আজ যখন ইচ্ছেমত নিজের পাত্রে দুধ ঢালছে দেখে হঠাৎ মাথাটা গরম হয়ে উঠল আমার। অপরাধ যে করে আর অপরাধ যে সহে দুজনে সমান অপরাধী। আজ সেই অন্যায়কারি হাতটা চেপে ধরলাম আমি। কোথা থেকে যে মনের জোর এল তা জানিনা।
বলি–এত দুধ নেবেন না। এটা ঠিক নয়।
এটা তার রাখী-বাঁধা ভাইয়ের স্কুল। গলায় তখন তার সেই অধিকারবোধ। কোনটা ঠিক কোন্টা বেঠিক তা কি আমার তোমার কাছে শিখতে হবে!
আমার যে তখন মাথা গরম। সমান ঝঝে জবাব দিই, কার কাছে শিখবেন তাহলে! এত বছরে কেউ তো শেখায়নি। ভালো কিছু তো সে শেখাতে পারে যে নিজে তা জানো তেমন লোকের সঙ্গে তো মেশেননি কোনদিন।
মহিলা অসম্ভব জেদি। হার মানতে জানে না। দুধটা তার পাত্র থেকে ঢেলে রেখেছিলাম। সে আবার সেখান থেকে নিজের পাত্রে তুলতে যায়। এই দুধে বড় সাহেবের চা-ও হয়। সে থাকলে সাথে বিশ পঁচিশ জন লোক থাকে। তাদের চা-ও হয়। সেটাই মহিলার যুক্তি আর শক্তির উৎস। বলে–তোমার কোন কথা শুনব না। সুপার আর ওয়ার্ডেনের নাম ধরে বলে–ওরা বলুক, নেবেন না। নেব না।
ওরা কেন বলবে! ওরা তো ভাগে আছে যাদের জন্য দুধ সেই বাচ্চারা বলুক। তখন নিয়ে যাবেন সবটা। আমার কোন আপত্তি নেই। দুধ খাবেন আপনারা, বাচ্চাদের রাগ জমবে আমার উপর, সেটা চলবে না। যেটুকু দুধ পাত্রে তুলেছিল যথাস্থানে ঢেলে দিয়ে সে চিৎকার করে গালাগালি দিতে দিতে নীচে নেমে যায়। বুঝতে বাকি থাকে না আমার, একটা ঝড় উঠবে। এই অপমান সে নীরবে মেনে নেবে–এমন মায়ের মেয়ে সে নয়, কেন মেনে নেবে তার পিছনে যে শক্ত খুঁটি আছে।
আমি বিপ্লবী অনন্ত সিংয়ের জীবনী ‘কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত’ পড়েছি। ওনাকে আমি জীবনে একবারই মাত্র দেখেছি। প্রেসিডেন্সি জেলের বড় গেট থেকে ফিরে যাচ্ছিলেন ওয়ার্ডে। হুইলচেয়ারে বসা ছিলেন তিনি। একজন ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। আর
ওনাকে দেখে বুকটায় মোচড় মেরেছিল আমার মনে হচ্ছিল যেন প্রাচীন এক ঐতিহ্যশালী মহাবৃক্ষের ধ্বংসাবশেষ। এই সেই মানুষ যার নামে সূর্য অস্ত না যাওয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসকদের বুক কেঁপে যেত। সময় মহাশক্তিমান, আবার সময় কী অবিবেচকও। এক লৌহ পুরুষকে পরিণত করে দিয়েছে লোহালক্করে। আর ঠুসে দিয়েছে সেই দেশের সেই জেলে যে দেশকে স্বাধীন করার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন। দেশ তো স্বাধীন হয়ে গেছে পরাধীন হয়ে গেছে, দেশের মানুষ দেশের মানুষেরই কাছে।
তবে এখনও আমার পড়ে ওঠা হয়নি রুনু গুহ নিয়োগীর ‘সাদা আমি কালো আমি’। সেটা পড়েছি অনেক পরে।
