় অপমানিত হয়েছিলেন সেই ঘটনাই তাকে পৌঁছে দিয়েছিল গান্ধীতুল্য সম্মানের আসনে।
“সম্মান কোনো কাঁচের বাসন নয় যে ঠোকর লাগলে ভেঙে যাবে। সম্মান তো একইস্পাতের মুকুট যা নিজে থেকে না ভাঙলে কেউ তাকে ভাঙতে পারে না।” টিচার ইনচার্জ সে সম্মান ক্ষুণ্ণ হতে দেননি। এটা ঠিক যে তাকে নিয়ে লোকে হাসাহাসি করে নোংরা আলোচনা করে। তাতে কি যায় আসে? দুনিয়াকে হামাম মে হাম সব নাঙ্গা হ্যায়। পৃথিবীর স্নান ঘরে সব মানুষই ন্যাংটা। তফাৎ এই যে, যার চাল ঝড়ে উড়ে গেছে তাকে কেউ কেউ দেখে ফেলেছে। তবে তার চিন্তার কারণ অন্য, স্কুলের বোবা বাচ্চারা যাদের বয়েস কুড়ি বাইশ বা তার বেশি তারা যেন কেমন এক বিচ্ছিরি নজরে আজকাল তাকে দেখে। মনে হচ্ছে, অতো যে ভয় পেতো সম্মান দিতো কোথায় যেন একটা ফাটল ধরেছে। মনে হচ্ছে ওরা বোধহয় কথা বলা লোকদের মানসিক অসুখে সংক্রামিত হয়ে পড়েছে। এটা খুব ভালো লক্ষণ নয়–কয়েক দিন আগে এক সেভেন পড়া ছাত্রকে সেভেন পড়া বাচ্চা’ ভেবে পড়া না পারার জন্য চড় মেরেছিলেন তিনি। তখন তার মনে ছিল না যে সে অনেক দিন আগে কুড়ি পার করে দিয়েছে। চড় খেয়ে সে আগে যা করেনি সেদিন তাই করল। এমন ঝটকা দিল বড়দির হাতে যে সেই হাত ঘুরে নিজের গালে লাগলো। চোখ থেকে আটশো টাকা দামের চশমা পড়ে খান খান। আর কুড়ি নয় কিছু কম বয়েসের অন্য একটা ছেলে একদিন যা করল সে তো এর চেয়ে খারাপ, চিন্তার অতীত নিন্দার অতীত।
এখানে যেসব ছেলেমেয়ে থাকে সেই সব প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের জন্য কোনো কোনো ব্যক্তি সংস্থা সেবা প্রতিষ্ঠান নানা ধরনের খেলনা, খাবার দাবার, জামা কাপড়, কম্বল এসব দিয়ে যায়। দান ভারতীয় সংস্কৃতিতে একটা পুণ্যের কাজ। কিন্তু দাতাদের অনেকের জানা নেই, এখানকার সব বাচ্চা গরিব নয়। কেউ কেউ তো এমন ঘরের সন্তান, যে ঘরের সদস্যদের চোখে দান দাতাই এত দুঃস্থ যে সেই দান পাবার যোগ্য। কিন্তু তাদের সন্তান এখানে সে ধনাত্তপ দর্শাতে পারে না। থাকে হীন দীন বালকদের মতই। দীন হীনদের মতই অপরের অনুগ্রহ হাত পেতে নেয়। আর সবাই যে এমন তুচ্ছ নগণ্য কমদামি দান দিয়ে বড় সাহেবের নেক নজরে থাকতে চায় তা নয় কেউ কেউ বিশেষ করে বিদেশি কিছু সংস্থা যে সব খেলনা খাবার শ্রবণযন্ত্র দিয়ে যায়, তা সত্যিই খুব দামি। তারা এগুলো বড়দির কাছে জমা দিয়ে আশা করে যে সময়মতো বধির বাচ্চাদের কাছে ঠিক পৌঁছে যাবে। পৌঁছে যায়, তবে সবটা নয়, কিছু কিছু। আর বাকিটা টিচার ইনচার্জ তার পছন্দের কিছু কিছু শিক্ষক শিক্ষাকর্মীকে ভাগ করে দেন। কিছুটা ব্যাগে ভরে স্বদেশে নিয়ে যান দান করবেন বলে। এটা তার রুটিন কাজ। সবদিনই তিনি এটা করে থাকেন। স্কুল মাস্টারির চাকরিতে কি বা এমন মাইনে? যা কিছু দু পয়সা তা এই পথে আসে। কানে শোনার একটা মেশিন ছয় সাত হাজার টাকা দাম। প্রতি মাসে গোটা চার ছয় নিয়ে গিয়ে ধরা দোকানে বেচতে পারলে মোটামুটি পুশিয়ে যায়। সদ্য সদ্য উনি একটা গাড়ি নিয়েছেন, তার মেনটেন্টে খরচা কি কম! এ সব না করলে তা আসবে কোথা থেকে?
