একটু অন্যায় হবে। হোক। বেআইনি কাজ হবে। সে হোক। সত্তর দশক যখন পার হয়ে এসেছি, সহজে মরছি না। বেঁচে থাকলে এই অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করার অনেক সুযোগ পাব। সেই যে এক অধ্যাপক পি.এইচ.ডি. বলে চাকরি করে বেতন নিয়ে পরে পি.এইচ.ডি. হলে না? আমিও
হয় একটা সত্যি পরীক্ষা দিয়ে দেব। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে গুঁতোয় পড়ে অশ্বত্থামা হতঃ ইতি গজঃ বলতে হয়েছিল।
আমার সমস্যার কথাটা আমি যোগেনদাকে জানিয়ে বলি, আপনার তো অনেক চেনা। কোথাও, থেকে এনে দিন না একখানা সার্টিফিকেট।
যেন কোনো নিষ্ঠাবান বামুনকে বলেছি এক টুকরো শুয়োরের মাংস খান, এমন মুখ করে তাকালেন আমার দিকে। বললেন–এটা আমি পারব না। তুমি অন্য কাউকে ধরো।
কাকে ধরি! কে আছে এমন যাকে যুধিষ্ঠিরের কুকুরে কামড়ায় না। একটু কম নীতি সিদ্ধান্ত মেনে চলে। বাস্তবটা বোঝে।
একজন বলে–বড় সাহেবের কাছে যাও। উনি সব পারেন।
গেলাম একদিন বড় সাহেবের কাছে। আমার সমস্যা শুনে আমাকে ধমকে উঠলেন–চাকরি আমি দেব। আবার সার্টিফিকেট সেও আমায় এনে দিতে হবে? যা তোর চাকরি করতে হবে না। চলে যা যেখান থেকে এসেছিস। একটা সামান্য কাগজ জোগাড় করার ক্ষমতা যখন নেই, চলে যা।
কাঁদো কাদো মন ছলো ছলো চোখ নিয়ে যখন ফিরে আসছি পথেই দেখা হয়ে গেল আদুরি গোঁসাইয়ের সাথে। সে স্কুলে হাজিরা দিয়ে চলে গিয়েছিল রেশন তুলতে। রেশন নিয়ে ফিরছে। সব শুনে সে একচোট খুব হেসে নেয়। তারপর বলে–তোমার মতো রাম পাঁঠা আর দেহি নাই। রাজবাড়ি গেছে বাসি রুটি চাইতে। আরে অতো ছোড কাম নিয়া কেউ বড়ো সাহেবের ধারে যায়? যদি গলায় ফাঁসি লাইগ্যা যাইতো, কী দুই চাইরখান খুন কইরা দিতা তাইলে একখান কতা হইত। কী না, বাবু আমারে একখান ছার্টিফিকেট দ্যান, এইডা কী তার যোগ্য কত?
বলি, তার কাছে ছোট হতে পারে আমার কাছে তো পাহাড় সমান। কার কাছে যে যাব বুঝতে পারছি না।
হাসে আর বলে সে–আমার কাছে যাও।
কী!