প্রত্যেকটা মানুষের তার জীবন-কার্যকলাপ সম্বন্ধে নিজস্ব কিছু ব্যাখ্যা আছে।কী সেই ব্যাখ্যা, যদি গান্ধীজির হত্যাকারি নাথুরাম গডসের ভাই গোপাল গডসের বই ‘গান্ধী বধ কিউ’ না পড়তাম কিছুতে জানতে পারতাম না। যারা এই সহস্রাব্দের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতার বুক লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল–কী তাদের রাগের উৎস-লেখা আছে সেই বইয়ে। তাদের যুক্তি আমি মানতে নাও পারি। তাতে তাদের বিশ্বাসের কিছু-হানি বৃদ্ধি হবে না।
আমার ধারণায় মানুষ যতই তুচ্ছ নগণ্য, হীন, জঘন্য হোক, প্রত্যেকের জীবন থেকে কিছু না কিছু শেখা যায়। যা পরবর্তীকালে কোনো না কোনো কাজে আসে। আমাদের ওয়ার্ডেন লোকটাও এর বাইরে নয়। শেখার মতো তার কাছেও অনেক কিছু আছে। যারা ডাস্টবিন ঘাঁটে তারা জানে, ওই আবর্জনার মধ্যেও মন্ডা মেঠাই মিলে যায়।
চাকুরিজীবি লোকেরা জানে কাজ কম করলাম কী বেশি সেটা কোনো কথা নয়–আসল কথা তোমার উপর বস সন্তুষ্ট হচ্ছে কিনা। কোথায় কোথায় যেন শুনি বইপত্রেও পড়ি-কেউ কেউ তো বসের নেক নজরে থাকার জন্য, পদোন্নতির জন্য নিজের বউকেও বসের মনোরঞ্জনের নিমিত্তে পাঠিয়ে দেয়।
আমি জানিনা কী কৌশলে ওয়ার্ডেন তার উপরঅলাকে পটিয়ে রেখেছে। এর উপরে এর বস খুবই সন্তুষ্ট তাই কোনো কাজ না করে এমনকী কর্মস্থলে না থেকেও দিব্যি চাকরি করে যাচ্ছে। কিন্তু আমার বস ওই ওয়ার্ডেন আমার উপর মোটেই সন্তুষ্ট নয়। আমাকে সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। আর তাই আজকাল আমাকে প্রতিক্ষণ বিরক্ত আর অপমান করার ব্রত নিয়েছে।
আমি খেতে বসেছি, কাছে এসে চোখ বড় বড় করে থালাটা দেখল। তারপর এমন একটা মন্তব্য করে দিল যে খাবার আর গলা দিয়ে নামানো দায় হয়ে উঠল।কী?না, আমার মাছের পিসটা বড়। ওটা বাচ্চাদের দিয়ে সবচেয়ে ছোটটা রাখা উচিত ছিল।
কাজের পরে দুপুর বেলায় আমি নিজস্ব দরকারে স্কুলের বাইরে যাবার সময় গেটে দ্বারোয়ান দিয়ে মাঝে মাঝে আমার ব্যাগ তল্লাশি করায়, কিছু নিয়ে যাচ্ছি কিনা। একবার সেনিজেইকরেছিল। তবে সে নিজে বা দ্বারোয়ান এমনভাবে তল্লাশি করে যেন ইয়ার্কি করছে। দেখান তো দাদা ব্যাগটা, মনে হচ্ছে কোনো লুকানো মাল আছে। হাসে আর বলে।
এই কাজে যার সবচেয়ে বেশি উৎসাহ সে হচ্ছে বাংলাদেশী সাহা। জানিনা, এই লোকটা বা কোনমন্ত্রে বড় সাহেবকে বশ করে ফেলেছে। রাত দশটায় আসে বিছানা করে শুয়ে পড়ে। সকালে চলে যায়। এক রাতে চোর এসে বড় সাহেবের সদ্য কেনা দুখানা গাড়ির দরজা খুলে গাড়ির ভিতরে রাখা টেপ রেকর্ডারসহ আরও কিছু দামি মাল নিয়ে পালিয়ে যায়। তবু তার রাতে ডিউটিতে ঘুম কামাই নেই।
