নাগেশ্বর আমার যুক্তিটা মেনে নিল। বুঝলো যে আমার হাতে অদূর ভবিষ্যতে আরো দু একজন ঘুশি টুসী খাবে। চাই কি আমিও কোনো দিন কারো ধাক্ জমানোর শিকার হয়ে যেতে পারি। তখনকার মত চুপ করে গেল সে।
ঠেলা চুরির কেস ছিল। বিনা বিচারে প্রায় দেড় বছর জেলে হয়ে গিয়েছিল ওর, সেই কারণে ভীষণ মুষড়ে পড়েছিল নাগেশ্বর। এবার কোর্টে গেলে আর বোধহয় জেলে ফেরত আসা যাবে না। কেস খালাস হয়ে ছাড়া পেয়ে যাবে। আগে দু’দুবার বেশি তবিয়ত খারাপ’ বলে যেতে হয়নি। এবার কোন অজুহাত দেখিয়ে কোর্টে যাবার হাত থেকে রেহাই পাবে! যত ওর কোর্টে যাবার দিন এগিয়ে আসছে প্রিয় বিচ্ছেদের গভীর যন্ত্রণা চোখে মুখে ফুটে উঠছে।
শেষে একদিন মরিয়া হয়ে আমার কাছে ছল ছল চোখে বললো “ভাইয়া মেরা একঠো কহা মানো। আমার এই লুঙ্গিটা এখনো নতুন আছে, কোর্টে যাবার দিন দিয়ে যাবো। শুধু একবার উঁকি মারতে দাও।
–”কেন রে! ওপারে কি?”
–”আমার একজন থাকে ফিমেল ওয়ার্ডে।”
–”কে থাকে তোর! কি কেস?”
–”মার্ডার।”
কয়েক দিন আগে হাসপাতালে রক্ত দিয়েছিল নাগেশ্বর। সেই টাকায় বিড়ি সিগারেট কিনেছিল। একটা সিগারেট আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। জেলে এর চেয়ে অমূল্য আর কিছু নেই। রক্ত বেচা পয়সার সিগারেট খেয়ে ওর প্রতি মনটা নরম হয়ে যায় আমার। আপন আপন স্বরে আলাপ চালাই আমি। আর তখনই এক ঘৃণ্য চোরের মনের তলদেশ থেকে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় এক অমলিন নিষ্পাপ আর্ত আত্মা। যে কিছুই পেতে চায় না। দিয়ে নিঃশেষ হতে চায়।
সারা দেশে দক্ষতা যোগ্যতা বিদ্যাবুদ্ধি সংখ্যায় মেধায় সব দিক দিয়ে মেয়েরা প্রায় পুরুষের সমান সমান। শুধু একটা মাত্র দিকে তাদের তেমন অগ্রগতি ঘটেনি, তা হল জেল যাত্রা। এদিক থেকে মেয়েরা পুরুষের অনেক পিছনে, অনেক নীচে। সে কারণে জেলে নারী অপরাধীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
প্রেসিডেন্সী থেকে এই কারণে কোর্টে যখন চল্লিশ কি ষাট জন পুরুষ আবাসিককে হাজিরা দেওয়াতে নিয়ে যেতে হয়, মেয়ে বা মহিলা যায় দুই তিন বা পাঁচ। পাঁচ জনের জন্য আলাদা গাড়ি আলাদা ড্রাইভার আলাদা সেন্ট্রী দেওয়া খুবই ঝামেলার কাজ। তাই জেল কর্তৃপক্ষ ওই ষাট জনের মধ্যে এই পাঁচজনকেও গুঁজে দেয়। এটা তাদের অভিজ্ঞতায় বলে যে কাক কাকের মাংস খেতে চায় না। সবাই তো চোর ডাকাত খুনী, সব এক কাকের জাত।
