বহিরাগত শিক্ষকদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল এই স্কুলে। আগে বোবা বাচ্চাদের রান্না করে তাদের স্কুলে পাঠিয়ে দিয়ে তারপর স্পেশাল লোকজনদের জন্য স্পেশাল মেনু রান্না করি। দুপুরে একবার রাতে আর একবার। তবে অঢেল নয়, সবকিছু মাপা-পরিমিত।
সেদিন সুপার অতিথিদের জন্য বাজার থেকে কাতলা মাছ এনেছেন, মাছের পিসগুলো সত্যিই তাকিয়ে দেখার মতো। জিভে জল এসে যাবে। তবে জিভের জল গিলে নিতে হবে কারণ সে মাছ শুধু অতিথিদের জন্য। অন্য কারও পাতে পড়বে না। হোস্টেল সুপার হোস্টেলে থাকে, খায়, থাকে খায় আরও অনেকে। তাদেরও জিভে জুটবে না। কারণ সব মাথা পিছু গোনা। পঁয়ত্রিশ পিস।
সেদিন আমি অতিথিদের জন্য রান্না করেছি সরু চালের ভাত, ঝুরি ঝুরি করে আলু ভাজা, মাছের মাথা দিয়ে সোনা মুগের ডাল, কাতলা মাছের কালিয়া, পেঁপের চাটনি।
তখন বেলা প্রায় একটা দেড়টা হবে। অতিথিদের খেতে তখনও ঘন্টা খানেক দেরি আছে। ভাবলাম এই ফাঁকে চানটা সেরে ফেলি। বাচ্চারা সব ক্লাসে আটকে আছে, ছাদে কোনো বেড়াল কুকুরও আসে না। খাদ্যদ্রব্য সুরক্ষিত থাকবে। সব টাকাটুকি দিয়ে তাই চান করতে গেলাম।
আমি চান করি পুকুরে। সেটা খানিকটা দূরে। তেল মশলার ছিটে গায়ে লেগে যায় তাই চানে আমার সাবান লাগে। না হলে গা চটচট করে। একটু বেশি সময়ও লাগে।
আমার উপর শুধু রান্না করার ভার–অতিথিদের খাদ্য পরিবেশন করে অন্য লোকে। অতিথিরা তো বোবাদের মতো সিঁড়িতে বা খোলা ছাদে বসে খেতে পারে না। তারা নীচে চেয়ার টেবিলে বসে খায়। যারা খাদ্য পরিবেশক খাবার দাবার নীচে নামিয়ে নিয়ে যায়। সেদিন যখন তারা পরিবেশন আরম্ভ করল, দেখে, সাতখানা মাছ কম। গোনা মাছের সাতখানা বেমালুম উধাও।
এমনিতে মাদার আর বাল্যবন্ধু দুজনার কোনো সদ্ভাব নেই! এক সঙ্গে দুটো ষাঁড় থাকলে যা হয়–সব সময় গুঁতোগুঁতি। দুজনেই যে হেভিওয়েট। এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায়। একজন পুরুষ একজন মহিলা, একজন বাঙাল একজন ঘটি, একজন উচ্চ শিক্ষিত আর একজন সাক্ষর, কোনো মিল থাকার কথা নয়। তবে দুজনার ক্ষেত্রে একটা মিল আছে, রামকৃষ্ণ মানেন। সেই যে তিনি বলেছেন-লজ্জা ঘৃণা ভয় তিন থাকতে নয়-সেটা জানেন। খাবার ব্যাপারে দুজনেই সমান লোভী। সুযোগ পেয়েছে কী এটা সেটা হাতিয়ে নিয়ে পালায়। এমনিতে মাদার বিধবা কিন্তু খাদ্যের ব্যাপারে বামনি হননি। আমিষ নিরামিষ কাউকে নিরাশ করেন না। দুজনকেই সমান আদর দেন। রবিবার হোস্টেলে মাংস হয়। এর পুরো মেটুলিটা ওনার একার। সেটা পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে তরিজুত করে রেধে একটু সুপার একটু ওয়ার্ডেন একটু স্পোর্টস টিচারকে দেন। বাকিটা নিজে সাঁটেন।
