এখন যুদ্ধপর্ব চলছে, আমি রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছি। শাসকের সাথে শাসিতের, শোষকের সাথে শোষিতের, বর্ণপ্রভুদের সাথে দলিতের, পুঁজিবাদের সাথে সাম্যবাদের। এই যুদ্ধে আমিও একটা পক্ষ। একজন পদাতিক। শত্রু পক্ষের সামনে করজোড়ে দাঁড়িয়ে লাভ হবে না। প্রতি আক্রমণে যেতে হবে। আমি নগণ্য মানুষ আর কী পারি। পারি আমি আমার ক্রোধকে ব্যক্তিগত স্তর থেকে সর্বজনীন মঞ্চে নিয়ে যেতে। সজোরে অন্যায়কে অন্যায় বলে ঘোষণা করতে।
সেদিন আমি ওদের এঁটো থালা ধুইনা, এটা ছিল প্রভুত্ববাদের বিরুদ্ধে আমার প্রতীকি প্রতিবাদ। তবে ওরাও জেদ বজায় রেখেছিল, থালা ধোয়নি। সে থালা ধুইয়েছিল অন্য একজন মহিলা কর্মীকে দিয়ে। যার পরিচিতি আদুরি গোঁসাই নামে।
আদুরি সেই লোক যে এই সেদিন বাংলাদেশ থেকে চোরাপথে পশ্চিমবাংলায় এসেছে। এরা সত্যিই ভাগ্যবান। পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ বেকার। সিপিএম পার্টির বহুলোক, যারা একদিন এই পাটির জন্য বিপক্ষ দলের হাতে মার খেয়েছে, পাড়া ছেড়ে পালিয়ে থেকেছে, জেল খেটেছে–তারা আজও চাকরি পায়নি। এরা পেয়ে গেছে। সেই যে আসিলাম, দেখিলাম, জয় করিলাম, তাই। এদের ভোটার লিস্টে নাম, রেশন কার্ড, সিডিউল কাস্ট সার্টিফিকেট মোদ্দা কথা যা যা থাকলে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করতে বেগ পেতে হবে না, সব কাগজ পত্র আছে। সব দায়িত্ব নিয়ে বানিয়ে দিয়েছে কোনো নেতা। এখন আবার পঞ্চাশ বছর বয়সে এক স্কুল সার্টিফিকেটে তিরিশ বছর বয়স লিখিয়ে একটা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলে চতুর্থশ্রেণির কর্মী হিসাবে চাকরিও পেয়ে গেছে। এগারোটায় ডিউটিতে আসে একটা চল্লিশে একবার টিচারদের জন্য চা বানিয়ে দিয়ে টিভির ঘরে ঢুকে টিভি দেখে, না হলে পড়ে ঘুমায়–এই তার কাজ। চারটেয় বাড়ি চলে যায়।
কেন এদের প্রতি এতে বদান্যতা? বুঝ লোক যে জানো সন্ধান।
সে যাই হোক এই ঘটনায় হোস্টেল সুপার এতটা ক্ষুব্ধ হলেন যে হোস্টেলে খাওয়াই ছেড়ে দিলেন। আজ থালা আদুরি ধুয়েছে কাল কে ধোবে? স্কুলের তো ক্লাস যতদিন ছুটি প্রায় ততদিন। যেদিন স্কুল ছুটি আদুরি বুড়িরও ছুটি। তাই সুপার আত্মসম্মান রক্ষা করতে বাড়ি থেকে খেয়েই ডিউটিতে আসতে লাগলেন। ওয়ার্ডেন, স্পোর্টস টিচার ও অন্যরা যে যার থালা ধুয়ে রাখতে লাগল।
***
বলা হয়েছিল আমাকে রান্নায় সহযোগিতা করার জন্য একজন লোক দেওয়া হবে। সে এল। লোক নয় মহিলা। এল চাকরি করতে স্বামীকে সাথে নিয়ে।
আমাকে বলে দেয় সাহাবড় সাহেবের লোক। তার মুখে শুনলাম মহিলা নাকি বড় সাহেবের বাড়িতে প্রায় তিরিশ বছর কাজ করেছে। এক জবরদখল কলোনির দরমার বেড়া দেওয়া বাড়ির এক গরিব সিপিএম কর্মী থেকে এক সম্পন্ন উপনগরীর রাজপ্রাসাদতুল্য ভবনের বাসিন্দা, সিপিএম পার্টির নেতা হয়ে ওঠা, সবটা ঘটেছে তারই চোখের সামনে। এমনিতে সে তো ওই বাড়ির রাঁধুনি ছিল, তবে যখন বড় সাহেবের মায়ের অসুখ হয় যে অসুখে তিনি মারা যান, সে সময় এই মহিলা রাতদিন এক করে তার খুব সেবা শুশ্রূষা করেছিল। তিনি তাই যখন মারা যান প্রিয় পুত্রকে ডেকে বলেছিলেন “বেচারা সারা জীবন আমাদের সেবাযত্ন করেছে, দেখিস, ও যেন বুড়ো বয়সে ভাতের কষ্ট না পায়, যদি পারিস ওকে একটা ভালো কাজ দিস।”
