জীবন তো আসলে এক অভিজ্ঞতার আঁধার। এই জীবনে যে কত কিছু শিখলাম কতভাবে মানুষকে চিনলাম। যদি জীবনে সবচেয়ে কাউকে ভালোবেসে থাকি তা বেসেছি মানুষকে। পাহাড় নয় নদী নয়, সোনালি ফসল ভরা ক্ষেত নয়, পাখির সুমধুর গান নয়, সবুজ অরণ্য, সুমিষ্ট ফলভারে নত বৃক্ষ নয় শুধু মানুষ আর মানুষের যা কিছু প্রিয় এবং প্রয়োজনীয়। মানুষের চেয়ে মূল্যবান আমার কাছে আর কিছু নেই। আবার সবচেয়ে যদি কারো ব্যবহার আমাকে ব্যথিত পীড়িত ক্রুদ্ধ করে থাকে যদি কাউকে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত দুষ্ট ধূর্ত মনে হয় সেও ওই মানুষকেই হয়েছে।
আমি সেই বাপের সন্তান যে মাসের পর মাস না খেয়ে কাটিয়েছে। তবু ঘরে যেদিন উনুন জ্বলত আর কিছু ভালোমন্দ রান্না হতো, রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকত কোনো একজন অতিথির আশায়। মানুষকে খাইয়ে সে এত আনন্দ পেত যা নিজে খেয়ে পেত না। সেই আমি সেদিন একদল মানুষের বক রাক্ষুসে খাওয়া, আর খাদ্যের অপচয় দেখে জীবনে কোনোদিন উচ্চারণ করার মানসিক সাহস ও শান্তি পাই না যে, অতিথি দেবঃ ভবঃ।
পরের সেই ব্যাচও আগের ব্যাচের মতই খেয়েছিল। যতটা খেয়েছিল তার চেয়ে নষ্ট করেছিল ঢের বেশি। কিছু পাচার করেছিল আমার নজর বাঁচিয়ে নীচে ওদের শোবার খাটের তলে, পরের দিন খাবে বলে। আর যেটা সবচেয়ে জঘন্য সবচেয়ে নিন্দনীয় ছাদ থেকে গোছা গোছ লুচি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল নীচে, স্কুলের পিছনের এক পচা ডোবায়। পরের দিন সকালে আলো ফোঁটার পর সে দৃশ্য দেখে কেন কে জানে বুকটা মুচড়ে উঠেছিল আমার। দিনের পর দিন মাসের পর মাস খেতে পাইনি। খাদ্য আমার কাছে ভগবান। তার এত অনাদর?
সমস্যাটার এখানেই শেষ হল না। লুকিয়ে রাখা সেই বাসি লুচি খেয়ে পরদিন বিকেল থেকে প্রায় তিরিশ পঁয়ত্রিশটা বাচ্চার শুরু হয়ে গেল বমি পায়খানা। রাত যত বাড়ে তত বাড়ে পায়খানার সামনে লম্বা লাইন। দশ বারোজন তো শুয়ে পড়ল বিছানায়। চারজনের অবস্থা সংকটজনক হয়ে উঠল। নুন চিনির ঘোল খাইয়েও তাদের ঠেকানো গেল না। ডাক্তার ডাকতে হল।
এমনিতে এইসব বোবা বাচ্চারা আমার উপর সন্তুষ্ট নয়। ওরা একটা পেঁয়াজ দুটো কাঁচা লঙ্কা একটু তেল চাইলে দিতে পারি না। কি করে দেব? হোস্টেল সুপার যা মাল মশলা দেয় তা যথেষ্ট কম। সে দিয়ে দিলে রান্না কী করে করব? একজনকে দিলে অন্যরাও চাইবে। যাকে না দেব সে রেগে যাবে। এই কারণেই দিই না।
এবার সেই অসন্তুষ্টির আগুনে খানিকটা ঘি ঢেলে দেয় বাল্যবন্ধু। আরে বোকা বুঝতে পারছিস তোদের পেট খারাপ কেন হল! তোরা বা কি করে জানবি আমি ডাক্তারি লাইনের লোক আমি জানি। তোদের খাবারে খইনি ফেলে দিয়েছে। বড় সাহেব কইছে তগো খাওয়াইতে হইবো। পকেট থিক্যা টেকা যাইতেছে আছে, সেই রাগ।
