কথায় বলে চুন খেয়ে যার গাল পোড়ে দই খেতে ভয় পায়। এখন সে স্বামী বেচারার ভয় আরো বেড়ে গেছে আমার জন্য। আমি এখানে একা থাকি, বউ থাকে দূরে। রান্নার জায়গা ছাদে, সন্ধের পর এখানে অন্ধকার নামে, লোকজনও কেউ থাকে না। যদি একা পেয়ে, ফাঁকা পেয়ে বউটাকে আমি কিছু করে দেই, যদি বউটাই আমাকে কিছু করতে দেয়, তখন কী হবে? এই সন্দেহবাতিক আধপাগলা লোকটাকে খুব কৌশলে দারোয়ান সাহা আমার উপর বিরূপ করে তোলে। ফলে সে বউয়ের পিছু পিছু সোজা রান্নার জায়গায় এসে একটা কোণ বেছে নিয়ে বসে পড়ে। যেখান থেকে গভীরভাবে লক্ষ্য রাখে, আমি তার বউয়ের দিকে তাকাচ্ছি কী না, হাসছি বা কথা বলছি কি না!
একী বিড়ম্বনা! এক সাথে কাজ করি, কথা না বলে কী পারা যায়। একবারও তাকাব না সে কী করে সম্ভব! এই নিয়ে একবার তার সাথে আমার বিশাল ঝগড়া। মারপিট হবার দশা। ব্যাপারটা খুব একটা ভালোর দিকে যাচ্ছেনা দেখে অবশেষে টিচার ইনচার্জ নির্দেশ দিলেন, কাজের জায়গায় এভাবে স্বামীকে সাথে করে আনা যাবে না।
আমি ভাবলাম এবার একটু শান্তি পাব। ওমা, কোথায় শান্তি! সে লোকটা স্কুলে তো ঢোকে না, মেন গেটের সামনে একটা বড় গাছ আছে, যেখান থেকে ছাদটা দেখা যায় সেখানে এসে বসে। কখনো কখনো স্কুলের পাঁচিলের চারপাশ ঘিরে ঘোরে আর কান পেতে শোনবার চেষ্টা করে, চোখ কুঁচকে দেখবার চেষ্টা করে, ছাদে কোনো হাসি কথা গল্প হচ্ছে কী না। একটা তিন ব্যাটারি টর্চ কিনেছে। সন্ধের পরে ঘন ঘন আলো ফেলে চেষ্টা করে এমন কোনো দৃশ্য সংকেত দেখা যায় কী না যা অবৈধ আইন বহির্ভূত।
মহিলা বলে তার নাকি মাত্র সাত বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। বালিকা থেকে কিশোরী, কিশোরী থেকে যুবতী, যুবতী থেকে বৃদ্ধা হয়েছে স্বামীর অধীনে। এই দীর্ঘ জীবন যাত্রার কোন পর্বে কী ঘটেছিল তা কে জানে। তখন স্বামীর মনে যে সন্দেহ জন্মেছিল সারা জনমে তা আর গেল না। বরং দিনকে দিন তা বেড়েই চলেছে।
মানুষের মনোজগতে একঅতি জটিল দুর্বোধ্য দুর্ভেদ্য রহস্যময়তার মোড়কে ভরা। বিশ্লেষণের অতীত এক বিস্ময়। কে একজন যেন বলেছেন-যখন চারিদিক অন্ধকার হয়ে যায়, আমরা আলো জ্বালাই। কিন্তু অন্ধকার তাতে সমাপ্ত হয়ে যায় না। একটা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে সরে যায় মাত্র। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে প্রকৃতিতে, যে ঘনঘোর অন্ধকার সৃষ্টি হয়ে আছে সেই অন্ধকারে কত কী যে গুপ্ত–তা এক জীবন তো তুচ্ছ হাজার জীবনের জ্ঞান বিজ্ঞান দিয়ে জানা অসম্ভব। আমাদের জানা বোঝার ক্ষমতা তো তোটুকু যতটুকু আমার আলোর নাগালে আসে। কিন্তু যা আসে না সেই মহাবিশ্ব সম্বন্ধে আমরা কি করে অভিমত দিতে পারি!
