সাহা লেখাপড়া জানে না। তেমন কোনো ভালো সঙ্গ পায়নি। মাথা মোটা নির্বোধ লোক। বড় সাহেবের প্রশ্রয় পেয়ে সে ধরাকে সরাজ্ঞান করে। এক এক সময় এমন কথা বলে–কী তার অর্থ নিজেও জানে না। এমন কাজ করে তার পরিণাম নিয়ে ভাবে না। সে যে আমার ব্যাগ সার্চ করে এটা যে আমাকে অপমান সেটা সে বোঝে না।
আমার ধারণা অবশ্যই এর পিছনে ওয়ার্ডেনের উস্কানি আছে। সাহাদা, এখন তোমার ডিউটি। যদি কোনো দামি মাল পাচার হয়ে যায় তুমি দায়ী। জানো ব্যাগে কী আছে? দেখাটা তোমার ডিউটির মধ্যে পড়ে।
এই কারণে ওয়ার্ডেন লোকটাকে দেখলে আমার শরীর জ্বলে। কিন্তু সেই জ্বলে যাওয়া শরীর নিয়ে আমি কী বা করতে পারি। যদি উড়ে যাওয়া কাক কারও মাথায় মলত্যাগ করে সে কী করতে পারে! নকশাল নেতা আজিজুল হক জেলখানায় ছিল। কত বড় নেতা! সেই তাকেই এক সেপাই লাঠি পেটা করত। আমি তো সেই রকম এক কয়েদখানায় এসে পড়েছি। সয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী করতে পারি।
রুনু গুহ নিয়োগীর আত্মজীবনীতে একটা মজার ঘটনার কথা লেখা আছে। রুনুর বন্ধু এক পুলিশ অফিসার যথেষ্ট দক্ষ অফিসার বলে ডিপার্টমেন্টে পরিচিত ছিল। অনেক কটা বড় বড় কেস সে ফয়সালা করেছিল। তবু তার বস কিছুতেই অফিসারটির প্রতি ভালো ব্যবহার করত না। অনবরত কাজে খুঁত খুঁজত। খুঁত পেলেই হেনস্থা করত! বন্ধুর এহেন দশায় রুনু খুব কষ্ট পেত। শেষে সে একদিন তার তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে আবিষ্কার করল এর কার্যকারণের সুগভীর রহস্য।
জানতে পারল বন্ধু তার বসের সাথে টেবিল টেনিস খেলে মাঝে মাঝে। দক্ষ খেলোয়াড় বন্ধুটি বার বার তার বসকে সেই খেলায় হারিয়ে দেয়। এটাই তার একমাত্র অপরাধ।
তখন বন্ধুকে পরামর্শ দেয় রুনু আর বসকে হারিও না। এবার তুমি হারতে থাকো। যদি খেলায় আর বসকে না হারাও অন্যত্র জয়ী হবে। চাকরি জীবন সুখময় হবে। এই যে তোমার কাছে বস হারে সেই মনোকষ্টে তার রাগ হয়ে যায়। আর ঊধ্বর্তন হবার সুবাদে ওইভাবে রাগ মিটিয়ে নেয়।
আমি কৌশলি নই। জীবনে কখনও কোথাও কৌশল করিনি। যারা কৌশল করে বাঁচে তেমন কাউকে গুরুপদে বরণ করিনি। পাহাড়চূড়া থেকে গড়িয়ে নামা নুড়ির মতো গড়িয়ে গেছে জীবন। যদি কৌশল করতে শিখতাম, জীবনের বহু দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেয়ে যেতাম। এইখানে আমি সেই সাহার চেয়েও অজ্ঞ মূর্খ।
তার উপর আবার ওই বাকসর্বস্ব দর্পী দম্ভী অহঙ্কারি অত্যাচারি ওয়ার্ডেন লোকটাকে মোটেই সহ্য করতে পারি না। যারা সত্যিকারের শ্রমিক কৃষক গরিব মানুষদের ভালোবাসত এবং তাদের হিত কামনায় সিপিএম পার্টিতে যোগ দিয়ে বহু দুঃখ কষ্ট বরণ করেছে, তাদের সেই আত্মত্যাগের ফসল এরা চেটেপুটে খেয়ে হয়ে উঠেছে মানুষেরই সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই এইসব ধান্ধাবাজ আমার দুচোখের বিষ। প্রাণ চায় এদের বিনাশ দেখতে–বিলুপ্তি দেখতে।
.
