সেই যে মরিচ ঝাপির অসংখ্য আমার মা বোন মেয়ে নির্মম ধর্ষণের শিকার। সেই যে অসংখ্য বাঘ কুমিরের পেটে চলে যাওয়া আমারই বাবা ভাই সন্তান কী করে ভাববো তাদের সাথে যা হয়েছে–ভালো হয়েছে। ভালো হয়েছে–সে আমার সঙ্গে যুদ্ধরত এই দুর্যোধন দুঃশাসনদের দলের। এরাই তাদের ব্যবহার করেছে দাবার বোড়ের মতো। যেদিন বুঝেছে আর দরকার নেই, বোড়ের মতো মারিয়ে দিয়েছে।
আমি একটা বোড়ে মার খাইয়ে দিই। আমার কালো গজের চলার পথ খুলে রাখার জন্য। যদি সুযোগ করতে পারি গজের জোরে মন্ত্রী রাজার সামনে গিয়ে বসবে। এদিক ওদিকে চাল দিয়ে ওয়ার্ডেনকে অন্যমনস্ক করে রাখি আর সুযোগ খুঁজি।
সে আমার একটা ঘোড়া একটা হাতি চারটে বোড়ে একটা গজ মেরে দিয়েছে। আমি মেরেছি একটা ঘোড়া একটা গজ দুটো বোড়ে। পয়েন্টের হিসাবে সে এগিয়ে আছে।
এবার আমি একটা ‘অন্যমনস্ক’ভাবে চাল দিয়ে আর একটা ঘোড়াকে এমন জায়গায় বসালাম যে প্রতিপক্ষের তাকে মারতেই হবে। না মারলে চেক দিয়ে একটা নৌকা পেয়ে যাব। সেই চালটা সে দেখেছিল, পরের চালটা দেখেনি। তাই ঘোড়া মারল, আর আমার পথ খুলে গেল। মন্ত্রী গিয়ে বসে গেল রাজার সামনে কালো গজের জোরে, খেলা মাৎ!
হারিয়ে দিলাম লোকটাকে। যেন বদলা নিলাম এতদিনের অত্যাচারের। হেরে সে আবার ঘুটি সাজালো। মাথা গরম হয়ে গেছে তার। চালে ভুল করল, আবার হারল। পরপর চার গেম হেরে তার সারা মুখে যেন মেঘ জমে উঠল।
বলল–আর একদিন খেলব। সেদিন আপনাকে হারাব।
বললাম–হারি যদি লড়েই হারব।
***
একজন লোক এসেছে। এখন থেকে সে এখানে থাকবে। কারণ তার কোনো থাকার জায়গা নেই। এতকাল সে বউয়ের বাপের বাড়িতে থাকত।বউ আর মেয়ে দুজনে মিলে তাকে সেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সে সেটা কাউকে বলে না। যেটা বলে তা হল, কেষ্ট আমার বাল্যবন্ধু। কেষ্ট বড় সাহেবের বাল্যবেলার ডাকনাম। কেস্টোকইল তুই গিয়া হোস্টেলে থাক। আর ইসকুলডারে দেইখ্যা শুইন্যা রাখ, তাই আইলাম। নইলে আমার কীসের ঠ্যাকা। বন্ধুর কথা তো ফ্যালাইতে পারি না।
বড় সাহেবের বাল্যবন্ধু এই লোকটা আগে একটা ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করত। এর বংশ ইতিহাস যা জেনেছি, তাতে লোকটা সত্যিই একটা বড় বংশের সন্তান। যে বংশের লোক সাহিত্য এবং রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রে অনেক উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। সেই বংশে এই লোটার মতো এমন একটা কুলাঙ্গার কুমড়ো-পটাশ কেমন করে জন্ম নিল সেটা একটা বিস্ময়।
হয়তো এটাই হয়ে থাকে। যে কারণে শিব্রাম চক্কোরবর্তী বলে গেছেন–বাঁশের গা থেকে যা জন্মায় তা বাঁশ হয় না, কঞ্চি হয়।