শাস্ত্রে শব্দকে বলা হয় ব্রহ্ম। যে শব্দ থেকে বঞ্চিত সে ব্রহ্মা থেকে বঞ্চিত। বোবা বাচ্চাগুলো বড় অভাগা। ওরা কোনদিন শোনেনি কোনো মন্ত্র কোনো স্তব কোন কবিতা কোন সঙ্গীতের সুমধুর সুর। মনের সুকুমার প্রবৃত্তির অর্গলমুক্ত করা শ্ৰব্য মাধ্যম থেকে বহুদূর জগতের এই বাসিন্দাদের বুদ্ধি বৃত্তির উপর তাই জমে গেছে একটা পুরু প্রলেপ। যা ভেদ করে কোনো সূক্ষ্ম অনুভূতি প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়ে গেছে। সেখানে যা প্রবেশ করে তা অতীব স্থূল কদাকার কিছু বিষয়। আর যা একবার প্রবেশ করে, তাকে নিষ্কাশন কঠিন কর্ম।
এই সহজ সত্যের পথ ধরে বোবা বাচ্চারা বিশ্বাস করে নেয়, আমি খইনি ফেলে দিয়েছি। আমি খইনি খাই, আমার কাছে খইনি থাকে সেটা তো জানে। তাই খেপে যায় তারা আমার উপর।
কৃতজ্ঞতা–এই শব্দটা প্রতিবন্ধী অভিধানে বড় রুগ্ন, অপুষ্টি আক্রান্ত। সে শব্দ এদের মনে কোনো আঁচড় কাটে না। বাবা ভাই বোন পাড়া-প্রতিবেশী সমাজ দেশ রাষ্ট্র সব এদের চোখে প্রতিপক্ষ। শত্রু। যা চেয়েছিল ওয়ার্ডেন যা চেয়েছিল বাল্যবন্ধু এবং আরো অনেকে তাই হয়ে যায়। একমুহূর্ত বদলে গেল পুরো পরিবেশ। মনে হল আমি যেন একঅগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হলাম। চারপাশে দাউ দাউ লেলিহান শিখা। কেউ আমার পাশে নেই, আমি একা পুড়ছি আর পুড়ছি। রাবণের চিতার মতো এ আগুন জ্বলতেই থাকবে। যখনই একটু নিভু নিভু হয়ে আসবে কেউ না কেউ চিতায় একটা কাঠ গুঁজে দেবে।
ভারতবর্ষের পাশের দেশ চীন।দু দেশের মধ্যে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। সীমান্তে কী এক ভুল বোঝাবুঝিতে মাত্র দুটো গুলি চলেছিল দু’দেশের মধ্যে। তাতেই উড়ে গেছে হাজার বছরের বন্ধুত্ব। এরপর পঞ্চাশ-ষাট বছর কেটে গেছে তবু সেই ফাটল আজো জোড়া লাগেনি।
আমার আঠারো-কুড়ি বছর হয়ে গেল বধির বিদ্যালয়ে। সেদিন যারা বমি পায়খানা করেছিল তারা আর কেউ নেই। তবু যারা নতুন এসেছে তারাও কোনো কারণে পেট খারাপ হলে আঙুল তোলে আমার খইনির দিকে।
***
একবার টিচার ইনচার্জ স্কুলে বড় বেইজ্জত হয়েছিলেন। সেটা অবশ্য অন্যসব লোকের ধারণা, যা ঘটেছিল তাতে নাকি তার মানহানি ঘটেছিল। তবে এটা একান্তই ব্যক্তি বিশেষের মানসিক গঠনের উপর নির্ভর করে। যেটাতে একজন অপমান বোধ করে আর একজন নাও করতে পারে। ওয়ার্ডেন বলে, সম্মান কোনো কাঁচের বাসন নয় যে টোকা লাগলে ভেঙে যাবে। সম্মান হচ্ছে লোহা, সম্মান হচ্ছে ইস্পাত যা সহজে নষ্ট হয় না। নষ্ট হয় যদি সে নিজে অপমানিত বোধ করে।
