কটা মাছ নিয়েছিস! সাতখানা?
না না, বলে সে, আমি দুটো খেয়েছি। কাকু বলল দুটো করে।
আর পাঁচটা?
দুটো কাকু খেয়েছে, তিনটে রেখে দিয়েছি।
কোথায় রাখা আছে?
কাকুর চৌকির নীচে। কাকু বলল রেখে আয় রাতে খাব।
বাল্যবন্ধুর চৌকির নীচ থেকে সেই মাছ রান্না ঘরে ফিরে এল এরপর। আমি রক্ষা পেয়ে গেলাম একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে। বেঁচে গেলাম চোর অপবাদ থেকে।
বেঁচে গেলাম কী? কোনো বলবান লোকের বিষ নজরে পড়ে কোনো দুর্বল অসহায় কী বাঁচতে পেরেছে? রাজুকে জেরা করে সব সত্য উগলে নেবার অপরাধে লোক সমাজে উপহাসের পাত্র হয়ে যাওয়া বাল্যবন্ধু আমার উপর রাগে ফুঁসছিল বিষধর সাপের মতো। সুযোগ খুঁজছিল ছোবল দেবার। একটা সুযোগ–একটা ছোবল, আমি ভ্যানিশ।
***
কথায় বলে বাপকা বেটা সিপাইকা ঘোড়া, কুছ নেহি তো থোরা থোরা। বাপ জ্যাঠা যেমন হবে ছেলে সেই রকম হতে বাধ্য। সবটা না হলেও কিছুটা তো হবেই। সুপারের বাপ প্রাক্তন এম.এল.এ. এক জোতদার। জোতদাররা মানুষ হিসাবে কেমন হয়? যেমন শহরের নব ধনাঢ্য। অর্থগৃধ। ন্যায় অন্যায় নীতি নৈতিকতা কোনো কিছুর ধার ধারে না। মদ জুয়া বেশ্যাগমন তাদের ঠাটবাটের অঙ্গ।
জোঁক আর জোতদার দুই প্রাণীর মধ্যে একটাই সমানতা–রক্ত চুষে মোটা হয়। এদের ঠিকঠাক চিনেছিল নকশালরা। এরাও নকশালদের ঠিকঠাক চিনেছিল। যেমন সাপ আর নেউল। যে যাকে বাগে পাবে-মারবে।
সেই যখন সত্তর দশকে গ্রাম বাংলা উত্তাল হয়ে উঠেছিল, ভেবেছিল প্রাক্তন এম.এল.এ. আর বোধ হয় সাধের সাম্রাজ্য ধরে রাখা যাবে না। জমি জায়গা তো যাবেই প্রাণও বুঝি থাকে না। শোষণ জর্জর না-খাওয়া মানুষের মনে যে বারুদ জমে আছে এক প্রবল বিস্ফোরণে যেদিন ধেয়ে আসবে, লাভা স্রোতের মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। তাই সে আগেভাগে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়া উচিত বলে মনে করে। তেমন জায়গা শহর কলকাতা ছাড়া আর কোথায়! এখানে কেউ কারও নাম জানে না, খোঁজ রাখে না, অনুসন্ধিৎসা দেখায় না। ফলে এই যাদবপুরে একটা দোতলা বাড়ি কিনে চলে আসে সেই বাড়িতে। সেখানে থাকে আর মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে জমি জায়গার দেখভাল করে আসে।
যেহেতু নকশালদের প্রতি প্রাক্তন এম.এল.এ.-র একটা বিদ্বেষ ছিল, সেটা সংক্রামিত হয়েছে তার ছেলের মধ্যে। কংগ্রেস খুব ভালো, সিপিএম খুব একটা মন্দ নয় কিন্তু ওরা মহা খারাপ। ধরলেই গলা কেটে দেয়। একী কোন পার্টি! দেশে আইন আছে বিচার আছে। যদি কিছু বলার থাকে থানায় যা কোর্টে যা। সেখানে ফয়সালা হোক। শঙ্কর গুহ নিয়োগীর নামে একটা প্রচার আছে সে নকশাল। আমি তার লোক। সে কথা গোপনও করি না। আমার সাথে যারা মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে মুখে দাড়ি, কাঁধে ঝোলা, ঝোলায় বইপত্র দেখে বোঝা যায় ওরাও নকশাল। তাই আমার উপরে রাগ।
