দিন দশ পনের হল উনি এখানে এসেছেন। আর সারা স্কুলে যেন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। কী এক দোষে যেন দারোয়ান সাহাকে গালে কষিয়ে দিয়েছেন শাঁসালো এক চড়। সে কেঁদে কেঁদে নালিশ করল হোস্টেল সুপারের কাছে। সাহার অনেক ক্ষমতা কিন্তু সে অন্যের জন্য। একদিন বাল্যবন্ধু এক টিচারের বুকেও দুমদাম ঘুষি মেরে দিলেন। টিচারের অপরাধ সে একটা বোবা বাচ্চাকে মেরেছে। র-আদ্যাক্ষর বিশিষ্ট এই টিচার আদ্যন্ত এক র’মাল। এর কথা পরে বলব।
এই বাল্যবন্ধুর বয়স অনেক। সে, বড়সাহেব, আর দারোয়ান দাস এক স্কুলে এক ক্লাসে পড়ত। এত বয়সের লোক–তবুতার মধ্যে সব সময় একটা বালখিল্য ছ্যাবলামো, একটা অপরিণত মাস্তানি ঝোঁক, জোর করে সমীহ আদায় করার প্রবণতা দৃষ্টিকটু ভাবে সক্রিয়। আর একটা প্রবণতা–খাই খাই।
আমি এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান। চারপাশেও বহু অভাবি অনাহারি মানুষ দেখেছি কিন্তু এমন কদর্য ক্ষুধার প্রতিমূর্তি আগে আর দেখিনি। যেমন কয়েকজনকে এখানে দেখছি। এইসব বক রাক্ষসেরা বোঝে না, বোবা বাচ্চাদের বঞ্চিত করে তারা দুধ ডিম মাছ মাংস খাচ্ছে না, সেই সাথে সে নিজের মান-সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসাও খেয়ে নিচ্ছে। যারা দেখছে আড়ালে নিন্দা করছে।
বোবা বাচ্চারা সকালে হালকা টিফিন খায়, দশটায় ভাত ডাল ভাজি মাছ বা ডিমের ঝোল। সেদিন সকালে বাচ্চাদের মুড়ি চানাচুর দিয়েছি। তারা টিফিন নিয়ে চলে যাবার পর বাল্যবন্ধু এলেন। একটা বাটিতে এক বাটি মুড়ি তাকেও দিলাম। সে ছাদে দাঁড়িয়ে মুড়ি চিবুতে লাগল। চারিদিকের দৃশ্যপট বড় মনোরম। দূরে একটা বড় পুকুর সেখানে মেয়েরা চান করছে কাপড়
কাঁচছে। ছাদ থেকে দেখা যায়।
সেদিন দুপুরের খাদ্য তালিকায় ডিম ছিল। ডিম সেদ্ধ করে নামিয়ে রাখার পর মনে হল পেটটা কামড়াচ্ছে। একটু পায়খানায় যেতে হবে। তখন বলি বাল্যবন্ধুকে, দাদা, আপনি বসে মুড়ি খান–এসে আপনাকে চা দেব। আমি একটু নীচে যাচ্ছি। পায়খানা। দশ মিনিটের মধ্যে আসছি।
নীচে নেমে এসে মনে পড়ল, আরে খইনির ডিব্বাটা তত আনা হয়নি। মুখে খইনি না দিলে মল নির্গত হবার নয়। পুরানো অভ্যাস। তাই দৌড়ে আবার উপরে উঠে এলাম।
আমি গেছি পায়খানায়। ফিরে আসতে যত কম হোক দশ বারো মিনিট তো লাগবারই কথা। বাল্যবন্ধু বেশ নিশ্চিত মনে দুখানা ডিম তুলে নিয়ে খোসা টোসা ছাড়িয়ে মুড়ির বাটিতে নিয়েছেন, ধীরেসুস্থে খাবেন। মন ছিল মুড়ির বাটির দিকে কান আর চোখ ছিল সিঁড়ির দিকে। আমি না হই অন্য কেউ তো এসে পড়তে পারে। যেই দেখেছেন অন্য কেউ নয় আমি হাওয়াই চটি ফটাস ফটাস করে দ্রুত উপরে উঠে আসছি পাছে চুরিটা ধরা পড়ে যায়, খপাখপ দুটো ডিমই মুখে পুরে দেন। ডিমের উপরের সাদা অংশটা তখন কিছুটা ঠাণ্ডা হলেও ভেতরটা আগুন। তাড়াহুড়ো করে গিলতে গিয়ে সেই ডিমের গরম কুসুম আটকে গেল গলায়। আর উনি শ্বাস নিতে পারছেন না। দুটো চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে। ডুবন্ত মানুষের মতো হাত দিয়ে শুন্যে কী যেন একটা ধরার চেষ্টা করছেন। ধরতে পারছেন না। শেষে শুয়ে পড়লেন ছাদে। হাত পা ছুঁড়তে লাগলেন কাটা ছাগলের মতো।
