সবচেয়ে করুণ অবস্থা আমার মায়ের। সেই কবে পাওয়া সরকারি কাপড় এখন পচে ছিঁড়ে ন্যাতা। তা দিয়ে আর লজ্জা নিবারণ করা যায় না। শেষে নিরুপায় আমার মা কবেকার ছেঁড়া এক টুকরো মশারি অঙ্গে জড়িয়ে কুড়ে ঘরের এক অন্ধকার কোণ খুঁজে আত্মগোপন করলেন। শত প্রয়োজনেও আর তার দিনের আলোয় ঘরের বাইরে আসবার উপায় রইল না।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে মানুষ নাকি ঈশ্বরের এক মহান সৃষ্টি। চুরাশি কোটি যোনি ভ্রমণ করবার পর মানব জনম মেলে। এ এক দুর্লভ জনম। আমি মানব কুলে জন্ম গ্রহণ করেছি। তাহলে যিনি আমাকে এমন মহান এমন সার্থক জীবন দিয়েছেন তাকে তো ধন্যবাদ দিতেই হয়!
আমার জন্মদাতা পিতা আমার চোখের সামনে পেটের ব্যথায় বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে মারা যাচ্ছেন। আমার গর্ভধারিণী মা এক টুকরো বস্ত্রের অভাবে গর্তে ইঁদুরতুল্য জীবন যাপন করছেন। দিনের আলো তার ভাগ্যে নেই। প্রবল শীতের দিনে যে একটু রোদে এসে বসবেন তা আর পারবেন না। কেননা দিনের আলোয় ওত পেতে থাকে অসংখ্য রাক্ষুসে চোখ। যে চোখ উদোম অঙ্গ প্রত্যঙ্গ শবদেহের কৃমিকীটের মত খুবলে খেতে চায়। আমার একটা বোন না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরে গেছে। তিনটে ভাইবোন শুকোচ্ছে। কদিন পরে মরবে। আমার বুড়ি দিদিমা থলি নিয়ে বাজারে পঁচা আলু পোকা বেগুন শুকনো শিম যা চাষিরা ফেলে দিয়ে গেছে কুড়িয়ে বেড়ায়। যদি ওই পরিত্যক্ত বস্তুর মধ্যে একটু বেঁচে থাকার উপাদান মিলে যায়।
এ জীবন যদি মহান আর সার্থক না হয়, তবে আর সার্থকতা কী!
আমার বাবা ছিলেন একজন সৎ মানুষ। সারা জীবনে কোনদিন কারও অপকার করেননি, মিথ্যা বলেননি। তিনি ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী। মায়ের মুখে শুনেছিকাকারাও বলেছেন আশেপাশের দশগ্রামে বাবার মত পরিশ্রম করার ক্ষমতা কারও ছিল না। এক বস্তা ধান এক ঝটকায় একা মাথায় তুলে দুক্রোশ পথ হেঁটে যেতে পারতেন এবং তিনি ছিলেন ভীষণ রকম ঈশ্বর বিশ্বাসী। জীবনে তার কোন বড় আশা ছিল না। দু বেলা দুমুঠো মোটাচালের ভাত। আর তার সাথে যদি একটু তরকারি মিলে যায় তবে তো কোন কথাই নেই। সে যেন উৎসব। কিন্তু তার সত্যবাদিতা সারল্য কঠোর পরিশ্রম ও ঈশ্বর ভক্তি কিছুতেই তার ভাগ্যে সেটুকু সুখ প্রাপ্তি ঘটাতে সক্ষম হয়নি। সারা জীবন আমি বাবাকে কোনদিন পেট ভরে ভাত খেতে পেয়েছে এমন দেখিনি। কোনদিন দেখিনি গায়ে জামা, পায়ে জুতো। তার বুকের হাড়গুলো গোনা যায়।
এমন মানুষের ভাগ্যে এত দুরবস্থা কেন? আমার কিশোর মন যে এই প্রশ্নের উত্তর দাবি করে। কার কাছে আছে এর উত্তর।
উত্তর চাই। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম উত্তর খুঁজতে এবার ঘর ছেড়ে পথে বের হতে হবে। ঘরকুনো হয়ে থাকা আর নয়। খুঁজে দেখতে হবে পৃথিবীর কোন কোণে আমার ভাগ্য আমার জন্য কিছু ফেলে রেখেছে কিনা। নাকি আমার জীবনও নিঃস্ব রিক্ত কপর্দকহীন কাটবে, যেমন কেটেছে আমার বাবা কাকা ঠাকুরদার।
