আমার কোনো উপায় ছিল না, না হারিয়ে। তাই হারিয়েছি। এই হার রুনু গুহ নিয়োগীর বর্বরতার। বিজয়, সমস্ত শ্রমজীবী জনতার। কারণ, আমি যে তাদেরই প্রতিনিধি।
***
১০. চাকরির নিয়োগপত্র
পাক্কা এক বছর কেটে গেল আমার আশায় আশায় এই বুঝি চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পাব। মাঝে মাঝে বস্তার থেকে অনুর চিঠি আসে–তুমি কী করছো, কেমন আছো? আমি যে আর সংসার চালাতে পারছি না। জিনিসপত্রের দাম-ছেলে মেয়ের পড়ার খরচ বেড়ে গেছে। আমার এই সামান্য পয়সায় কী চলে!
জবাবে আমি লিখি–অনেক কষ্ট করেছে, আর কয়েকটা মাস ধৈর্য ধরো। জুন মাসের দশ তারিখ পর্যন্ত দেখব। তার মধ্যে কিছু না হলে আমি বস্তারে ফিরে যাব। তারপর যা হয় হবে।
জুন নয় এপ্রিলেই নিয়োগপত্র পেয়ে গেলাম। অর্থাৎ চাকরিটা হয়ে গেল আমার। চাকরি তো হল, কিন্তু বেতন আর হয় না। শেষে প্রায় পাক্কা এক বছর পরে মাসে আড়াই হাজার টাকা হিসাবে পুরো মাইনে পেয়ে গেলাম।
প্রথম বছর–ওটার কোনো হিসেব নেই। ওটা গেছে স্বেচ্ছাশ্রম। পরের বছরের তিরিশ হাজারের বাইশ হাজার কেটে নেওয়া হল দান হিসাবে। আমার একার নয় প্রত্যেক কর্মচারির কারো বিশ কারো পঁচিশ হাজার এইভাবে কাটা হয়েছে চাকরি দানের প্রতিদানে। সবার মতো আমিও বধির বিদ্যালয়-এর সভাপতির সই করা একখানা বিল পেলাম সংগ্রহে রাখার মতো।
দান করতে হবেই এটা তার নির্দেশ। সে নির্দেশ অমান্য করবে এই স্কুলে এমন বুকের পাটা কার? এবং কে কত স্বেচ্ছায় এবং সানন্দে দান করবে সে উনি নামে নামে লিস্ট করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। শুধু এই নয় এরপর থেকে যখনই বেতন হবে বধির বিদ্যালয়ের উন্নয়ন, মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল, নির্বাচনী তহবিল–যখন যে কাজে যত টাকা দানের দরকার উনি নির্দ্বিধায় লিখে দেবেন আর সবাই হাসিমুখে দান করে যাবে।
বাইশ বাদ দিয়ে আমার আর যে আট হাজার থাকে তা থেকে কিছু গেল প্রভিডেন্ট ফান্ডে কিছু গেল প্রফেশনাল ট্যাক্সে আর কিছু কেটে নেওয়া হল আমি যে এতদিন এখানে খেয়েছি তার মূল্য বাবদ। দীর্ঘ প্রায় দু বছর বাদে পারিশ্রমিক পেলাম মাত্র দু হাজার টাকা।
এক হাজার নিজের কাছে রেখে এক হাজার পাঠিয়ে দিলাম অনুকে মানিঅর্ডার করে পরের দিন দুপুরে। আর রাতের বেলায় গোটা ছয়েক বোবা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ওয়ার্ডেন এল আমার কাছে।
আমার এই দীর্ঘ জীবনে বহু মানুষ দেখেছি। জেলে ছিলাম তাই চোর ডাকাত খুনিও কম দেখিনি। কিন্তু এই ওয়ার্ডেনের মতো খল ধূর্ত নিষ্ঠুর মানুষ একজনও দেখিনি। আর সবচেয়ে যেটা মজার যে মানুষটা মানুষের অনিষ্ট ছাড়া কোনদিন কিছু ভাবলো না, সে এক কমিউনিস্ট দলের সদস্য। এই যদি কমিউনিস্ট দল হয়, এর চেয়ে ফ্যাসিস্ট মনে হয় ঢের ভালো। তারা অন্তত আদর্শের দোহাই তো দেয়না।
তখন আমার রান্নাঘরের পাশের ছাদটায় অন্ধকার। ওয়ার্ডেনের হাসি হাসি মুখের ধূর্ত রেখাগুলো দেখা যাচ্ছে না। বলে, তাহলে এতদিন পরে সব প্রতীক্ষার অবসান, কী বলেন? এবার মাসে মাসে মাইনে পাবেন। আজ আপনার খুব আনন্দের দিন। তাই কীনা? আমরা এই বাচ্চাদের নিয়ে থাকি। এদের জন্যই আমাদের চাকরি। বাচ্চাগুলো ধরেছে, যেটা কোনো অন্যায়ও নয়, বলছে, ওদের একদিন একটু ভালোমন্দ খাওয়াতে হবে। তাই আপনার কাছে নিয়ে এলাম। আমি কেন বলব? ওদের কথা ওরাই আপনাকে বলুক!
