একদিন যোগেনদা আমাকে নিয়ে গেলেন লর্ডসিনহা রোডে। এখানে একজন সারস্বত সাধক থাকেন, যার নাম অশোক সাক্সোরিয়া। ইনি ভারতীয় ভাষা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত সীতারাম সাক্সোরিয়ার পুত্র। মাড়োয়ারি সম্প্রদায় সম্বন্ধে প্রায়শই একটা অভিযোগ ওঠে যে এই সমাজের মানুষ টাকা গোনা, টাকার কথা বলা, টাকার স্বপ্ন দেখা, টাকার গন্ধ শোকা এছাড়া পৃথিবীর আর অন্যকোন বিষয়ে আগ্রহী নয়। সেই প্রচলিত ধারণা ভেঙে এই শহরে যে কয়জন মানুষ এগিয়ে এসেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম এই অশোকজি। যদিও নিজে উনি খুবই কম লিখে থাকেন তবে মানুষকে দিয়ে লেখাবার প্রয়াশ তার খুব বেশি। এই শহরে এমন একজনও নেই যিনি হিন্দিতে লেখেন অথচ অশোকজির কাছ থেকে প্রেরণা পরামর্শ নেননি। অশোকজির অনুপ্রেরণায় মাড়োয়ারি তনয়া অলকা সারাওগী অনুপ্রবেশ করেছিলেন সাহিত্য অঙ্গনে।যিনি তার প্রথম উপন্যাস ‘কলিকথা ভায়া বাইপাশ’ লেখার জন্য সম্মানিত হয়েছেন সাহিত্য এ্যাকাডেমি পুরস্কারে।
যোগেনদার সাথে অশোকজির বাড়ি গিয়ে আমি ভীষণ অবাক। মনেই হল না যে এ বাড়িতে আমি আগে কখনও আসিনি। যেন ওই অকৃতদার বৃদ্ধ ঋষি, সাহিত্য রসিক আমার বহু বছরের চেনা।
কলকাতা শহরের মাড়োয়ারি সমাজের মধ্যমণি বিশাল বিত্তবান সীতারাম সাক্সেরিয়ার পুত্র অশোকজির ধনদৌলতের প্রতি কোন উৎসুকতা নেই। উনি ভালোবাসেন পুস্তক পরিবৃত হয়ে থাকতে, পুস্তক প্রেমী মানুষ দ্বারা ঘর ভরিয়ে রাখতে। যে কারণে বিশাল বিশাল সব ব্যবসাপাতি থেকে নিজেকে সরিয়ে লর্ড সিনহা রোডের প্রাসাদোপম বাড়ির এক নিরিবিলি কক্ষে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন তিনি। যেমন ভাবে যোগী ঋষিরা আশ্রয় নেয় কোন নিভৃত পাহাড় গুহায়। পারিবারিক সম্পত্তি থেকে উনি মাসে তিরিশ হাজার টাকা মাত্র নিয়ে থাকেন নিজের খরচ খরচার জন্যে।
সেদিন অশোকজি সশরীরে আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হলেন।
তো আপ হি হ্যায় মনোরঞ্জন ব্যাপারী? অশোকজির চোখে মুখে সকালবেলার রোদ্দুর।
জি হ্যাঁ, আমিই মনোরঞ্জন।
যে কখনও ক্লান্ত হয় না? হেরে যেতে জানে না!
কে বলেছে!
