দুটো বাচ্চা ঝগড়া করছিল। একজন বলছিল অপরজনকে–তোর ঠাকুরমা মারা গেলে শ্রাদ্ধে আমাকে নিমন্ত্রণ করিসনি। মনে রাখিস, আমার ঠাকুরমারও জ্বর হয়েছে। এদের দোলানো বেল্টের অহংকার দেখে বলতে ইচ্ছা করে–জ্বর আমার গায়েও আছে।
রোজই জেলে নতুন নতুন মানুষ আসে। একদিন তারাও পুরানো হয়। পুরাতনরা ছুটি পেয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই একদিন জেল থেকে বের হয়ে যায়। এর মধ্যে কেউ কেউ আবার নতুন করে ফিরে আসে নতুন করে জেল বাসের জন্য।
একদিন সকালে আমদানিফাইলের সামনে নতুন আসা আসামীর ভিড়ে ফাইলে বসা নাগেশ্বরকে দেখে চোখ আটকে গেল কাটা ভুরুর উপর। আমাকে দেখতে পেয়ে ফাইল থেকে উঠে এসে হাউ হাউ করে যা বলল সে, তার মর্মার্থ হচ্ছে সত্যিকারের জেল সাজা ও এই ছয় আট মাস জেলের বাইরে থেকে ভোগ করেছে। মুক্ত দুনিয়ায় অনেক কিছুই আছে সত্যি। কিন্তু যে জগতে, জীবনে কটা চোখের কটাক্ষ নেই, সে জগত, জীবন আর যার কাছেই হোক নাগেশ্বরের কাছে কিছুতেই মনোরম নয়। তাই আবার ঠেলা চুরি করেছে ও। তবে এবার আর তাকে খুঁজে ধরতে হয়নি, খুঁজে ধরা দিয়েছে। শরীরের কাটা ফাটা দাগের সংখ্যা সে কারণে দু একটা বাড়তি।
আমার কাছে ওর মাত্র একটাই কাতর আবেদন, যে ভাবে পারি হাসপাতাল চৌকায় যেন একটা কাজে লাগিয়ে দেবার ব্যবস্থা করি। যদি তা করি তবে যে দিন ‘ব্লাড ব্যাঙ্ক বসবে’ সেই দিনই সে আমাকে পাঁচ প্যাকেট চারমিনার দেবে।
অনেক বছর কেটে গেছে। চোখ বুজলে আজো সেই আকুল আর্তিমাখা দুটো ছলোছলো চোখ আমাকে কাতর করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ওদের কি হয়েছিল তা আমার জানা নেই। জানা নেই এই ইন্দ্রিয়াতীত প্রেমকে কোন নামে ডাকবো।
আমি জানি আজ কাল পরশু কোনো একদিন আবার যদি প্রেসিডেন্সি জেলে যাবার সুযোগ ঘটে, কোন এক চুম্বকীয় আকর্ষণ আমাকে টেনে নিয়ে যাবে ঘুলঘুলির সামনে। আমার চোখও সেই ঘুলঘুলি দিয়ে দুটো সজল কটা চোখকে খুঁজবে। যদি আজো তেমনি সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে কাউকে তাকিয়ে থাকতে দেখি নিঃসন্দেহে আমার চোখ জলে ডুবে যাবে। অন্তর মন প্লাবিত হয়ে যাবে লবণাক্ত বেদনায়।
এরই কদিন পরে দেবাশীষদার একবন্ধু যার নামও দেবাশীষ তারই পত্রিকা “আনোয়ান-এ” প্রকাশিত হয় আমার দ্বিতীয় গল্প ‘বধ্যভূমি থেকে ফিরে’।
যোগেনদার মাধ্যমে পরিচয় হয় সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একজন গল্পকার-গবেষক-প্রবন্ধকার–পুস্তক সমালোচকের সঙ্গে। সন্দীপদা আমাকে দিয়ে রবিশষ্য পত্রিকার জন্য লিখিয়ে নেন আমার বাল্যকালের স্মৃতি কথা। অভিশপ্ত অতীত-অন্ধকার ভবিষ্যৎ-শিরোনামাঙ্কিত সে লেখাটি পরে অনেক কটি পত্রিকায় পুনঃ প্রকাশ পায়। সে লেখার একটি বক্তব্য বহু বিদগ্ধ মানুষ প্রশংসা করে উদ্ধৃতি হিসাবে তাঁদের রচনার সঙ্গে সংযোজন করেন। যা আমি লিখেছিলাম হিন্দু ও মুসলমান, উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের আন্তঃসম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে। লিখেছিলাম যে মানুষ আর একজন মানুষের কাছে কুকুরের চেয়েও ঘৃণ্যজীব বলে বিবেচিত হয়। সে তাকে ভালোবাসবে সম্মান করবে এ হয় না। হতে পারে না।
