বলে সে–কাল থেকে তোর টি. বি. হয়ে যাক।
স্পেশাল জেলে দুতিন জন টি.বি. রুগী দেখেছিলাম দিন কয়েকের জন্য, পরে তাদের অন্যত্র চালান করে দেওয়া হয়। সবাই বলে স্পেশাল জেল ‘কচড়া’ জেল। খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো মেলে না। সেই না মেলা খাওয়া টি.বি. রোগীদের যতটুকু মেলে দেখলে হিংসা হয়। সকালে আধ লিটার দুধ, দশ গ্রাম মাখন, দশ গ্রাম চিনি, দুটো ডিম, চা পাতা আর খান কয়েক বিস্কুট। একটু বেলা বাড়লে কলা-কমলা-আপেল। ভাত ডাল তরকারিও সব স্পেশাল। মাছ মাংসের দিনে শুধু গন্ধই নয় ঝোলের মধ্যে পরিমাণে বেশ অনেকটাই আমিষ পদার্থ থাকে।
পিটারের হাঁফানির টান ছিল। ও বড়ো আক্ষেপ করে ইশামসি বলেছিল রোগটা বদলে টি.বি. করে দিতে।
টি.বি. রোগ যদি হয় তাহলে খুব একটা মন্দ হয় না। প্রেসিডেন্সির সব ব্যবস্থাই উত্তম। কিন্তু তত ভাগ্য কি আমার আছে। টি.বি. না খাওয়া আর বেশি খায় লোকের রোগ। আমাদের মত মাঝারিদের জন্য এ ‘রাজরোগ’ নয়।
আমার মনোদশা বুঝতে পেরে রামু বলে–সত্যি সত্যি হতে হবে তার কি মানে আছে। ‘ঢবের’ হোক। ব্যাপারটা খোলতাই করে বাতলে দেয় রামরতন ওরফে রামু। আমি হচ্ছি দুনাম্বার টি.বি. ওয়ার্ডের ফালতু’। ওয়ার্ডে বিশ পঁচিশ জন পেসেন্ট আছে। তাদের জন্য একজন রান্নার ফালতু’ দরকার। ডাক্তারের সাথে আমি কথা বলে রাখবো। তুই কাল দড়ি হাজতের মেটকে বলবি–তোর টি.বি. আছে। ট্রিটমেন্টের জন্য ডাক্তারের কাছে যাবি। ও তোকে নিয়ে যাবে। ব্যাস আমি ক্যাচ করে নেব। মজায় থাকবি।
ছক নির্ভুল ছিল। কাজেই টি.বি. ওয়ার্ডে এসে যেতে আমার কোনো অসুবিধা হল না। রামু রান্না-বান্নার আইটমগুলো বুঝিয়ে দিল। ইচ্ছা থাকলেও তা এখানে বলা যাবে না। খুন খারাপি। বেড়ে যেতে পারে। শহর কলকাতার ফুটপাত, বস্তি, রেলস্টেশনে রোজই বিনা চিকিৎসায় বহু রুগী মারা যাচ্ছে। যাক্, সেটা তো আর খুন নয়। আমার লেখা পড়ে খাদ্য খাদক চিকিৎসার লোভে কোনো টি.বি. রুগী কারো পেটে কানিয়া ঠেসে দিয়ে অন্দর যাবার কামনা যদি করে বসে কে তার দায়িত্ব নেবে? তাই মুখে কুলুপ।
হাসপাতালের বাউন্ডারির পূর্ব দিকে রান্না ঘর। যার ওপরে ফিমেল ওয়ার্ড। উঁচু দেওয়ালের কারণে তাদের সাথে আমাদের চোখাচুখি হবার কোনো উপায় নেই। তবে কান সজাগ রাখলে কিচির মিচির শোনা যাবে। সন্ধের পরে সেটা বেশ স্পষ্ট হয়। তখন গুন গুন গানের দু-চার কলিও ভেসে আসে। আর হ্যাঁ, ঝগড়াও। মাঝে মাঝেই কাঁচা খিস্তির বন্যা বয়ে যায়।
