***
এক একটা মানুষ আছে যার মুখটা দেখলেই মনটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে আসে। ভালোবাসতে ইচ্ছা করে। এ আপনার আমার সবারই করে। আবার এমন এক একটা মানুষ আছে যাকে দেখলে মনটা বিরূপ হয়ে ওঠে। মুখে ঘুসি মারতে সাধ যায়। কোন অপরাধ করেনি। তবুও।
কে জানে ওয়ার্ডেন লোকটার কাছে আমি হয়তো ওই শেষ দলেরই একজন। সে প্রতিজ্ঞা করে বসে আছে আমাকে চূর্ণ করে ফেলার। আজ সে হাজিরা দিতে আসার সময় ভ্যানে করে নিয়ে এসেছে দুটো বড় বড় ড্রাম। তাদের প্রমোটারি ব্যবসা আছে। এটা এই সময়ে সব সিপিএম নেতাদের প্রিয় ব্যবসা। ধমকে চমকে মালিকের কাছ থেকে জমিটা কেড়ে নিয়ে যা কিছু একটু দাম দিয়ে সেই জমিতে গড়ে তোলে বহুতল বিল্ডিং। তারপর বহুমুল্যে বিক্রয়। দশলাখ পুঁজি লাগিয়ে পঞ্চাশ লাখ মুনাফা।
সেই রকম কোনো বিল্ডিং নির্মাণে ড্রাম দুটোকে ব্যবহার করা হয়েছিল। একটার বাইরে ভিতরে শক্ত হয়ে জমে আছে সিমেন্টের চাদর আর একটায় চুনের প্রলেপ মোটা করে লেপটানো।
গেটের সামনে সে দুটোকে নামিয়ে ছাদের দিকে মুখ করে আমার নাম ধরে চিৎকার করে, শিগগির নীচে আসুন। যদি যম ডাকে তাকে যদি বা বলা চলে। একটু পরে যাব, সে হয়তো মানবে, ওয়ার্ডেন মানবে না। ভাত গলে যাবে। গলে যাক। ডাল উথলে উঠবে উঠুক। তবু তার হুকুম না মেনে উপায় নেই। এরই নাম ক্ষমতা। দৌড়ে নীচে নামলাম। ড্রাম দুটো দেখিয়ে বলে সে–এগুলো ছাদে নিয়ে যান।
এ দিয়ে কী হবে?
আগে নিয়ে যান। গিয়ে চা বসান, পরে বলছি।
কিছুক্ষণ পরে সে এক বোতল অ্যাসিড, সাবানগুড়ো, নারকেল ছোবড়া নিয়ে ছাদে আসে। বলে–ড্রাম দুটোকে এইসব দিয়ে ঘসে একেবারে চকচকে করতে হবে। এতে বাচ্চাদের খাবার জল ধরে রাখতে হবে।
ছাদে পাইপ লাইন আছে। কর্পোরেশনের জল আসে। সেই জলে রান্না করতাম। দিন দুয়েক আগে আদেশ দিয়ে গেছে–চলবে না, রান্নার জল টিউবওয়েল থেকে বালতি ভরে নীচে থেকে নিয়ে আসতে হবে। আমি আসার আগে গুঁড়ো মশলায় রান্না হতো। এক আদেশে সেটাও বন্ধ হয়েছে। ওতে ভেজাল থাকে বাচ্চাদের শরীর খারাপ হবে। শিল নোড়া এনে দিয়েছে। এখন আমি বাটা মশলায় স্বাদুতরকারি রাঁধি। বাচ্চা গোনা ছাড়াও আর একটা দায়িত্ব উনি পালন করেন–দুবেলা ভাত ডাল তরকারি চাখা। যদি কোনো খুঁত পান আমাকে ধুনে দেন। একদিন ভাতে কাকর পেয়ে গজরালেন—সারা দুপুর কী করেন। শুয়ে শুয়ে তো ফুলে যাবেন। একটু নড়ুন চড়ুন। চালটা দুপুরে একটু বেছে নিন। বাচ্চাদের দাঁত ভেঙে গেলে তখন কী হবে?
