কোথায় যেন একবার লিখেছি–নিজে অভুক্ত থেকে অপরকে খাওয়ানো এর নাম সংস্কৃতি। খিদে পেলে খাওয়া এর নাম প্রকৃতি। খিদে না পেলেও খাওয়া এর নাম বিকৃতি। আর যে অপরের ক্ষুধার অন্ন ছিনিয়ে নেয় সে দুষ্কৃতি।
বোবা বাচ্চাদের খাবার খেয়ে নিলে সেটা তো অপরাধই। ওরা আমাকে সেই অপরাধ থেকে দুবেলা দুরে রাখছে।
এইসব কথা লিখতে ভালো লাগছে না। মানুষ যে যার নিজের চশমা দিয়ে জগতটাকে দেখে। তারা বিশ্বাস করতে চাইবে না, কেউ এত হীননীচ মনোবৃত্তির হয়। হয়, কারণ এরা সেই মানুষ যাদের কিছু বছর পরে হার্মাদ নামে এক ডাকে সবাই চিনবে। এরা যে কত নীচে নামতে পারে সে জানে মরিচঝাঁপির মাটি, গাছপালা, নদীর জল। কত জঘন্য হতে পারে কিছুদিন পরে টের পাবে লালগড়। যখন এরা কুয়োর জল পান অযোগ্য করে দেবার জন্য সেই জলে হেগেমুতে দেবে। পরিচয় পাবে সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রামও। তার একটু দেরি আছে।
.
একটা প্রচণ্ড কলরব। ছাদ থেকে নীচে তাকালাম কী ব্যাপার এত শব্দ কেন শব্দহীন সমাজে। কেউ যদি বাক্য হারা হয় সে বধির নাও হতে পারে। তবে বধির হয়ে জন্মালে যোবা অবশ্যই হবে। আর যে মানুষ কথা বলতে পারে সে বলে শুধু মুখ দিয়ে। যে তা পারে না, কথা বলে হাত পা চোখ মুখ সর্বঅঙ্গ দিয়ে দেখি, এক সাথে অনেক বোবা কিছু বলার চেষ্টা করছে। তাই এত হৈ চৈ।
আর একটু লক্ষ্য করতে দেখি পাঞ্জা ধরা হচ্ছে। পাঞ্জায় হার জিত হচ্ছে। আজও স্কুল ছুটি। সব ছুটির দিনের মতো আজও ওরা খেতে দেরি করবে। সাবান ঘষা, কাপড় কাঁচা, চান আর পাঞ্জা একসাথে চলছে, দেখি সেই বাচ্চাদের ভিড়ে শিং ভেঙে ওয়ার্ডেনও ঢুকে পরেছে। সেও পাঞ্জা ধরছে।
স্কুলে দুজন তাগড়া জোয়ান ছেলে আছে। একজনের নাম মিঠুন আর একজন সোমনাথ। টকালো লম্বা সুস্বাস্থ্যের অধিকারি। সেই দুজনে পাঞ্জা ধরেছে। কে হারে কে জেতে–দুজনার সমর্থকদের সেই নিয়ে শোরগোল। বলে ওয়ার্ডেন, যে জিতবে তার সাথে আমার পাঞ্জা হবে। সবাই জানত মিঠুন জিতবে। তাই হল সেই জিতল। এবার সে আর ওয়ার্ডেন দুজনে পাঞ্জা ধরল–জিতে গেল ওয়ার্ডেন। জিতেই তার নাবালক উল্লাস–এটা হাত নয়, পিলার রে। একে কাত করতে হলে বুলডোজার লাগবে।
আমি হাসছি। হঠাৎকটা বোবা ছেলের চোখ গেল ছাদের দিকে। আমার দিকে। তারা সমস্বরে হাত মুখ মাথা নেড়ে আমাকে ডাকতে লাগল পাঞ্জা ধরার জন্য। আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে মুখে তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে বলে ওয়ার্ডেন ডাক কাকে ডাকবি। সব পেড়ে ফেলে দেবো। এ হাত নেহি ফাঁসিকা ফান্দা হ্যায়। তারপর সরাসরি আমার দিকে হুঙ্কার–কাম অন।
