কী আর করবে। দরজা খুলে অতিথিকে ঘরে বসিয়ে একটা গামছা নিয়ে বের হয় গ্রাম পরিক্রমায়। এই রকম এক বিপন্ন দিনে পিছন দরজা দিয়ে ঘটি হাতে একদিন বের হয়ে গিয়েছিলেন বিপিন ব্যাপারী। ঘটিটা বন্ধক দিয়ে চাল এনে মান রক্ষা করে ছিলেন। আমি এখন কি বন্ধক দেব! আমার যে–বন্ধক দেবার মত কিছুই নেই।
তখন গ্রামের সব মানুষের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে। অধিকাংশ মানুষ দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে। বাকিরা শোবার তোড়াজোর করছে। গ্রামের একদিক থেকে অন্যদিক পর্যন্ত যত ঘরের দরজা খোলা পেলাম সব ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম–কিছুটা চাল ধার দাও ভাই। ঘরে হঠাৎ অতিথি এসে গেল তো, তাই। ভেবেছিলাম কালকে হাটে গিয়ে কিনব। কে জানে যে এমন অসময়ে অতিথি এসে যাবে!
নেই। আমাদের দেবার মত চাল কারও ঘরেই নেই। কী করে থাকবে আর কেন থাকবে? যারা যারা ধার দিতে সক্ষম ইতিপূর্বে তাদের প্রায় সবার কাছ থেকে এক কিলো দুকিলো করে যে নেওয়া হয়ে গেছে। সে ধার কবে শোধ হবে তা কে জানে। তার উপর আবার নতুন ধার? না বাবা মাফ করো। যখন হতাশ আর নিরাশ হয়ে ফিরে আসছি তখন গ্রামের একমাত্র মুদি দোকানের মালিক জগদীশ আমাকে ডাকল। জানতে চায় সে, কী ব্যাপার! এত রাতে হন্তদন্ত হয়ে কোথায় ছুটে বেড়াচ্ছে? তখন তাকে বলি আমার ছুটে বেড়াবার কারণ। জগদীশের কাছে আমার আগেরই দুশো টাকার মত বাকি পড়ে আছে, তা সত্ত্বেও এখন দু-কিলো চাল আড়াই শো ডাল আধ কিলো আলু দিল। এই কিন্তু শেষ, বাকি শোধ না দিলে আমি কিন্তু আর দেব না। বলে দিল সে। সেই চালে ভাত রান্না হলে যোগেনদা খেলেন খেলাম আমরাও। খাওয়া দাওয়ার পর বলেন তিনি–বড় ভালো খেলাম। গত এক দেড় মাসে কোন তরকারি খেতে পাইনি। আলুর তরকারিটা অনু বেধেছেও দারুণ।
যোগেন দা! যার দুই কাঁধে দুটো সাইড ব্যাগ। একটা ব্যাগে আছে তার এক সেট জামা কাপড়, চশমা পেন ডায়েরি, কটা বই। অন্য ব্যাগে এখন কমপক্ষে পনের কুড়ি হাজার টাকা। সে টাকা তিনি খরচ করতে পারেন স্বাধীনভাবে। কেউ তার কাছে কোন হিসাব চাইবে না। সে সামান্য চারটাকা কিলোদরের আলু কিনে খেতে পারল না গত এক দেড় মাসে? কেন সে শুধু ডাল আর ভাত যা রান্না হয় দল্লীর মেসে তাই খেয়ে রয়েছে। রয়েছে, কারণ, ব্যাগের ওই টাকা তার বন্ধুরা তাকে দিয়েছে দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য। সে টাকা যোগীনদা কেমন ভাবে নিজের জন্য খরচ করে?