বড় সাহেবের বাড়িতে খুব কাজ। এক সময় মহিলা বয়সের ভারে আর অত খাটুনি পেরে উঠছিল না। তাই কাজ ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে এসে বসেছিল। তবে মাঝে মাঝে ও বাড়ি গিয়ে দেখা করে আসত। চেয়েচিন্তে নিয়ে আসত বাতিল-পুরানো কাপড় চোপড়, দুপাঁচ দশটা টাকা, বাড়তি খাবার দাবার। সেদিন যখন ওই বাড়ি গিয়েছিল বড় সাহেবের মনে পড়ে যায় সেই মাতৃ আদেশ তাই তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন এখানে, যাও মাসি বোবাদের স্কুলে। লোক একজন আছে সে রান্না করবে, তুমি একটু সাথে থেকো।
বেচারা আর ভালোভাবে হাঁটতেও পারে না। ওজন বেড়ে গেছে। এখন হাঁটতে গেলে দেহকাণ্ডখানি টায়ার পাংচার গাড়ির মতো একদিকে বেঁকে বেঁকে যায়। বসলে উঠতে পারে না উঠলে বসতে পারে না। তবে মুখের ধার এখনও আছে। যে দাপটে সে এতকাল পাড়ার প্রতিবেশী, বাড়ির বউদের শাসন করে এসেছে, সেই–আমি বড় সায়েবের বাড়ি কাজ কম যদি তার কাছে গে নালিশ করি দেখবে কী হয়–মনের জোর এখনও অটুট।
সে কাউকে তেমন একটা ভয় ডর পায় না। তার একমাত্র ভয় নিজের স্বামীকে দিয়ে। সে যদি একবার রেগে যায় যা মুখে আসে তা বলে গাল পাড়ে। সে সব সহ্য করা যায় না। কথা যদি বা সহ্য হয় সহ্য হয় না লোকের বক্রভাবে তাকানো, মুখ টিপে হাসা। পাড়ার এক দুটো ফাজিল বউ বলে আর হাসে-ঠাকুর্দা যেখন বলতেছে, হোক না হোক এটু কিছু সত্যি নিচ্চয় আছে। নালি শুধু মুধু নিজির বউয়ের নামে এসব বলবে ক্যান। হারে ঠাগমা মোনের ভুলি কিছুমিছু করে বসিসনি তো।
এই কথার জবাবে মহিলা গাল পাড়ে। সে যত গাল দেয় বউ ঝিরা ততো হাসে আর বলে চোরের মার বড় গলা। শাক দে মাছ ঢাকা যাবেন। \ প্রত্যেকটা মানুষের মনের মধ্যে একটা ঘনঘোর অন্ধকার মহাদেশ আছে যেখানে কোনো সুর্যের এককণা আলোক শত চেষ্টাতেও পৌঁছাতে পারে না। সব যুক্তি, তর্ক, অনুনয়, বিনয়, সব আদেশ, নির্দেশ, হুমকি, ব্যর্থ ফিরে যায় ওই বন্ধ কক্ষের দোর গোড়া থেকে। এই মহিলা–যার বড় নাতি মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার ওজন আশি কিলোর আশেপাশে; যার মুখশ্রী, গায়ের রঙ জনি লিভারের মায়ের মতো, সে কবে কত যুগ আগে কী যে করেছিল তা কে জানে। কিন্তু সেই যে সন্দেহ তার স্বামীর মনে ঢুকে গিয়েছিল তা আজও দূর হয়নি। সর্বদা ভয় এই বুঝি কেউ তার বউকে নিয়ে পালায়। তাই বিগত তিরিশ চল্লিশ বছর তার একটাই কাজ–সব কাজ বর্জন করে বউ পাহারা দেওয়া।বউ কাজে যায় সে তার পিছন পিছন গিয়ে কাজের জায়গায় বসে থাকে। তার হাঁটা চলা, কথা বলা, হাসা সব কিছুর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখে। সে যখন বড় সাহেবের বাড়ি কাজ করত, তখনও তার স্বামী তাকে একা ছাড়ত না। পাহারা দিত।