এত করছেন তবুও আত্মা শান্ত হচ্ছে না। কিছুতেই তৃপ্ত হচ্ছে না। কী করে যে হবে বুঝেও উঠতে পারছেন না। আজ অনেক খুঁজে ড্রাম দুটো পেয়ে গেছেন। বাচ্চাদের জল খাবার জন্য বাড়ি থেকে বয়ে দুদুটো ড্রাম এনে দিয়েছেন। এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে থাকবে। আর আমাকেও একটু ঝরানো গেল। এই তার প্ল্যান।
সে কী ময়লা ড্রাম। সহজে কী পরিস্কার হয়। আগে তাকে অ্যাসিড দিয়ে ঘষি তারপর সাবান বালি দিয়ে রগড়াই। রোজ দুপুরের দুঘন্টা যায় এর পিছনে। পাঁচ ছয় দিন পরে বলে ড্রাম–ওরে এবার আমাকে রেহাই দে রে। আর পারি না। এক পরত ছাল যে উঠে গেল। তবে তাকে আমি ছাড়ি, আমাকে ছাড়ে ওয়ার্ডেন।
***
আজ মাদার কিলারের সাথে আমার এক চোট তুমুল ঝগড়া হয়ে গেল। সেই প্রথম যেদিন এখানে আসি সেদিনের সেই নোংরা কাপে চা খেতে দেবার স্মৃতি মনে বড় দগদগে হয়ে রয়ে গিয়েছিল। যা কিছুতেই ভুলতে পারি না। মনে পড়ে যায় আমার জাত নিয়ে করা একটা কটু মন্তব্য। সেই যে লিখেছিলাম যে মানুষ আর একজন মানুষের কাছে কুকুরের চেয়েও ঘৃণ্য জীব বলে বিবেচিত হয়, সে তাকে ভালোবাসবে সম্মান করবে-এ হয় না। হতে পারে না। সেই লেখার প্রেরণার কেন্দ্রে তো এরাই রয়েছে। তাই এদের আমি সম্মান করতে ভালোবাসতে পারি না।
একজন দয়ালু লোক বোবা বাচ্চাদের জন্য ছয় লিটার দুধ পাঠায় প্রত্যেক দিন। কিছু গরিব বাচ্চা আছে অপুষ্টি আক্রান্ত। তাদের দুধে ভাগ বসায় মাদার…..। যতটা তার ইচ্ছা ঢেলে নিয়ে গিয়ে দুই পাতে, পায়েস রাঁধে। সেই সব পদার্থ কিছুটা নিজে খায় কিছুটা ওয়ার্ডেন, সুপার, স্পোর্টস টিচারকে খেতে দেয়। কিছুটা বিলি বন্টন করে তার পছন্দের দু একজনকে।
মানুষের সব কিছুর একটা সীমা আছে, সীমা নেই শুধু লোভের লালসার। যতদিন যেতে থাকে একটু একটু করে দুধ নেবার পরিমাণ বেড়ে চলে তার। কারণ, তার কিছু প্রিয়পাত্রের সংখ্যা বেড়ে গেছে। শেষে দুধ আর দুধ থাকে না–জল হয়ে যায় জল ঢালতে ঢালতে। এক কাপ করে দিতে হলে চল্লিশটা বাচ্চার কত দুধ লাগে। সেই পাতলা দুধের কারণে বাচ্চাগুলোর আমার উপর ক্ষোভ জমতে থাকে। তারা তো দেখে না দুধ যাচ্ছে কোথায়!
এক অচ্ছুত রান্না করে। সেই ভাত বাটিতে তুলে খানিকটা জলে ঢেলে ফুটিয়ে জলটা ঝেড়ে নেন। ভাত শুদ্ধ হয়ে যায়। তরকারি ফোঁটান তবে জল ঝাড়েন না। তরকারিতে বিশেষ দোষ হয় না। রামকৃষ্ণ গিরিশ ঘোষের বাড়িতে ভাত খাননি জাত মরার ভয়ে, লুচিমন্ডা খেয়েছিলেন।
ওনার এইসব কর্ম চলে সকালের পর্বে বেলা নটা নাগাদ। তখনই দুধটা নিয়ে যান। বাচ্চারা আসে তারপরে। তাই দেখতে পায় না।