কই কী আমারে টাকা দিও। আমি বানাইয়া আইন্যা দিমু তোমার ছার্টিফিকেট। পাঁচশো হ্যাঁরে দেওন লাগবো। দুইশো আমার আওন যাওনের খরচ।
মানুষ! হায় রে মানুষ! মানুষ চেনা বড় সহজ কথা নয়। এই জন্য রামকৃষ্ণদেব বলেছেন কোন্ নুড়িতে নারায়ণ আছে তা কি কিছু বলা যায় রে। কে জানত কালকে বাংলাদেশ থেকে আসা আদুরি গোঁসাই এত শক্তিমান। কত লোকের কাছে গেছি। দেখিতে গিয়াছি পাহাড় নদী দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু। শুধু আমার চোখের সামনে আদুরির কাছে যাওয়া হয়নি। দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের পরে একটি শিশির বিন্দু। কে জানত যে, আমারই ঘরের উঠোনে অনন্ত কুয়োর জলে চাঁদ পড়ে আছে। এই জন্য মানুষ বলে গেছে গরু দুয়ারের ঘাস খায় না।
আদুরি গোঁসাইয়ের মতো এমন সাহসী সফল মহিলা পৃথিবীতে খুব কমই দেখা মেলে। দুটো ছেলে দুটো মেয়ে নিয়ে শুধু সাহসের জোরে দূর বিদেশ ইন্ডিয়ায় চলে এসেছিল ভাগ্য সন্ধানীর মতো। মানুষ নিরক্ষর হলেই মুখ হয় না। সে তার স্বাভাবিক বুদ্ধিতে জেনে গিয়েছিল মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর পথ শুরু হয় পাকস্থলি থেকে। তাই সে একটা বড় টিফিন বক্স কিনে নিয়েছিল, যার চারটে বাটি। সেই বাটিতে অতি যত্নে উপাদেয় রান্না খাবার ভরে পৌঁছে যেতে লাগল এক নাথবতী অনাথবৎ মহিলা নেত্রীর বাড়ি। যে আদুরির সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে বলেন–বল তুমি কী বর চাও?
মুই বড় গরিব। একখান ভালো কাম দ্যান মোরে।
দিলাম। আর কিছু?
না আর কিছু না। লাগলে পরে কমু।
তুই আমাকে কী দিবি?
আপনে কন।
যেদিন তুই আমার বাড়ির কাজ ছেড়ে দিবি, তোর কাজ তোকে ছেড়ে দেবে।
আপনে ভাইবেন না। আমার দুইখানা মাইয়া আছে। এ্যাকজোন কেউ না কেউ ঠিক আমু। আদুরি এখন সেই টিফিন বক্স নিয়ে স্কুলের ডিউটিতে আসে। একটা বড়দির জন্য বাঁধা। বাকি তিন কৌটো এক একদিন এক একজনার জন্য বরাদ্দ। অবশ্য যদি সে আদুরির উপকারি হয়। সে এখন বড় সুখে আছে, ভারত যাত্রা তার সার্থক।
এই আদুরি গোঁসাই আমাকে এনে দেয় দক্ষিণবঙ্গের এক স্কুল থেকে এইট পাশ সার্টিফিকেট। জানতে পারি আদুরির কারণে এই স্কুলে আমার জনকয়েক ক্লাস ফ্রেন্ড আছে। জনৈক সিপিএম নেতা কুঁজো ডাক্তার এমন সার্টিফিকেট স্বল্পমূল্যে শত শত বিলি করেছেন, জনকল্যাণ জনিত হৃদয় দুর্বলতায়।
সেই সার্টিফিকেট স্কুলে জমা করে দিয়ে বসে থাকি কবে আমার চাকরি হবে সেই আশায়। কবে বেতন পাব সেইদুরাশায়। দিনের পর দিন যায়। খাওয়াটা তো মিলে যায়, তবে শুধু খাওয়াতে তো চলে না, কিছু হাত খরচাও লাগে। একটু লিখি টিখি তার জন্য কাগজ কলম কিনতে হয়। এখানে সেখানে যেতে গাড়ি ভাড়াও দরকার। তেল সাবানও চাই। তেল কিনতে না পেরে রান্নার জন্য বরাদ্দ সরষের তেল ক’দিন মাথায় দিচ্ছিলাম। একদিন হোস্টেল সুপার দেখে ফেলে ধমকে দেয়-এ তেল মাখবেন না। এটা বাচ্চাদের রান্নার জন্য। এরা আমাকে সকাল বিকালের টিফিনও দেয় না। ওটা খাওয়া বারণ। শুধু দুবেলা যা রান্না হবে সেটাই আমার পাওনা। এখন বাচ্চা বেড়ে প্রায় ষাট। আরও ভর্তি চলছে। সবাই টিফিন পায়। একা আমি বাদ–কারণ আমি বাচ্চা নই, বড়। ছাত্র নই, কর্মচারি। আমার খাই খাই করা ভালো লক্ষণ নয়।