প্রথমে এমন দৃশ্য দেখে আমি ভেবেছিলাম বুঝি হার্ট এট্যাক হয়েছে। এগিয়ে গিয়ে হাঁ মুখের মধ্যে সিদ্ধ ডিম দেখে বুঝতে পারলাম হার্টে নয়, এ্যাটাক হয়েছে শ্বাসনালিতে। তখন গলায় জল ঢেলে অতিকষ্টে ডিমকে ঠেলে দেওয়া গেল পাকস্থলির দিকে। তার যাত্রা শুভ হল।
এতবড় একটা ব্যাপার চাপা থাকার কথা নয়। সে ভেবেছিল তার বয়স এবং মর্যাদার কথা স্মরণে রেখে আমি এমন লজ্জার কথা পাঁচকান করব না। পাঁচ কান করিনি, তার সম্মানের কথা ভেবে দশ কান করেছিলাম। আমার পক্ষে চেপে যাওয়া সম্ভব ছিল না। এর আগে বেশ কয়েকবার ডিম মাছ চুরি গেছে! উনি করেছেন বলছিনা, বোবারাও করতে পারে। আমাকে প্রস্রব পায়খানায় যেতে হলে যেতে হবে একতলায়, যার ইংরাজি নাম গ্রাউন্ডফ্লোর। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তিনতলা থেকে দেখতে পায়। তখনই ছুটে এসে যে যা পায় নিয়ে পালায়। রোজকার বাজার রোজ হয়, মাছ ডিম আসে গুনে গুনে। যদি কেউ ডবল নেয় একজন পায় না। তখন দোষ পড়ে আমার ঘাড়ে। অনেক কটা সন্দেহঘন তর্জনি বেয়নেটের মতো আমাকে বিদ্ধ করে।
আমি নিজেকে নিজে সম্মান করি। সেই সম্মানের গায়ে কোনো কালির ছিটে লাগুক তেমন কাজ করি না। তবু অপমানিত হই। যারা সেটা করে তারা নিজেরা নিজেদের সম্মান করে না। ফলে অন্যরাও তাকে সম্মানীয় ভাবে না। হ্যাঁ ভয় করে ডাকাতের মতো বা তার চেয়েও বেশি। ওই লোকগুলো সেটাকে ভক্তি শ্রদ্ধা সম্মান বলে মনে করে। মনে করে এটা পাবার অধিকার তার জন্মগত। অন্য কারও সেই অধিকার বা যোগ্যতা নেই। সব অতি হীন দীন তুচ্ছ। তাই অন্যকে অসম্মান অপমান করতে তাদের বাধে না।
আমি বাল্যবন্ধুকে অপমান করতে চাইনি। সে তো নিজেকে নিয়ে গেছে সেই জায়গায়। আমি শুধু সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছিলাম। তাতেই ক্রুদ্ধ হলেন তিনি।
***
একবার স্কুলে সাইন ল্যাংগোয়েজের কুড়িদিনের একটা কোর্স শুরু হল। যারা বোবা বাচ্চাদের শিক্ষক তাদের শেখানো হল হাতের আঙুলে বিভিন্ন মুদ্রা ফুটিয়ে কীভাবে বিভিন্ন বিষয় বিশদভাবে বোবাদের বুঝিয়ে দেওয়া যায়। এর ব্যবস্থাপনায় ছিল এই মূক বধির বিদ্যালয় এবং সহযোগিতায় ছিল নরেন্দ্রপুরের রামকৃষ্ণ মিশন, সারা দেশের পঁয়ত্রিশ জন ওই ভাষায় দক্ষ শিক্ষক এসেছিলেন এখানকার শিক্ষকদের শিক্ষা দিতে। আগে তারা নিজেরা শিখে পরে বোবাদের শিক্ষা দেবে।