ওয়ার্ডেন বয়সে আমার চেয়ে কম পক্ষে দশ বারো বছরের ছোট। শক্ত সামর্থ পেটানো চেহারা। উচ্চতায় আমার চেয়ে একটু বেশি। সে যেমন জানে, পাঞ্জা ধরলে অবধারিত ভাবে আমি হারব, আমিও জানি জেতা কঠিন। যে কোনো খেলায় কেউ হারাব জানলে খেলতে নামে না। আমি তাই নীচে নামি না। ছাদেই দাঁড়িয়ে থাকি, আর মাথা নাড়ি। না না।
আমার না-য়ে ওয়ার্ডেনের মনের জোর আরও বেড়ে যায়। যে হারার আগে হেরে বসে থাকে, তাকে হারানো সবচেয়ে সহজ। সেই দাবা খেলার হারের স্মৃতি সে আজও ভোলেনি। বুদ্ধির খেলায় হেরেছে এখন শক্তির খেলায় জিতে তার বদলা নিতে চায়। একটা বড় জয়ের আনন্দের চেয়ে একটা ছোট হারের অপমান তাদের কাছে অনেক বড় যারা জীবনে কোথাও কোনদিন হারেনি। আজও মনে দগদগে হয়ে আছে সেই হার।
সে দুতিনটা বোবা ছেলেকে ইশারা করে–যা ধরে নিয়ে আয়। ছেলেগুলো ছাদে রান্না ঘরে ছুটে এসে আমার হাত ধরে। জোর খাটায় চলল। পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে। অগত্যা নেমে এলাম নীচে। গোটা পনের বাচ্চা ঘিরে ধরল আমাদের যেন এখন পালোয়ান দারা সিংয়ের সাথে অভিনেতা মুকরির একটা লড়াই হবে। যাতে লড়াই কম কমেডি বেশি। কে হারবে কে জিতবে সেটা সবার জানা। সবাই শুধু হাসির খোরাক চায়।
অগত্যা হাত বাড়াই আমি। হারাব জেনেই হাত বাড়াই। তবে ওই মরার আগে মরব না। হতে পারো তুমি আলেকজান্ডার কিন্তু আমিও পুরুর বাচ্চা।
পাঞ্জা ধরার যা নিয়ম–প্রথম তিরিশ সেকেন্ড প্রতিপক্ষের শক্তির একটা আন্দাজ নেওয়া। পরের তিরিশ সেকেন্ড তাকে শক্তি প্রয়োগ করতে দেওয়া। যদি বোঝা যায় আমার চেয়ে বলবান, নিজের হাতকে খুঁটির মতো যতক্ষণ পারা যায় গেড়ে বসে থেকে হার এড়ানো। যদি বোঝা যায়। আমার চেয়ে একটু কম, শরীরের সবশক্তি হাতে কেন্দ্রিভূত করে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরা–চাপ বাড়িয়ে হারিয়ে দেওয়া।
জীবনে অনেক কিছুর মতো এক সময় পাঞ্জাও খুব ধরেছি। কিছু কৌশল জানা আছে। এখন সেটার সফল প্রয়োগ ঘটাই। আর আমার চেয়ে সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতায় অনেক এগিয়ে থাকা এক হামবড়াই করা হার্মাদকে হারিয়ে দিই। জানি না কেন উল্লাসে ফেটে পড়ে যোবা বাচ্চারা। যেমন ভাবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানি ক্রিকেট টিমকে বাংলাদেশ হারিয়ে দিলে ভারতীয় দর্শক নেচে উঠেছিল। দুঃখী ওয়ার্ডেন। হেরে গেলাম যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। কেন যে হারল? কেন তাকে হারাতে পারলাম? আমার মনে হয় সেই সময় আমার ডানহাত দীর্ঘ বাম অপশাসনের সৃষ্টি হওয়া এই সব উৎপীড়ক অহঙ্কারী লোকেদের দ্বারা অপমানিত মানবাত্মারা ভর করেছিল। তারা আমাকে বল জোগাচ্ছিল, হারিস না। তোর হার মানে শ্রমজীবনের পরাজয়। বিজয় এক দর্পিত দানবের। তোকে জিততেই হবে।
