দুজন বাগানি আছে। একজন সকাল ছটায় আসে একই জায়গায় বসে এক বান্ডিল বিড়ি ফুকে বাড়ি চলে যায়। তা না করে আর কী বা করবে। বেচারার বয়স বছর চল্লিশ, ওজন কিলো তিরিশ, উচ্চতা তিনফুট, তার উপর হাঁপানি। তবে অন্যজন তাগড়া। লম্বা ছয় ফুট, ওজন আটাত্তর কিলো, বয়স বাহাত্তরে ছিল বাইশ। তার খুবই সাহস। আগে তার সাহসকে কংগ্রেস কাজে লাগাত এখন বড় সাহেব কাজে লাগায়। মাঝে মাঝে তার ডাক পড়ে সাহস দেখাবার জন্য। সেটাই তার আসল কাজ। মালি তো মাইনে পাবার জন্য। সে আসে যেদিন তার ইচ্ছে হয়। থাকে যতক্ষণ থাকতে চায়।
রুনুবাবুকে বলি–আমাকে তো রান্নার কাজের কথা বলা হয়েছিল। তাহলে এসব কেন?
বড় সাহেব বলেছে, এখানে সবাইকে সব কাজ করতে হবে। আর কোনো টাইম ফাইম চলবে না। আমার মাথার উপর দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে বলে সে।
সেটা কী শুধু একা আমার জন্য বলেছে! তাতো নয়। সবাই কী এখানে সব কাজ করে?
আপনি কী বলতে চাইছেন। তার মানে কী বড়দি গিয়ে আপনার সাথে রান্না করবে।
আমি কী তা বলেছি।
তাহলে কী বলছেন?
ছেড়ে দিন।
না, না বলুন কী বলতে চান। যদি বলেন বেড়া দেবেন না সেটা বড় সাহেবকে জানাই। তারপর আপনি জানেন।
বড় সাহেব! সেই কবে কত বছর আগে গব্বর সিং বলেছিল তার নাম শুনলে ভয়ে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ে। আর এখন দক্ষিণবঙ্গের অনেক বিরোধী গ্রাম বড় সাহেব আসছে শুনলে ঘুম ভেঙে চমকে সেই যে জেগে ওঠে সারারাত আর দুচোখের পাতা এক করতে পারে না। মানুষ নয়, যেন এক মূর্তিমান ত্রাসের প্রতিমূর্তি।
আমিও এখন কেঁপে গেলাম ভয়ে।নড়বড়ে হয়ে গেল সাহসের সব শেকড়। মনে পড়ে গেল। এক বন্ধুর উপদেশ। কী একটা ব্যাপারে যেন বলেছিলাম, আমি ভাঙতে রাজি আছি। মচকাতে রাজি নই। এই আমার জীবনদর্শন।
তখন বলেছিল সে-এটা কোনো বুদ্ধিমানের কথা নয়। গোঁয়ার নির্বোধরাই এমন করে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে গোয়ার্তুমি ভালো নয়। যে গাছের ডাল ভেঙে যায় কী হয়? জ্বালানি হয়ে যায়। যে ডাল একটু নমনীয়–সে নুয়ে যায়। অনুকূল সময় পেলে আবার সোজা হয়। এককালে তো বইপত্র পড়তিস। পড়িস নি–ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড টু স্টেপ ব্যাক। কে বলেছে, লেনিন। সে কী বোকা ছিল? এক পা এগিয়ে দুপা পেছালে তার মানে তো হার! না হার নয়। দেখবি ঢু মারার আগে ষাঁড় কিছুটা পিছনে সরে আসে। ঘুসি মারার জন্য মানুষ হাত টেনে নেয় পেছন দিকে। এটাই পদ্ধতি।