সে যাইহোক, একদিনি সি.ই.এস.সি. অফিসে গিয়ে অমরদার মুখে খবর পেলাম যে অলকা সারাওগী নাকি শেষ কাদম্বরী নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। দিল্লির রাজকমল প্রকাশন দ্বারা প্রকাশিত সেই পুস্তকে এমন একটি চরিত্র আছে যার নাম মনোরঞ্জন ব্যাপারী। শুনে আমার তো বিস্ময়ের আর সীমা পরিসীমা রইল না। অশোকৃজির বাড়ি আমি যাই, অলকাজিও আসেন। কিন্তু আমাদের দুজনার তো মুখোমুখি এখনও দেখাই হয়নি। তবে? কোথা থেকে পেলেন উনি এই নাম? পেয়েছেন অশোকজির কাজ থেকে।
যতদিন যোগেনদা দল্লীতে ছিলেন মাঝে মাঝে বস্তারে আমার ঠিকানায় চলে যেতেন। আর আমরা দুজনে সাইকেলে চেপে চলে যেতাম দূরের কোন আদিবাসী গ্রামে সংগঠনের কাজে। চার-পাঁচ-ছয় ঘন্টার সেই দীর্ঘ যাত্রায় আমি আমার বিগত জীবনের কথা বলতাম ওনাকে। উনি ওনার কথা বলতেন আমাকে। বলতেন উনি কমই, শুনতেন বেশি। মাস দুয়েক পরে দেখলাম আমার আর বলার মত কিছু অবশিষ্ট নেই। যতটুকু বলা যায় সব বলা হয়ে গেছে। যা পড়ে আছে বলা যায় না। লেখাও যায় না। লিখলে সেই আমার কথা আমার সামনে ফনা তুলে দাঁড়াতে পারে। আর বললে বিশেষ করে যোগেনদার মত মানুষের সামনে তা থেকে অহংকার আত্মপ্রচারের দুর্গন্ধ বের হতে পারে।
আমার এখনও সেই দিনটার কথা মনে আছে। যেদিনের কথা কিছুতেই ভোলা যাবে না। মনে আছে হয়ত যোগেনদারও। তখনও আমি কাপসীতে আসিনি, পি.ভি.৫৬ নাম্বারেই থাকি। সেদিন আমার বাসায় যোগেনদা পৌঁছেছেন রাত আট কি নটায়। শহর কলকাতার আটটানটানয়, জঙ্গলের আটটা নটা। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার সেই রাত আমাদের চারপাশে নেমেছে আরও কালো–ভয়াবহ হয়ে। সারাটা গ্রাম সে সময় নিঃঝুম হয়ে গেছে। কাপসী পাখানজুর বান্দে এই কটি টাউন এলাকা ছাড়া সারা অঞ্চলের এই নিয়ম। সন্ধ্যে হলেই রাতের খাওয়া খেয়ে শুয়ে পড়া। আর সূর্য ওঠার আগে শয্যা ছাড়া।
সেদিন আমাদের ঘরে কোন চাল ছিল না। যা সামান্য চাল তা দুপুরে রান্না হয়েছিল। যার কিছুটা খেয়ে বাকিটায় জল ঢেলে রেখেছিল অনু। সেটুকু বাচ্চা দুটোকে খাইয়ে রাতে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে স্বামী স্ত্রী আমরা উপোস করেছিলাম। সেই ভয়ানক দুর্গত সময়ে যোগেনদার আগমন। দল্লী থেকে বের হয়ে কোথায় কোথায় ঘুরে এখন এখানে পৌঁছেছেন। তিনিও ক্ষুধার্ত। অনাহারে আমরা মাঝে মাঝেই থাকি। সেটা কাক পক্ষিতেও টের পায় না। সে বড় অপমান আর লজ্জার। না খাওয়ার কষ্ট সহ্য করা যায় না তার উপর আবার পাড়া প্রতিবেশির বিদ্রূপ-হিতলোদেশ সহানুভূতির নাটক। তাই পেটে কিল মেরে চুপচাপ শুয়ে থাকি। সেদিনও শুয়েছিলাম। এমন সময় দরজায় অতিথি। আমার বাবা বলতেন–অতিথিনারায়ণ।যেদিন আমাদের বাসায় কিছু ভালোমন্দ রান্না হতো বাবা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন–যদি কেউ আসে। খাবার সময় দুঃখ করতেন–ব্যাডা আইজ এ্যাট্টা অতিথি আইলে না! সেই বাপের ছেলের দরজায় দাঁড়ানো অতিথি নারায়ণকে দেখে এখন বিস্মিত বিব্রত লজ্জিত এবং দুঃখিত। কী এখন করে সে?