আমি বলছি।
ভুল। বিলকুল গলদ। হারতে হারতেই আমি আজ এইখানে পৌঁছেছি। পরাজয় ছাড়া আমার জীবনে আর কিছু নেই।
আপনা আপনা নজরিয়া, বলেন তিনি। প্রত্যেকটা মানুষের দেখবার একটা নিজস্ব দৃষ্টিকোণ আছে। একটা গেলাসে আধ গেলাস জল। কেউ বলবে অর্ধেক খালি, কেউ বলবে অর্ধেক ভরা। আপনি যে জীবন যাপন করছেন, অবশ্যই বলতে পারেন, হেরে গেছেন। তবে আমি বলব একটা জীবনের সময় সীমার মধ্যে দশটা জীবন যে যাপন করেছে সে সবচেয়ে বড় বিজয় প্রাপ্ত করেছে। হার কিসে হয় জানেন? যে নিজের মনের কাছে হেরে যায়। যে মনের কাছে হারে না সে পৃথিবীর কোন শক্তির কাছে হার মানে না। আমি তো বলব আপনার জীবন হার না মানা জীবন। এটা একটা উপন্যাসের জীবন। এই জীবন নিয়ে বই লেখা দরকার।
আমরা চলে আসার পর তিনি তার মানসকন্যা অলকা সারাওগীকে বলেন–আমার জীবন বৃত্তান্ত, এই জীবন উপন্যাসের জীবন। তুমি জীবন লেখ। হার না মানা জীবন।
ওই দিনই যোগেনদার মাধ্যমে পরিচয় হল সি.এস.সিতে কর্মরত কয়েকজন মানুষের সাথে। এই লোক কয়জন কোন ভালো কবি ভালো লেখক ভালো নেতা ভালো বক্তা কিছুই নয়। স্রেফ ভালো মানুষ। যা বর্তমান সময়ে এই দেশে সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। কৃত্রিমতা বর্জিত খোলা মনের এমন দরদি উপকারী মানুষদের টানে যখনই আমার মন খারাপ লাগত দুপুর বেলায় ধর্মতলার সি.এস.সি. অফিসে ছুটে চলে যেতাম। কাজল দা, অমর দা, দেবাশীষদার সাহচর্যে খারাপ মন ভালো হয়ে যেত।
কাজলদার এক ভাইয়ের নাম শেখর। শেখরদা একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকাটির নাম পদক্ষেপ। কলকাতায় আসবার পর আমার দ্বিতীয় দফায় সাহিত্য যাত্রা শুরু হল পদক্ষেপের মাধ্যমে। জেল জীবনের ছোট একটি ঘটনা নিয়ে লিখেছিলাম একটি গল্প ‘খাঁচার পাখিরাও গান গায়।
সেই গল্পের কিছুটা তুলে দিচ্ছি এখানে। কারণ ওটা গল্প হলেও আমার জীবনেরও একটা সময় জড়িয়ে আছে এই কাহিনির সঙ্গে।
‘এক বছর পর চালান হলাম প্রেসিডেন্সি জেলে। কত নাম শুনেছি এই জেলের। ইতিহাস বিজড়িত জেল আলিপুর প্রেসিডেন্সি–কত মহান মহান শহিদ জীবনের শেষ দিন এখানকারই কন্ডেম সেলে কাটিয়ে গেছেন। ঋষি অরবিন্দ এই জেলেরই এক সেলে বসে নাকি ভগবান দর্শন লাভ করে ছিলেন। শত শহিদের তীর্থভূমির ধূলি গায়ে মাখতে পেরে জীবনটা মনে হল যেন ধন্য হয়ে গেল।
মাত্র কয়েক মাস আগে বাহান্ন বা পঞ্চান্ন জন নকশাল বন্দী জেল ভেঙে পালিয়ে গেছে। জেলে তাই এ সময় খুব কড়াকড়ি।
কে যেন বলেছিল, জেলই হচ্ছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়। আমি সেই কথাটা মানি। জেল আমার জীবনে অভিশাপ নয়। পড়ে পাওয়া অমূল্য রতন। এই যে আজ দু কথা নিবেদন করতে পারছি আর গুণীজন তাতে চোখ বোলাচ্ছেন, একি কর্ম পাওয়া।
প্রেসিডেন্সি জেলে মনে হয় মাস তিনেক থাকবার পর দেখা হল আমার এক পুরাতন জেল খাটা বন্ধু রামুর সঙ্গে। স্পেশাল জেলে অনেক দিন একসাথে ছিলাম তো তাই বন্ধুত্বটা বেশ গাঢ়। আমাকে দড়ি-হাজতের খাবার লাইনে থালা হাতে দেখে বড় অবাক হল সে–এ তোর চেহারা কি হয়েছে।