এরা দুজনেই চেয়ে যতটা সম্ভব নেবে বাকিটা নেবে চুরি করে। দুজনেই আগে বার কয়েক ধরা পড়েছে। একদিন মাদার একটা মাছের মাথা চেয়ে একখানা পেটি নিজের ভাগের একখানা গাদা লুকিয়ে বাটির উপর থালা ঢাকা দিয়ে নিয়ে পালাচ্ছিল। আমি ধরে ফেলি। তবে তার বয়সের কথা বিবেচনা করে চোরের সাজাটা দিইনি। যা বাচ্চাদের দিয়ে থাকি।
তবে সে সব খাবার একটু কমবেশি হলে এদিক সেদিক করে সামলে নেওয়া যায়। এখন সামলাব কী করে! পাত পেতে অতিথিরা যে বসে আছে। বাঙাল’ এসেছে হরেক কিসিমের মছলি চেখে যাবে, তার কী হবে? ঠিক জানি ওই দুজন ছাড়া কারও কম্ম নয় কিন্তু কোনো প্রমাণ যে নেই।
মাছ গিয়াছে চুরি। খবর পেয়ে সুপার ছুটে এল। ছাদে উঠতে হাঁফিয়ে গেছে সে। চোখ রাগে লাল শরীরে ঘাম। বুকে ব্রাস। বড় সাহেবের অতিথি। সে যদি শোনে কী হবে? যদি কান ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়। যদি তাড়িয়ে দেয় চাকরি থেকে।
আমাকে সামনে পেয়ে ফেটে পড়ে সে, মাছ কী হল? সাতখানা মাছের কী হল? আমি বাজার থেকে গুনে এনেছি।
বলি–আমি তো জানিনা। যা এনেছেন রান্না করে রেখে চান করতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে শুনি মাছ কম।
আপনি চান করতে গিছিলেন, না হাওয়া খেতে আমাদের দেখার দরকার নেই। মাছ কোথায় রেখেছেন বের করুন। এনারা যদি খেতে না পায় বড় সাহেবকে জানাবে। আমি কিন্তু আপনার কথাই বলব। মুশকিলে পড়ে যাবেন এই আমি বলে দিলাম।
বিনা দোষে চোরের দায়ে ধরা পড়ে গেছি। সবাই আমাকে দোষারোপ করছে, কী যে করি!
তখন মনে পড়ে, আমি যখন চান করতে যাচ্ছিলাম তখন বাল্যবন্ধু আর রাজু নামের একটা কথাবলা ছেলে ছাদে আসছিল খাবার জন্য। রাজুর মা বাবা কেউ নেই। এক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, কোন এক নেতার সুপারিশে বড়সাহেব এখানে এনে রেখেছেন। তবে সদ্য সদ্য এসেছে বলে এখনও ধূর্ত হয়ে ওঠেনি। সে হবে অল্প কিছুদিন পরে। সে দায়িত্ব নিয়েছে বাল্যবন্ধু যে ওকে সাথে সাথে নিয়ে ঘোরে। শরীর সুস্থ রাখার জন্য ম্যাসাজ অতি উপকারি। কখনও রাজুকে দিয়ে বাল্যবন্ধু ম্যাসাজ করিয়ে নেন কখনও ম্যাসাজ করে দেন।
কেন জানিনা আমার মনে হল মাছ অন্তর্ধান রহস্যের কিছু সুত্র রাজুর কাছে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। ছাদে ডেকে এনে তাকে খুব হালকা ভাবে জিজ্ঞাসা করলাম–কী রে ভাত খেয়েছিস?
হ্যাঁ, বলল সে।
কোন গামলা থেকে মাছ নিয়েছিস? যেটা এইখানে ছিল সেটা থেকে না ওইখানে যেটা ছিল?
হাত দিয়ে সে সেই স্পেশাল মাছের ঝোলের গামলা দেখায়।
