দুর্যোধনের উদ্দেশ্য শকুনির বুঝতে বিলম্ব হয়নি। বুঝেছে তার সব ভাইও। তখন তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান শকুনি। এই ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ একমাত্র সে-ই নিতে সক্ষম হবে। এ খাদ্য তারই গ্রহণ করা সমীচীন তারই বেঁচে থাকা যুক্তিযুক্ত এবং ভাইয়েরা মৃত্যুবরণ করে বাঁচিয়ে রেখেছিল শকুনিকে। তার ফলাফল কী হয়েছিল সে মহাভারতে লেখা রয়েছে।
আমাকে কি এই গল্প কোনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে? আমি ঠিক তা জানি না। তবে এটুকু জানি, আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। আমি মরতে চাই না। একবার মরতে মরতে প্রাণ ফিরে পেয়েছি, তাকে এমন কুকুর বেড়ালের মত নষ্ট করতে চাই না।
ঘর থেকে বের হয়েছিলাম সন্ধ্যে ঘোর হয়ে গেলে। ঘুটিয়ারি শরিফ স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার নেমে গেল। এসব অঞ্চলে তখনও বিদ্যুৎ এসে পৌঁছায়নি। স্টেশনের বাতি স্তম্ভের ওপর জ্বলত কেরোসিন তেলের কুপি। ট্রেন আসত এক একখানা এক দেড় ঘন্টা পরে পরে। তখনও গ্রামের মানুষের মধ্যে শহর নির্ভরতা এত বৃদ্ধি পায়নি। যে কারণে ট্রেনে খুব একটা ভিড় হত না। সারাদিন মুখে একটা কুটিও কাটিনি, তার ওপর এতটা পথ হাটা; পথশ্রমের ক্লান্তিতে বসে পড়লাম দু নাম্বার প্লাটফর্মে এক কাঠের বেঞ্চিতে। আর কিছুক্ষণ পরে শুয়ে পড়লাম। শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম, তলিয়ে গেলাম ঘুমের এক অতল মহা সমুদ্রে।
অনেক রাতে যখন দূর কোন বাঁশবনে যেন শেয়াল ডাকছে, আমার ঘুম ভেঙে গেল একজন অপরিচিত মানুষের গলার শব্দে। সে আমার কাছে জানতে চাইছে, এই খোকা, তুই কোথায় যাবি রে? এমন বেমক্কা প্রশ্নে ফ্যালফ্যাল করে প্রশ্নকর্তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। কোন জবাব দিতে পারি না। আমি কি জানি কোথায় যাব। কোথায় আমাকে নিয়ে চলেছে আমার ভবিতব্য। শুধু এইটুকু জানি, দুর্ভিক্ষের এই অন্ধকার হা মুখ থেকে আমাকে দূরে পালাতে হবে। তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখতে হবে, পৃথিবীর সব অন্ন সব শস্য সর্বসুখ লুঠ হয়ে গ্যাছেনাকি সবার অলক্ষ্যে কোথাও আমার, আমাদের জন্য এককণা পড়ে আছে।
যখন বাসা ছেড়ে চলে আসি, মা বাবাকে বলে আসা হয়নি। বললে তারা আমাকে এমন নির্বান্ধব পথে নিরুদ্দেশ যাত্রায় যেতে দিত না। এমন যে হিংস্র বাঘ সে-ও তার বাচ্চাকে চোখের আড়ালে যেতে দেয় না। মানুষের তো মায়ার শরীর। আমার মা এখন নিশ্চয় জেগে বসে আছেন, আমার অপেক্ষায় পথের দিকে তাকিয়ে। রাত যত বাড়বে তার চিন্তা তত বেড়ে যাবে। শেষে দুচোখ জুড়ে নামবে প্রবল বর্ষণ ধারা।