ওয়ার্ডেন একা নয় সাথে হাউ হাউ করে বাচ্চারাও বলছে তাদের দাবির কথা। আগে ভাগে তাদের যথেষ্ট পরিমাণে শিখিয়ে পড়িয়ে আনা হয়েছে যে। আর ওয়ার্ডেন মাঝে মাঝে এটাও বলতে ভুলছে না যে বড় সাহেব বাচ্চাদের খাওয়াতে বলেছেন। না খাওয়ালে তিনি রাগ করবেন। বড় সাহেবের রাগ যে কী ভীষণ তা সেই জানে যার উপর তিনি অতীতে রেগেছেন।
বুঝতে পারলাম এই লোকটা একবার যখন পিছনে পড়ে গেছে–রেহাই দেবে না। তার সামনে এখন ঢাল হয়ে আছে বোবা বাচ্চাদের একটা বড় সড় দল।
কিছুদিন আগে সম্ভবত ধ্রুবপদ পত্রিকায়, একটা লেখা পড়েছিলাম। লিখেছেন একমাস্টারমশাই। যিনি তিরিশ বছর কোনো এক বোবাদের স্কুলে চাকরি করেছেন। তিনি তার চল্লিশ পঞ্চাশ পৃষ্ঠা লেখার মধ্যে একটা লাইনও এমন লেখেননি যাকে প্রশংসাসূচক বাক্য’ বলা যায়। তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতার যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, পড়ে মনে হতে পারে এরা অতি হিংস্র নির্দয় স্বার্থপর আক্ৰামক একতাবদ্ধ এক অদ্ভুত প্রজাতির জীব। যারা কথা বলে, তাদের কথা বলা হাসা তাকানো সব কিছুকে এরা সন্দেহের চোখে দেখে এবং তাদের শত্রুপক্ষ মনে করে। সেইদিন যেদিন এদের আমি নিজের পয়সায় খাওয়াতে গিয়েছিলাম টের পেয়েছিলাম দুর্বুদ্ধিতে এরা কারো চেয়ে কম নয়, বরং কিছুটা বেশি।
কথা হয়েছিল আমি পরোটা আর ডিমের কারি খাওয়াব। তখন স্কুলে ছোট বড় মিলিয়ে গোটা সত্তর বাচ্চা। আমার হিসেব মতো দশ কিলো ময়দা আর গোটা আশি ডিম কিলো দশ বারো আলু যথেষ্ট। এর সাথে কিলো তিনেক ডালডা আর কিছু তেল মশলা। সব জোগাড় করে এনেছিলাম আমি। ডিমের কারি তো আগে তৈরি করা হয়ে গিয়েছিল। বাকি ছিল লুচি ভাজা। রাত আটটায় স্কুলের ছাদে খেতে বসল প্রথম জনা তিরিশ বাচ্চা। তখন আমি লুচি ভাজছি আর লুচি বেলে দিচ্ছে আমার জোগাড়ে। পরিবেশন করতে থাকে বাচ্চারাই, নিজেরা। কিন্তু এ কী? লুচি ভাজছি তো ভাজছি, ভাজছি তো ভাজছি, প্রথম ব্যাচ আর ওঠে না। বার বার তাগাদা আসছে লুচি, লুচি কই? আমি তো কড়াইয়ের কাছে বসে আছি, ওদিকে কী খেলা চলছে কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। যখন প্রথম ব্যাচের খাওয়া শেষ হল ময়দার তিনভাগ উড়ে গেছে। ডিমের কারিতে ডিম আর নেই পড়ে আছে শুধু কারি। তাই ব্যাগ নিয়ে আর একবার দৌড়ালাম দোকানে।