সুপার শহরে এসেছে প্রায় তিরিশ বছর। তবু এখনও গ্রাম্যতা বর্জন করে পুরোপুরি শহুরে আদব কায়দা রপ্ত করে উঠতে পারেনি। তবে একটু বাবু বাবু ভাব উদয় হয়েছে বইকি। যদিও বড় সাহেবের ক্লাস ফ্রেন্ড দ্বারোয়ান দাসদা তাকে বাবুর সম্মান দিতে নারাজ। সে তাকে পেঁচো বলে ডাকে। ছাদের দিকে মুখ করে চেঁচায়–এই পেঁচো তোরে এ্যাক গার্জেন তালাস করতাছে।
সুপার এখন হোস্টেলেই থাকে খায়, কিছুদিন পরে বাড়ি থেকে আসা যাওয়া করবে। ওয়ার্ডেন থাকে না, তবে খায়। সে মাঝে মাঝে। অন্যদিন শুধু চাখে। খায় থাকে স্পোর্টস টিচার, বাল্যবন্ধু আরও দশ বারোজন। সেই দশ বারো জন আর বোবা বাচ্চারা খেয়ে নিজের থালা নিজে ধোয়। অন্যরা ফেলে রেখে যায়।
এক দুপুরে এই কয়জন মাদারের নিজের হাতে বানানো কাঁটা চচ্চড়ি আর আমার যা রান্না সে দিয়ে দুটো সেবা করে থালা রেখে উঠে যাচ্ছিল। আমি বলি–থালা দেবার লোক নেই। যে যার থালা ধুয়ে তুলে রেখে যান।
আমার কথা শুনে তারা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। এ কী শুনছি! যা শুনছি তা ঠিক শুনছি তো?
এদের হয়ে কথা বলতে এগিয়ে এল মাদার। এ তুমি কী বলছ?
কী বলছি!
সুপার ওয়ার্ডেন মাস্টার, এরা এঁটো থালা মাজবে?
কেন মাজলে কী হবে? নিজের খাওয়া থালা তো।
এদের কোন সম্মান নেই, থালা মাজবে।
মাজুক না, তাতে মান সম্মান কী চলে যাবে?
এরা কোনদিন মাজবে না।
তাহলে পড়েই থাকবে।
তুমি মাজবে না?
আমি রান্নার লোক। রান্নার কাজ জানি। থালা মাজাটা ঠিকমতো জানি না। যে কাজ জানিনা কী করে করব?
একটু থেমে আবার বলি–আপনি তো মেয়েছেলে–রান্না, বাসন মাজা, কাপড় কাঁচা, ঘরমোছা এসব তো জানেন, আপনি থালাগুলো ধুয়ে মেজে রেখে যান না।
যারা খেয়ে থালা রেখেছে সবাই বিব্রত। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। মাদার অগ্নিশর্মা– আমাকে বাসন মাজতে বলছে, তোমার সাহস তো কম না।
হ্যাঁ, সাহস আমার একটু আছে। আমি এই রকমই। এতে দোষ হলে আমার কিছু করার নেই। আমি দল্লীতে যেতাম। তখন দেখেছি শঙ্কর গুহ নিয়োগী, ডাক্তার শৈবাল জানা, ডাক্তার পুণ্যব্রত গুণ সবাই খেয়ে নিজের থালা নিজে ধুয়ে রাখেন। তারা যা পারেন এরা তাদের পায়ের নখের যুগ্যি না হয়েও কেন পারবে না। আমি রোজ বড় বড় হাঁড়ি কড়াই মাজি। এই কটা পুঁচকে থালা বোয়া আমার কাছে কোনো বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু যদি তাদের নিজের এঁটো ধুতে আত্মসম্মানে বাঁধে পরের এঁটো ধুতে আমার কেন বাঁধবে না। আমার রাজনৈতিক শিক্ষা ওটাকে চিহ্নিত করেছে একটা পুঁজিবাদী ঝোঁক হিসাবে, অপরের উপর প্রভূত্বকারি চিন্তাধারা হিসাবে। একমাত্র পুঁজিবাদী ভাবনার লোকই নিজের কাজ অন্যকে দিয়ে করিয়ে নেয়। নিজে আরাম খায়।