রান্না ঘরে পর পর চারটে উনুন। প্রতি ওয়ার্ডের রান্না আলাদা, রাধুনি আলাদা। মুরগী, পাঁঠা, তেল, মাখন যে গুদাম থেকে পাওয়া যায়, উনুন জ্বালাবার কাঁচা কয়লাও সেখান থেকে মেলে। এ কয়লার আগুন আর ধোঁয়া প্রায় সমান সমান।
উনুন জ্বেলে দেবার পর ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায় বলে আমরা সবাই ঘর থেকে বাইরে এসে ধোঁয়া কম হবার জন্য অপেক্ষা করি। তা না করে তো উপায়ও নেই। চোখে তো কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু ব্যতিক্রম কেবল দু নাম্বার চৌকার নাগেশ্বরের বেলায় ঘটে। ও বাইরে আসে না। ধোঁয়ায় অন্ধকার ঘরে বসে কি যে করে কিছু বোঝাও যায় না। রান্না-বান্নার পরে হলে আন্দাজ করা যেত যে মাংস টাংস কিছু একটা সানটিং দিচ্ছে। কিন্তু উনুন জ্বলে সকালে, সব রান্নার আগে।
চার নাম্বার চৌকার মেহবুব মোল্লাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম–কি ব্যাপার চাচা? বিরক্তিতে ঘড় ঘড় করে বাজে সে “ছোড় দে উসকো বাত। বহুত সামঝায়া। মানতাহি নেহী। কভী কৌঈ সেপাই দেখ লেগা, গাড়মে দো লাথ পড়েগা তব সামঝেগা।”
এর বেশি সে তখন আর বিশেষ কিছু বলতে চাইল না। কিন্তু কৌতূহল আমাকে বাধ্য করলো নাগেশ্বরের উপর নজর রাখতে। কি এমন অপরাধ করে চলেছে ও যা সেপাইয়ের লাথি খাবার যোগ্য। দেখলাম পরের দিন সকালে একটা অব্যবহৃত কাঠের উঁচু টেবিল টেনে এনে দাঁড় করিয়েছে। উনুনের পাশে আর তার উপরে দাঁড়িয়ে নাগেশ্বর ধোঁয়া বের হবার ছোট্ট ঘুলঘুলি দিয়ে নির্ণিমেশ তাকিয়ে আছে ফিমেল ওয়ার্ডের দিকে। হা জেল কোডে এটা লাথ খাবার উপযুক্তই বটে।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে, কামাতুর পুরুষের কদর্য দৃষ্টি থেকে, ধর্মীয় বিধিনিষেধ বেড়া জাল থেকে বেশ কিছুটা দুরে, দেওয়াল ঘেরা হাজার বারোশো মেয়ে মহিলার যে নিজস্ব জগৎ, স্বাভাবিক কারণেই তা অনেক নির্ভয় স্বাধীন এবং খোলা মেলা। শালা মনে হয় উঁকি দিয়ে সেই সব দেখছে।
এই জেলে আমি নতুন এসেছি। দু চারজনকে যতক্ষণ না পেটাতে পারছি ধাক্ জমবে না। সুযোগ যখন পাওয়াই গেছে আর ছাড়া কেন! আর তাই টেবিল থেকে নামিয়ে লোকজনে দেখতে পায় এমন জায়গায় এনে নাগেশ্বরের বুক বরাবর মাঝারি মাপের একটা পাঞ্চ করে দিলুম, সাথে ডায়ালগ–“সালে তেরা একেলেকে লিয়ে ক্যা পুরা জেলকো পিটবায়ে গা।”
হ্যাঁ জেলের এই নিয়ম। তবে সব সময় নয়। কখনো কখনো। ধরা যাক কেউ এক জন জেল থেকে পালিয়ে গেছে। সেই অপরাধে যারা পালায়নি সবাই মার খাবে। না-পালানো লোকদেরও উচিত ছিল পালানো আর না হয় পলাতককে পালাতে না দেওয়া। দুটোর কোনোটাই যখন সুচারু রূপে করতে পারেনি তখন কিছু শাস্তি তো পেতেই হবে।