এইসব দিনে যোগেনদা আর আমি দুজনে যেমন দুজনের জীবন কথা জেনেছিলাম, পেয়েছিলাম দেশ আর দেশের মানুষের বিষয়ে নিজস্ব ভাবনা চিন্তার কথাও। এরপর তিনি যখন ছত্তিশগড় বাস সমাপ্ত করে ফিরে আসেন, দিল্লি চলে যাবার আগে কিছুদিন কলকাতায় থেকে গিয়েছিলেন। তখন কলকাতায় তার যত বন্ধু সবাইকে বলেছিলেন আমার কথা। ফলে কলকাতার সেই সব মানুষ যারা শংকর গুহ নিয়োগীর আন্দোলন বিষয়ে খোঁজ খবর রাখেন তারা আমার কথাও জানতেন। কুশল দেবনাথ নামে এক জন ছত্তিশগড় ঘুরে এসে আনন্দবাজার পত্রিকায় যে প্রতিবেদন লেখেন তাতে শেষ চার ছয় লাইনে আমার কথাও থাকে। এই সব কারণে কলকাতায় না এলেও আমি অশোকজি এবং অন্যান্যদের কাছে অপরিচিত ছিলাম না।
অশোকজির কাছ থেকে অলকাজি যখন আমার কথা শোনেন তখন তিনি তার দ্বিতীয় উপন্যাস লেখার কাজে হাত দিয়েছেন। তখন তার মনে হয় এই উপন্যাসের একটা চরিত্রের নাম মনোরঞ্জন ব্যাপারী রাখবেন। আর তাই আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে একটি চরিত্রের সৃজন করেন আমারই নামে।
আমার এই নামটি–আমার বড় প্রিয়। এ নাম আর কারও নয়–আমার। একা আমার। টেলিফোন ডাইরেক্টরি, ভোটার লিস্ট, রেশন দোকানের খাতা, পত্রপত্রিকার বিজ্ঞাপনের পাতা, বইমেলায় প্রকাশিত গিল্ডের পুস্তক তালিকা সম্বলিত ইয়া মোটা বই, সব আমি তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। মনোরঞ্জন নামে অনেক আছে, কিন্তু মনোরঞ্জন ব্যাপারী নামে একজনও নেই। এই মহাবিশ্বে আমি এক এবং একক। এটা আমার গর্ব এটাই আমার অহংকার। আমার ভালো আমার কালো আমার আলো সবটা মিলিয়ে এক অখন্ড আমি। আমার কোন্ দুসরা নেই, বিকল্প নেই, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিরূপ নেই। অলকা দিদি কলমের এক আঁচড়ে আমারই প্রতিচ্ছায়াকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন আমারই প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে।
অলকা দিদির সাথে দেখা করে একখানা শেষ কাদম্বরী’ চেয়ে নিয়ে পাঠ করার পর এমনই মনে হয়েছিল আমার। বড় অদ্ভুত মানুষ এই অলকা সারাওগী। বিশাল বিত্তবান পরিবারের কন্যা এবং বঁধু কিন্তু তার মনে অর্থের কোন উত্তাপ–খ্যাতির কোন অহমিকার প্রকাশ ছিল না। নিজের হাতে চা বানিয়ে আমাকে দিতেন। আমি এক ‘অচ্ছুত অস্পৃশ্য’ জেনেও আমার এঁটো কাপ তুলে নিয়ে যেতে দ্বিধা করতেন না। যখনই সময় পেতাম তার সঙ্গে দেখা করে আসতাম। তখন একদিন বলেছিলাম তাকে দিদি, এ আপনি কোন মনোরঞ্জন ব্যাপারীকে নির্মাণ করলেন। মনোরঞ্জন ব্যাপারী যার নাম হয়, সে এত নরম এত নিভুনিভু কী করে হতে পারে। সে তো হবে কঠিন কঠোর রূঢ় রুক্ষ নির্মম।
আমার অন্য কী কী দোষ আছে তা আমার অজানা। তবে একটা দোষ আছে, আমি মহা বাঁচাল। একবার কথা শুরু করলে কোথায় গিয়ে থামতে হবে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। অলকা দিদির কাছে যেতে যেতে বকবক করতে করতে একদিন টের পেলাম আসল মনোরঞ্জন ব্যাপারীর সব কথা পেট থেকে বের হয়ে গেছে। আর অলকা দিদি তার তৃতীয় উপন্যাস ‘কোঈ বাত নেহি’তে একটি চরিত্র মনোরঞ্জন দত্ত ওরফে জীবন চন্ডাল-এর নির্মাণ করে সে সব কথা লিখে দিয়েছেন। যে সব কথা আমি এই কাহিনীতে লিখিনি, লিখতে সাহস পাইনি। মনোরঞ্জন ব্যাপারীর মনোরঞ্জন, মদন দত্তের দত্ত এই দুই অংশ জুড়ে ওই নাম। আর জীবন চন্ডাল আমার সেই সময় ‘বহুজন নায়ক’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হতে থাকা উপন্যাসের মুখ্য চরিত্রের নাম।