মহিলার বাহাত্তর বছরের স্বামীর মনের সেই অন্ধকার মহাদেশে–বাষট্টি বছরের স্ত্রীর প্রতি যে অবিশ্বাস তার অনুসন্ধান পাওয়া কঠিন। তা আছে এবং আমৃত্যু থাকবে।
.
আমার একখানা এইট পাশ স্কুল সার্টিফিকেট চাই। কেউ বাড়ি চায়। কেউ গাড়ি চায়, কেউ নারী চায়, কেউ চাকরি চায়। চায় তো সকলে কিন্তু পায় কজন! আমি চাইছি একটা চাকরি। সেটা পেতে হলে সর্ব প্রথম পেতে হবে ওই সার্টিফিকেট।
আছে, এই বাম জমানায় তেমন লোক আছে যে টাকা পেলে জীবিত লোকের ডেথ সার্টিফিকেট বানিয়ে এনে দিতে পারে। তবে আমি তার ঠিকানা জানিনা। আমার এমন কিছু লোকের সাথে আলাপ পরিচয় আছে, যারা শিক্ষিত–কেউ কেউ শিক্ষকও। এদের সবচেয়ে বড় দোষ, কেউ কোনো অন্যায় কাজ করে না। অন্যায় করে না আবার কেউ অন্যায় করলে কলমকে কষে ধরে তার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কী করে তাদের বলি যে আমাকে একখানা এইট পাশ সার্টিফিকেট বানিয়ে দাও। সবাই যে জানে আমি কোনদিন কোনো স্কুলের চৌকাঠ মাড়াইনি।
কবীরের দোহা আছে, নিদ না মানে মুর্দাকা খাট, পিয়াস না মানে ধোবি কা ঘাট, প্রেম না মানে জাত পাত, ভুখ না মানে ঝুঠা ভাত। আমি ক্ষুধার্ত, এখন আমি নীতি নৈতিকতা খেয়ে কী খিদের আগুন নেভাতে পারব?
আমার গুরু আমাকে বলেছেন–মানুষের সবচেয়ে বড় অন্যায় নিজেকে অনাহারে রাখা। আত্মার মধ্যে বাস করে পরমাত্মা। যে মানুষ অনাহারে থাকে তার আত্মা কষ্ট পায়। আত্মা কষ্ট পেলে পরমাত্মা কষ্ট পায়। যে পরমাত্মাকে কষ্ট দেয় মহা পাপ করে। সেই পাপে জিয়ন্তে নরকবাস ঘটে।
অনেকে পারে, আমি খিদে সহ্য করতে পারি না। খিদে লাগলে আমার হাত পা শিথিল হয়ে যায়–শরীর কাঁপে। মনের সব ভালো ভাবনা কর্পূর হয়ে উড়ে পালায়–খিদে সহ্য করতে পারিনা বলে নেতা হওয়া হল না। এই উপমহাদেশে একজন লোক স্রেফ অনশন করে সূর্য অস্ত না যাওয়া ব্রিটিশ সম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। বাঙালিরা চিরকালই আর্যাবর্ত বিরোধী বলে পুরুষোত্তম রামচন্দ্রকে সম্মান জানায়নি। পাঠার আগে রাম জুড়ে রাম পাঠা অর্থাৎ রামের মতো পাঠা বলে তাকে ব্যাঙ্গ করেছে। তাহলে রামভক্ত গান্ধীজিকে কেন মান দেবে! আমি বাঙালি তাই গান্ধীজির মতো অনশন শিখে আগ্রহী হইনি নেতা হবার।
অনাহারকে বড় ভয় পাই। তাই এখন আমার একখানা সার্টিফিকেট চাই। গায়ে অসুরের মতো জোর, গাধার মতো খাটতে পারি, গরমে শরীর সেকতে পারি রুটির মতো ওসব কোনো গুণ নয়। ওতে চাকরি মিলবে না। চাই একখানা শিক্ষিতের প্রমাণ পত্র। কী যে করি! কোথায় যে খুঁজে পাই তারে!