তখন সেই কিশোর ছেলেটির জানা ছিল না পৃথিবী কত রুক্ষ, কঠিন হৃদয়, নির্দয়। এখানকার সকল সুখ সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে মুষ্টিমেয় কিছু লোক। যারা তা থেকে এক কানাকড়িও কাউকে দেবে না। সবাই তাকে বঞ্চিত করবে ঠকাবে। শেষে শূন্যহাতে আবার ফিরিয়ে দেবে পুরানো অবস্থায় পুরানো অবস্থানে।
জানত না সেই কিশোর আজ যে ভাবে যে পথ ধরে হেঁটে পৃথিবী পরিক্রমায় চলে যাচ্ছে, সেই পথে সে ভাবে আর ফিরে আসা হবে না। সমস্ত শরীর মনে জড়িয়ে যাবে পথের ধুলো। যার আর এক নাম হতে পারে তিক্ত অনুভব। যা তার আগামী ভাবনা চিন্তা জীবন যাত্রাকে প্রভাবিত করবে, নিয়ন্ত্রণ করবে। সে আর তাকে বাধ্য বিনয়ী সুশীল থাকতে দেবে না, অবাধ্য দুর্বিনীত অসামাজিক, যা কিছু শ্রদ্ধেয়, শ্রেষ্ঠ মহোত্তম সব কিছুর প্রতি এক অসহিষ্ণু ধ্বংস প্রবণ করে তুলবে।
ঘোলা আর দোতলা দুটো গ্রাম। যার মাঝখান থেকে বয়ে যাচ্ছে একটা নোনা জলের খাল। পশ্চিম থেকে সোজা পূর্বদিকে। এই খালের দুপাড় জুড়ে কয়েক হাজার রিফিউজিদের বসবাস। এই খাল পাড় ধরে কিছুটা হাঁটলে সামনে পড়বে রামধারি ব্রিজ। যার উপর দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে একটা পাকা রাস্তা। এই রাস্তায় ক্যানিং থেকে গড়িয়া পর্যন্ত আশি নম্বর বাস চলাচল করে। বাস রাস্তা পার হয়ে, রামধারি ব্রিজ পিছনে ফেলে, কেটে নেওয়া ধান ক্ষেতের মধ্য থেকে সরু পায়ে হাটা পথ ধরে একে বেকে এগিয়ে গিয়ে সামনে রেল লাইন। লাইনের পাশের পথ ধরে পশ্চিম দিকে মাইল ছয় সাত হেঁটে সামনে ঘুটিয়ারি শরিফ রেল স্টেশন। এ সেই পথ যে পথ ধরে আমার বাবা ঝুড়ি কোদাল কাঁধে নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে রোজ রাত এক প্রহর বাকি থাকতে হেঁটে যেতেন। সেই ধুলো পথে আজ আমি হেঁটে যাচ্ছি ভাগ্যসন্ধান করতে। মনটা এখন বড় কাঁদছে। মা বাবা ভাই বোন সব পড়ে রইল, পড়ে রইল আমার বুড়ি দিদিমা। তাদের দেখার মত কেউ নেই। কী হবে তাদের তা কে জানে! কিন্তু না চলে গিয়ে আমার যে আর কোন পথ নেই। এখানে পড়ে থাকলে সব এক সাথে না খেয়ে মরে যাব।
মহাভারতে একটা গল্প আছে, দুর্যোধন আর দুঃশাসন তার মামা শকুনি এবং তার আরও নিরানব্বই ভাই সবাইকে মাটির তলে এক অন্ধকার ঘরে বন্দী করে রেখেছিল। দুর্যোধনের ভয়। ছিল, শকুনিরাও একশো ভাই। শক্তি সক্ষমতায় সংখ্যায় কৌরবদের সমান সমান। যদি তারা কোনদিন ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে তখন কী হবে। তাই দুর্যোধন চেয়েছিল সবাইকে মেরে ফেলবে। বাঁচিয়ে রাখবে মাত্র একজনকে। যে দুর্যোধনের বৈভব দেখবে আর ঈর্ষায় জ্বলবে। সেই বদ উদ্দেশ্যে দুর্যোধন বন্দী একশো মামার মধ্যে মাত্র একজনার খাবার দেবার নির্দেশ দিয়েছিল। খাবার নিয়ে মারামারি করে নিরানব্বই জন মরে গেলে শেষ পর্যন্ত যে একজন বেঁচে থাকবে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে।