মাকে কাঁদিয়ে আজ দূর পরবাসের পথে চলেছি ওই মা বাবা ভাইবোন এদের সবার জন্য। যদি কোন দিন সন্ধান পাই, যদি সেখান থেকে সবার জন্য কিছু সুখ কিছু আয়ু নিয়ে ফিরে আসতে পারি সেদিন আবার এই পথ ধরে ফিরে আসব। নচেৎ এই শেষ, এই আমার অগস্ত্য যাত্রা। আমি ঠিক জানি না আমার এই যাত্রার সমাপ্তি কোথায়।
আমি কোন জবাব দিতে পারছি না দেখে আবার প্রশ্ন করে সেই জমাট বাধা অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা। যার হাতে একটা টর্চ। যে টর্চের আলো আমার মুখ মাথা শরীরে। এ্যাই তোরা রেফুজি? তখন মাথা নাড়ি আমি। আর আমার কিছু বলবার দরকার ছিল না। আমার মাথা নাড়ায় সব জবাব পেয়ে যান তিনি। জেনে যান আমার বিগত অতীত আগত ভবিষ্যৎ। রিফিউজি। বাংলা ভাষার অভিধানে এর চেয়ে দরিদ্র নিকৃষ্ট অপমানজনক শব্দ আর একটাও নেই।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে রিফিউজি আর বাঙাল সমার্থক শব্দ। যা স্থানিক পরিভাষায় একটা গালাগালিও বটে। যেমন বুর্জোয়া, প্রতিক্রিয়াশীল, জোতদার, সুদখোর, রাস্তার কুকুর। কী ভীষণ বিড়ম্বনা। কী অভিশপ্ত অপরাধময় জীবন আমাদের। আমরা নিজেদের হিন্দু বলে পরিচয় দেই, মূর্তি পূজা করি, সেই অপরাধে একদল মুসলমান আমাদের কাফের বিধর্মী শত্রু বলে। আমরা নিম্নবর্ণ-নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠির মানুষ বলে, একদল তথা কথিত উচ্চবর্ণ আমাদের অচ্ছুত অস্পৃশ্য চণ্ডাল বলে গাল দেয়। ঘৃণায় থুতু ছেটায়। এখন এদেশে এসে পড়তে হয়েছে–ওদেশে জন্মাবার অপরাধে আর এক গালাগালির সামনে–বাঙাল। “বাঙাল মনুষ্য নহে, উড়ে এক জন্তু লাফ দিয়ে গাছে ওঠে, লেজ নাই কিন্তু।” এটি এক ঘটি কবি দ্বারা রচিত কবিতার লাইন। ঘটিদের চোখে বাঙালরা সব বহিরাগত। যারা অন্য এক দেশ থেকে এদেশে এসে চাকরি ব্যবসা রাজনীতি শিল্প সাহিত্য সব কিছু কজা করে নিয়েছে। বর্তমানে এই বাঙাল ঘটি বিরোধ এমন তুঙ্গে যে নিকট ভবিষ্যতে শিয়া সুন্নিদের মত একটা রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
যা ভেবেছিলাম তা নয়, এই ভদ্রলোক ঘটি নন–বাঙাল। বাঙাল, তবে রিফিউজিও নন। ওদেশ থেকে এদেশে এসে নগদ টাকায় জমি জায়গা কিনে ঘরদোর পুকুর সব বানিয়েছেন। লেখাপড়া জানা মানুষ, উনি তাই জানেন কোন শব্দের প্রয়োগে এক রিফিউজি বাচ্চাকে পেড়ে ফেলা যায়। সেই শব্দবাণ ছুড়লেন তিনি, আমার বাড়ি যাবি? থাকবি আমার বাড়ি? ভাত খেতে দেব।
ভাত। আহা রে! সেই কবে কতকাল আগে যেন ভাত খেয়েছিলাম। কী তার রঙ রূপ ঘ্রাণ আর স্বাদ। সে স্বাদ গন্ধে যেন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ভাতের নামে কাত হয়ে যায় এক যুগান্তের অনাহারি বালক। সে লোকটার পিছন পিছন হেঁটে গিয়ে পৌঁছায় তার বাড়ি। কেন আমাকে ভাত দেওয়া হবে পথে আসতে আসতে তা বুঝিয়ে বলে দেন তিনি–কটা গরু আছে, তাদের একটু খড় বিচালি ঘাস জল দেওয়া, গোয়ালটা একটু সাফ সাফাই করা, এই সব আর কী।
