আমার সঙ্গে দশবছর আগে দল্লীতে দেখা হয়েছিল দিল্লির যোগেনদার। এবার তার সাথে। আবার কলকাতায় দেখা হয়ে গেল। কারণ দিল্লির বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে যোগেনদা তার মাকে নিয়ে পাকাপাকি ভাবে বাস করবে বলে কলকাতার সোদপুরে একটি বাড়ি কিনে চলে এসেছেন।–যোগেন।ইনি দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের বাসিন্দা। এনার বাবা ছিলেন ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ একজন কর্মচারী। মা কোন এক হাসপাতালের সুপারিন্টেন্ডেন্ড।
এইরকম পরিবারের একমাত্র পুত্র যোগেন উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন দিল্লির নামি দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বন্ধু-বান্ধবও জুটেছে সব সম্পন্ন স্বচ্ছল ঘরের ছেলে মেয়ে। তবে এদের একটা বিশেষ বিশেষত্ব ছিল যে এরা শুধু নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য কেরিয়ার এসব নিয়ে ভাবিত ছিল না। দেশের আপামর জনসাধারণের দারিদ্র্য বঞ্চনা নিয়েও ভাবনা চিন্তা করতো। এরা চাইতো দেশ থেকে অসাম্য দূর হোক। সব মানুষ পাক খাদ্য বস্তু শিক্ষা বাসস্থান চিকিৎসা এবং কর্ম সংস্থানের সম অধিকার। বলা বাহুল্য এরা মানসিক দিক থেকে কিছুটা নকশালপন্থীদের কাছাকাছি ছিল।
যোগেনের বাবা চাইতেন ছেলে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হোক। হাসিল করুক সর্বোচ্চ ডিগ্রি। বিদেশে যাক, নিজের কেরিয়ার গড়ুক। সেই ছেলে নকশাল পন্থী’হয়ে যাওয়ায়, পড়াশোনা মুলতুবী রেখে রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত হওয়ায়, ক্রোধে দিশেহারা হয়ে যোগেনকে ত্যাজ্য পুত্র করে দেন। বঞ্চিত করেন তাকে তার সম্পদ-সম্পত্তি থেকে। এতে অবশ্য যোগেনের জীবনে কোন পরিবর্তন ঘটে না। সে তার পূর্বের ভূমিকায় রয়ে যায়।
এরপর এক সময় উত্তাল সত্তর দশকের সমাপ্তি ঘটে। দিকে দিকে জেগে ওঠা বিপ্লবী সম্ভাবনা পিছু হটে। হতাশ যোগেনের বন্ধুরা আর কিছু হবে না’ ভেবে দেশে বিদেশে বড় বড় চাকরি নিয়ে বিয়ে থা করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তবে দেশের দরিদ্র মানুষের প্রতি তাদের যে দরদ তা তখনো সবটা মরে যায়নি। তখন সেই সব লোকেরা একত্র হয়ে ঠিক করে যে তারা তাদের বেতনের একটা অংশ দেশের কাজে ব্যয় করবে। এ জন্য সবাই মিলে একটা ফান্ড গঠন করে। এর সব ভার ন্যস্ত হয় যোগেনের উপর। সে চাকরি বাকরি বিয়ে ঘর সংসার কিছুই না করে সন্ন্যাসীতুল্য জীবন কাটাচ্ছে। দেশের প্রায় সব গণসংগঠন গণ-আন্দোলনের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছে। এই ফান্ডের অর্থ কোথায় কিভাবে খরচ করা উচিত সেই সিদ্ধান্ত নেবে যোগেন। এ ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
তারা উপযুক্ত লোককে বাছাই করে উপযুক্ত দায়িত্ব দিয়েছে এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। যে দায়িত্ব যোগেন বহু বছর ধরে নিষ্ঠার সাথে পালন করে চলেছে। ভূপাল গ্যাস দুঘর্টনা। সবার আগে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যে ট্রাক শোনে পৌঁছায় সে ট্রাকে সওয়ার থাকে যোগেন। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, মমাংগরা বাঁধে মৎসজীবীদের আন্দোলন, যেখানেই আন্দোলন যথাসাধ্য সাহায্য নিয়ে পৌঁছে যায় যোগেন এবং নিঃশব্দে নিজের কাজ সেরে ফিরে আসে। মঞ্চে ওঠে না পত্রিকার ইন্টারভিউ দেয় না টিভিতে মুখ দেখায় না। সব কিছু থেকে দূরে সরে মানুষের কাজ করে যায়।