আমার দুর্ভাগ্য এক মহান বংশের সদস্যকে নিয়ে আমি একটাও ভালো কথা লিখতে পারব না। এক অর্থে এই লেখার সবটাই শুধু কেচ্ছা কেলেঙ্কারির কালো বাখান। আমি কী করব! যদি আমি এসব না লিখে রেখে যাই মানুষ কী করে জানবে কী যম-যন্ত্রণা ভোগ করতে করতে আমি– ‘আমি’ হয়ে উঠেছি। কী বিরূপ সময় কী নির্দয় নিষ্ঠুর মানুষ আমাকে অনবরত ছিঁড়েছে। একটা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত আবাসিক স্কুল–যার সঞ্চালন করে একদল কথিত বামপন্থী। তারা যে কী ভীষণ জীব সে কথা না বললে আমি নিজের কাছে সত্য গোপন করা পাপে পাপী হয়ে যাব।
পৃথিবীতে একদল মানুষ আছে যারা বাঁচার জন্য খায়। আর একদল মানুষ আছে যারা খাবার জন্যই বাঁচে। শুধু খাওয়া আর কিছু নয়। সর্বক্ষণ এদের পেটের মধ্যে রাবণের চিতা জ্বলে। দিনরাত এক চিন্তা এক ধান্ধা–কী খাব, কোথায় পাবো। সেই যে একটা গল্পে আছে একজন লোক তীর্থ করে ফিরেছে, সবাই তার কাছে গিয়ে বসল কিছু ভ্রমণ বৃত্তান্ত শোনবার জন্য, তীর্থস্থান মাহাত্ম্য শোনবার আশায়। কিন্তু সে সবের কোথায় কী। সে সারাক্ষণ শুধু বলে গেল কোথায় কোন খাদ্য মেলে কী তার স্বাদ। ভাইরে অমরনাথ যদি যাও দেখবে মাড়োয়ারিরা পথের পাশে ভাণ্ডারা খুলে রেখেছে। আহঃ, খাঁটি ঘিয়ে ভাজা লুচি-হালুয়া কী তার স্বাদ….। বাল্যবন্ধুর যে কোন গল্প সে যেখান থেকেই শুরু হোক, শেষ হবে পাবদা মাছ, গলদা চিংড়ি, ইলিশ পাতুরি, তেল কই এইসবে গিয়ে।
বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রথম কিছুদিন সে এক হোটেলে গিয়েছিল। ভেবেছিল দু দশদিন পরে রাগ কমে গেলে বউ মেয়ে গিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। ফিরিয়ে আনেনি। এদিকে পকেটের পয়সা সব শেষ। তখন সে শেষ আশা ভরসার কেন্দ্র বাল্যবন্ধু বড় সাহেবকে ফোন করে। তুই ক’ কেষ্টা অখন আমি কী করি! গলায় দড়ি না দিয়া আর কোন উপায় দেখি না। তখন বড় সাহেব একে এখানে নিয়ে আসেন। গোটা চল্লিশ বোবা আছে, তাদের খাবার থেকে আরও পাঁচ দশ জনকে পালন পোষণ তো করাই যায়।
দুটো বিশাল বিশাল ব্যাগে জমা কাপড় আরও অনেক কিছু নিয়ে সে এল। এসেই জানিয়ে দিল, আমি বড় সাহেবের ছোটবেলার বন্ধু। বড় সাহেব আমারে স্কুলের দেখাশোনা করবার জইন্য আনছে। কইছে, যে তোর কথা না শুনবো সম্মান না দিবো–আমারে কবি। লাথি মাইরা তারে বাইর কইরা দিমু। একা আমাকে নয়, স্কুলের ছোট বড় সবাইকে সে এই কথা বার বার শোনালো। আমি তো আমি–টিচার ইনচার্জ পর্যন্ত কেঁপে গেল তার আগমনে।
শোনা গেল, সেই শোনালো–মহারাষ্ট্রের কোনো এক শহরে তার গাড়ি আর এক লরিতে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। বাল্যবন্ধুর গাড়ি গড়িয়ে পাহাড় থেকে নীচে পড়ে যায়। সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকে পাঠানো হয় কোন এক হাসপাতালে। যেই সে খবর বড়সাহেব পেলেন এক কাপড়ে প্লেন ধরে উড়ে চলে গেলেন মহারাষ্ট্রে, বন্ধুর প্রতি এমন টানা বন্ধু নয়, যেন এক প্রাণ এক দেহ। এমন লোককে ভয় পাবে না তেমন বুকের পাটা কার?