এক রবিবার রান্নাবান্না শেষ করে বসে আছি, বাচ্চারা চান করে খেতে আসছে না। কেন আসছে না? খোঁজ নিতে হোস্টেল রুমে গিয়ে দেখি গোটা আটেক দাবার বোর্ড নিয়ে জোড়া জোড়া বসে রয়েছে। কোথায় যেন দাবা প্রতিযোগিতা হবে মূক বধিরদের। তারই প্রস্তুতি চলছে। ওয়ার্ডেনও সেখানে রয়েছে। সেও দাবা খেলছে।
তার সাথে কেউ খেলতে চাইছে না হেরে যাবার ভয়ে। সে ডেকে ডেকে এক এক জনকে বসাচ্ছে আর হারাচ্ছে। হারিয়েই এমন চিৎকার করছে যেন দিব্যেন্দু বড়ুয়াকে হারিয়ে দিল। জিতে গেল পলাশীর যুদ্ধে। দখল করে নিল হোয়াইট হাউস।
আমি দাবা খেলাটা শিখেছিলাম জেলখানায় বসে। আমার মাস্টারমশাই বলেছিলেন, খুব ভালো খেলা। রোজ এক ঘন্টা খেললে মস্তিষ্কের ব্যায়াম হয়, কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। আমার জীবন যে রকম, মস্তিষ্কের কার্য ক্ষমতা বাড়াবার সময় মেলে না।
ওয়ার্ডেন আর একজন প্রতিপক্ষকে নিয়ে খেলতে বসেছে। দুর্বল প্রতিপক্ষ বলে হেলাফেলা করে চাল দিচ্ছে। নিজের রক্ষণভাগের দিকে খুব একটা লক্ষ্য না রেখে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এক সময় আমি দেখতে পেলাম একটা নৌকাকে মার খাইয়ে দিলে ঘোড়া আর মন্ত্রী যে পজিশনে এসে যাবে পরের চালে ওয়ার্ডেনের মাৎ অনিবার্য। আমি ছেলেটার হয়ে নৌকা ঠেলে দিলাম এই চালটা থাকুক।
কী বোকার মতো চাল দিচ্ছেন। ফালতু নৌকাটা চলে যাবে। এটা ষোলঘুটি খেলা নয়–দাবা।
হেসে বলি–জানি তো দাবা। পারলে নৌকা মারুন।
মারলাম বলেই সে তার মন্ত্রী সরিয়ে নিল। ফাঁদে পা দিল আমার। আর হার কে বাঁচায়।
বলে সে–দাবা খেলতে জানেন?
তেমন কিছু না, একটু আধটু।
হেরে ওয়ার্ডেন রেগে গেছে। এবার সে আমাকে হারিয়ে প্রতিশোধ নেবে হারের। বলে, তবে এক হাত হয়ে যাক।
বলি–বাচ্চাদের খেতে দেব।
বেশি সময় লাগবে না। বসুন–।
বসে পড়ি দাবার বোর্ডের সামনে কালো ঘুটি নিয়ে। দাবার বোর্ড নয়–এটা যেন তখন আমার কাছে কুরুক্ষেত্র রণাঙ্গন। আমার সামনে দাম্ভিক সেনাপতি দুর্যোধন। গদা হাতে সে আমার মস্তক চূর্ণ করার জন্য এগিয়ে আসছে। আমি দেখছি তার দর্প ভরা যুগল ঊরু। একটা সামান্য সুযোগ পেলেই শুইয়ে ফেলে দেব।
আমার রুনু পড়া ছিল না। পড়লেও প্রভাবিত হতাম কিনা তা বলতে পারি না। ধর্ম পুস্তক তো পড়েছি তবু আমার এই জীবনের জন্য গত জন্মের কর্মফল মানতে পারলাম কই! যা হয়েছে–ভালো হয়েছে, যা হচ্ছে ভালো হচ্ছে, যা হবে ভালো হবে। এমন কথায় আস্থা আসে কোথায়? সব বোগাস বলে মনে হয়।