দিল্লি থেকে এবার দল্লী এসেছে কিছু ওষুধ পত্র নিয়ে ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা দ্বারা স্থাপিত শহীদ হাসপাতালকে দেবে বলে। এ সময়ে নির্বাচনী মহাযজ্ঞ চলছে। সেই প্রচার জিপে বসে দল্লী থেকে চলে এসেছে আদিবাসী জেলা বস্তারে। জল জঙ্গল জমিন নিয়ে গড়ে ওঠা এখানকার আদিবাসী আন্দোলন–যা চালাচ্ছে চেতনা মণ্ডল নামে এক সংগঠন সুযোগ পেলে কাছে গিয়ে সে আন্দোলনও একটু দেখবে।
এই বস্তার জেলার পারাল কোটে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসন পাওয়া এক গ্রামে যোগেনদার সাথে আমার পরিচয়। এরপর মাঝে মাঝেই উনি দল্লী থেকে আমার কাছে। চলে যেতেন। ঘরে খুঁদ কুড়ো যা রান্না হতে ভাগ করে খেয়ে ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে পড়তেন আমার পাশে।
এর কিছুদিন পরে যোগেনদা দল্লী ছেড়ে দিল্লিতে ফিরে যান। আমার সাথে আর কোনো যোগাযোগ থাকে না। কালে ভদ্রে উনি আমাকে এক আধখানা চিঠি লেখেন তাতেই বুঝতে পারি উনি আমাকে ভুলে যেতে পারেননি।
যোগেনদার বাবা মারা যাবার পর মা তার একমাত্র পুত্রকে ক্ষমাঘেন্না করে আবার কাছে টেনে নিয়েছিলেন। তিনি এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন তাই পুত্রের কাছে নিজের শেষ ইচ্ছার প্রকাশ করেছেন, দূরদেশ দিল্লিতে নয়, শেষ নিঃশ্বাস ফেলবেন তিনি প্রিয় স্বদেশ সোনার বাংলায়। ভাগ্যিস মা ওই রকম একটা মনোবাসনা প্রকাশ করেছিলেন, তাই যোগেনদাকে আসতে হয়েছে বাংলায়। তাই আবার দেখা হয়ে গেল আমার সঙ্গে। না হলে আর দেখা হবার কোন সম্ভাবনা ছিল না।
এটাও একটা অদ্ভুত যোগাযোগ। যা আমার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার পক্ষে একটা সহায়তা সুত্র হিসেব চিহ্নিত হয়ে আছে। তাকে আর কোনভাবে যদি ব্যাখ্যা না করা যায় তবে অবশ্যই বলতে হবে ভাগ্য। ভাগ্যে ছিল বলেই এমনটা ঘটেছিল। না হলে যে আমি কোনদিন কলকাতায় আসব না, যে যোগেনদা কোনদিন আর বস্তারে যাবেন না-সেই দুজনার কলকাতায় দেখা হবে কেন!
উৎস মানুষ একটি বিশিষ্ট পত্রিকার নাম। আমি যখন বস্তারে ছিলাম পত্রিকা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত আমার ঠিকানায় একখানা করে পত্রিকা পাঠাতেন। যেটা যোগেনদার মারফতে হয়েছিল। একদিন খবর পেলাম ক্যানিংয়ে উৎস মানুষ পত্রিকার কি একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে। বহুদিন যোগেনদার সঙ্গে কোন দেখা সাক্ষাৎ নেই। ভাবলাম ওখানে গেলে তার কোন খবর পাওয়া গেলেও যেতে পারে। সেজন্য অনুষ্ঠানে গেলাম এবং পত্রিকা সম্পাদকের কাছে যোগেনদার কথা জানতে চাইলাম। তিনিই বললেন যে যোগেনদা এখন স্থায়ীভাবে কলকাতায় আছেন। মা অসুস্থ তাই তার কোথাও যাবার কোন উপায় নেই। এবার আমি তার কাছ থেকে ঠিকানা পেয়ে চলে গেলাম সোদপুর। দেখা পেলাম যোগেনদার। এর পর থেকে মাঝে মাঝে দেখা আর কথা হতেই থাকল।