এইরকম এক কোর্টে যাবার পথে নাগেশ্বরের চোখে পড়েছিল এক ‘বিল্লী আঁখ’ তরুণীর ভয় কাতর কোমল মুখের দিকে। তরুণীরও ভালো লেগেছিল বোধ হয় নাগেশ্বর ভুরুর উপরকার অগভীর কাটা দাগটাকে। তাই দুজন দুজনকে সুযোগ পেলেই এক ঝলক দেখে নিচ্ছিল। কথা বলা এখানে অপরাধ তাই মুখ ছিল মৌন। কিন্তু মন কিছু কিছু নিশ্চয় বলেছিল। সেই না বলা কথা দুজন দুজনার চোখের ভাষায় পড়ে নিতে পেরেছিল। এইরকম বার কয়েক আসা যাওয়ায় ওই অব্যক্ত ভাষা পেয়ে গিয়েছিল এক গভীর বিশ্বাসের অটুট বনিয়াদ।
সবটা জানে না নাগেশ্বর। তবে এইটুকু জানে যে মেয়েটা মার্ডার কেসে জেলে এসেছে। আর মাত্র দুমাস আগে তার লাইফার’ হয়ে গেছে। আর হয়তো এ জীবনে দেখা হবে না।
বলেছিলাম আমি কেন দেখা হবে না! তুই বের হয়ে গেলে ওকে ইন্টারভিউ করবি।
হতাশা ঝরে পড়ে নাগেশ্বরের গলায়–”ওর নাম, বাবার নাম, ঠিকানা কিছুই তো জানি না।” আর তারপর আমার হাত দুটো চেপে ধরেছিল–“আজ শেষ বারের মতো ওকে একটু দেখে নিতে দাও। ও নিশ্চয়ই এই ঘুলঘুলির দিকে তাকিয়ে বসে আছে।”
নাগেশ্বর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে চলে যাবার বেশ কয়েক দিন পরে ঘরের এক ধোঁয়া ধোঁয়া অন্ধকারে উনুনের কাছে টেবিলটা টেনে এনেছিলাম আমি। তারপর সেই ঘুলঘুলি দিয়ে চোখ ছুঁড়ে ছিলাম দূরে! সামনে ছোট্ট একটা সবুজ মাঠ, মাঠের মাঝখানে দুজন মহিলা সেপাই। তার ওপাশে কল বল করে মটর সেদ্ধ খাওয়া এক দল নানা বয়সের মেয়ে। আর মটরের বাটি থেকে একটা একটা করে মটর ধীরে ধীরে পাখিদের সামনে ছুঁড়তে থাকা সেই বিড়াল চোখ মেয়ে। চোখে কিছু দেখতে চাওয়ার তীব্র তৃষ্ণা। বারবার সে দৃষ্টি এসে আছড়ে পড়ছে ধোঁয়া বের হওয়া ছোট্ট ঘুলঘুলিটার উপর।
আমার দিকে তাকিয়ে মনে হল যেন তার দুচোখে একটা আলোর ঝিলিক খেলে গেল। তারপর নেমে এল চরম বিস্ময়। সেই দুটো বড় বড় চোখ কি যেন খুঁজতে চাইলো আমার ভুরুর উপর। কাটা দাগ কিনা বলতে পারবো না। নেই। যার ভুরুর উপর কাটা দাগ, সে নেই।
জেলখানায় আমার দিনগুলো খুব দ্রুত কেটে যায়। কাটতে চায় না তাদের যারা কষ্টে দুঃখে থাকে। আমি কষ্টে থাকি না। দুঃখ বলে কি পদার্থ আমার তা জানা নেই। ফলে সুখে থাকি। সুখের দিন দ্রুত ফুরায়–প্রবাদ বচন।
প্রায় আট-নয় মাস কোথা দিয়ে কিভাবে যে কেটে গেল টেরই পাইনি। মাঝে মাঝে ওই কোর্টে যেতে হয় নতুবা দিন চর্চায় কোনো নতুনত্ব নেই। সকালের গুনতি দিয়ে দিনের শুভারম্ভ, রাতে মাংসের ঝোল খেয়ে শুয়ে পড়া, স্বপ্নের ঘোরে তলিয়ে যাওয়া। একদিন, আজ না হয় কাল–জেলের মেট হবো আমি। আমার কোমরেও সাদা প্যান্টের উপর কালো চওড়া পিতলের চাকতিঅলা বেল্ট থাকবে। বেল্ট, ক্ষমতা আর সিনিয়রিটির প্রতীক। মেটেরা আমাদের চোখ টাটাবে বলে মালার মত বেল্টটা গলায় ঝুলিয়ে রাখে। হবে হবে। ভাগ্যে থাকলে আমারও একদিন হবে।