এখন নিজের মনের কাছে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। প্রথমত, মানুষের সাথে মানুষ ভালো ব্যবহার কেন করে? করে, কারণ সেও চায় অন্যেরাও তাহলে তার সাথে ভালো ব্যবহার করবে সহযোগ সহমর্মিতা দেবে। যার সে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে, যে নিজের শক্তিমত্তার উপর অত্যাধিক আস্থাবান হয়ে গেছে তার অন্যের সাথে সুসম্পর্ক সদব্যবহার করার দরকার পড়ে না। ভালো ব্যবহার করা ভালো মানুষ হয়ে ওঠা–এটা একটা দীর্ঘ অনুশীলন। সেটা যেমন একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে, বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যায় ধীরে ধীরে। এর পিছনে ব্যক্তি মানুষের ভূমিকা খুবই গৌণ–এইসব কিছুর নিয়ন্ত্রক সময়-সমকালীন গোটা একটা ব্যবস্থা।
এই লোকটা শুধু এক ব্যক্তি নয় সে একটা মতাদর্শের প্রতিনিধি, একটা শাসন ক্ষমতার অংশ। তারই প্রতিফলন ঘটছে তার ব্যবহারিক জীবনে। যতক্ষণ এই ব্যবস্থার লয় বা শক্তিহ্রাস না ঘটবে তার যাপন প্রণালির কোনো পরিবর্তন হবার নয়। রামকৃষ্ণদেব বলেছেন যে সয় সে রয় যে না সয় নাশ হয়। মনকে বোঝাই, সহ্য কর। কত নামকরা ঐতিহ্যশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নবাগতের উপর অত্যাচার চলে। যার ইংরাজি নাম র্যাগিং। তোর উপর তাই চলছে। সয়ে যা। সয়ে যা আর অপেক্ষা কর। আমার বাবা বলতেন, যার না ধরি হাতে তার ধরি পায়ে–দেহি যদি দুঃসময়টা যায়। আমার বাবা ছিলেন অতি দুর্বল দরিদ্র নির্বিরোধী মানুষ। তাই তার বলা বাক্যে বিষ দ্বেষ থাকত না। এই কথা অন্য একজন বলত অন্যভাবে। অভদ্র বর্ষাকাল হরিণে চাটে বাঘের গাল, শোন রে হরিণ তোরে কই, সময় বুঝে সবই সই।
আর কথা বলি না, মুখ বুজে নেমে পড়ি ময়দানে। প্রায় তিন চার বিঘে জায়গা। আগে ভোবা ছিল, মেট্রো রেলের মাটি এনে ডোবা ভরা হয়েছে। এখানে সবজি চাষ হবে।
দুপুরের গনগনে রোদ, মাথার উপর যেন আগুন ঢালছে সূর্য, কুল কুল ঘামে শরীর ভিজে যাচ্ছে আমার। পেট কামড়াচ্ছে খিদেয় সেই অবস্থায় আমি খুঁটি পুতে বাঁশ চিরে পেরেক ঠুকে বেড়া দিতে থাকি। একদিনে কাজ শেষ হবে না। দিন চার-পাঁচ লাগবে। রোজ দুপুরের রান্না খাওয়ার পরে ভিড়ে যেতে হবে এই র্যাগিংয়ে।
এক সময় একটা শব্দ পেয়ে চোখ তুলে দেখি, দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে আর আমার রোদে পোড়া, ঘামে ভেজা কষ্ট দৃশ্য নয়ন ভরে অবলোকন করছে ছোট রুনু। তার চোখ হাসছে মুখ হাসছে, শরীর হাসছে কী এক আনন্দে।
***
আচ্ছা এটা কি সত্যি সম্ভব যে একজন উত্তর প্রদেশের লোক গেল মধ্যপ্রদেশে। দেখা হল একজনের সাথে, আলাপ পরিচয় বন্ধুত্ব হল। তারপর উত্তরপ্রদেশের লোকটি ফিরে গেল উত্তর প্রদেশে। এরপর বছর দশেক বাদে মধ্য প্রদেশের লোকটি এল পশ্চিম বাংলায়, আর সেখানেই দেখা হয়ে গেল উত্তর প্রদেশের লোকটির সাথে। এমন হওয়াটা অসম্ভব ব্যাপার। যদি অসম্ভবটা সম্ভব হয় তবে বুঝতে হবে এর পিছনে অদৃশ্য কোন শক্তি আছে। গভীর কোন রহস্য আছে। আর বিশেষ কোন উদ্দেশ্য আছে।
