আমি কাজে যোগ দিয়েছিতখন মাত্র কয়েকদিন হয়েছে। উনি হাজিরা দিতে এসেছেন। এসেছেন সেই দশটায়। উনি এলে সারা স্কুলে একটা সোরগোল একটা ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে যায়। কাকে যে কী ভাষায় ধমকাবেন কেউ জানে না। ধমকানোর জন্য খুব বেশি কারণ দরকার পড়ে না। কারণ না পেলে কারণ খুঁজে নিতে কতক্ষণ লাগে! কথায় তো বলে ‘চালাক’ লোকের ছলের অভাব হয় না।
উনি স্কুলে ঢুকলেন। দেখলেন পায়খানা বাথরুমের লাইট জ্বলছে। ফেটে পড়লেন হুঙ্কারে। কে আছে দারোয়ান ডিউটিতে! হয়তো তখন বিহারির ডিউটি। কঁপায় তার উপর দেখছে না। লাইট জ্বলছে। ফালতু কারেন্ট পুড়ছে। পয়সাটা কী তোমাদের লালু দিয়ে যাবে!
মিন মিন করে বলে বিহারি–হামি আখুন লাইট নেভালো। তারপর গিলো পাম্প চালাতে। সেই সোমায় কাউ পায়খানা গিছে। সে যদি সুইজ না নেভায় হামি কী করব।
কোনো কথা শুনতেজাইনাদাজে রোজ এক গল্প। সব দারোয়ানগুলো ফঁকিবাজ। নেভাও, আলো নেভাও। আজ বলে দিলাম, নজর রাখবে। আর যেন কোনদিন দেখি না।
উনি স্কুলে আসা মাত্র নীচ থেকে কেউ না কেউ ছাদের দিকে মুখ করে চিৎকার দেয়, রঞ্জনদা, দাদা এসে গেছে। চাবসাও। উনুনে যা থাকতৎক্ষণাৎ সেটা নামিয়ে রেখে চা বসাতে হবে আমাকে। দশ মিনিট সময় তার মধ্যে চা বানিয়ে উনি কোথায় খুঁজে বের করে চা দিয়ে আসতে হবে। উনি তখন নীচের তলায় আছেন ভেবে, গিয়ে দেখব নেই। হয়ত দোতলায় ঘুরছেন, হয়তো কোনো ঘরে গিয়ে দাবা ক্যারাম খেলছেন। চা দিয়ে ফিরে আসব হুকুম দিলেন, চিনি কম আছে, নিয়ে আসুন। চিনি দেবার পর আর এক হুকুম, যান, সামনের মুদি দোকান থেকে একটা ফ্লেক নিয়ে আসুন। ফ্লেক এনে দেবার পর আবার আর এক হুকুম, দেশলাই নিয়ে আসুন।
এই যে একজন মানুষ গলদঘর্ম হয়ে বারবার সিঁড়ি ভাঙছে, তার হুকুমে কুকুরের মতো ছুটছে, এতেই তার মানসিক শান্তি আসছে, নিজের পদ এবং ক্ষমতার প্রতি সম্ভ্রম জাগছে। পারি, আমিও পারি। বড় সাহেব স্কুলে এলে সবাই যেমন কুঁকড়ে যায়, লেজ নাড়ায়, আমার জন্যও সেটা করে।
আমি এখানে আসার দ্বিতীয় কী তৃতীয় দিন এই রকম একটা হুঙ্কার গর্জন চিৎকার শুনেছিলাম ছাদে দাঁড়িয়ে, চা বসান। দাদা এসেছে। উনুনে তখন ডাল ফুটছে। ভেবেছিলাম ডালটা নামিয়ে চা বসাব। তাই একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। সেটাকেই সে ভেবে নিল অমনোযোগ, যা পরে অস্বীকার তারপর অবাধ্যতা হতে পারে। সেই বীজ অঙ্কুরেই বিনাশ করা বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ।
এমনিতেই সে সব সময় সরোষে কর্তৃত্ব বাচক শব্দাবলির ব্যাপক প্রয়োগ করে থাকে। যার মধ্যে জনৈক বড় নেতার আমি বলছি, আমি করছি অলঙ্কৃত মুদ্রাদোষ বহুল পরিমাণে ঝকৃত হয়। সেদিন সে তারই প্রদর্শন করে। কী হল! চা পেলাম না কেন?
বলি, রান্নার দেরি হয়ে যাবে, বাচ্চাদের স্কুল আছে। ডালটা…।
হ্যাং ইয়োর ডাল। গজরায় সে-হ্যাং ইয়োর বাচ্চা! আমি বলছি, আগে চা। ডাল নামান। কেউ যদি কিছু বলে, আমার নাম বলবেন।
অগত্যা ডাল নামিয়ে রেখে চা বানাই। তার অহম তৃপ্ত হয়।
আজ বাচ্চাগুলোকে খাইয়ে দাইয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে চান করে দুটো খেয়ে বাড়িতে একটা চিঠি লেখার কথা ভাবছি। এমনিতে কেনারাম ফিরে গিয়ে আমার স্ত্রী অনুর কাছে সবকিছু বলেছে। তবু আমার একটা চিঠি দিয়ে সব কিছু বিস্তারিত জানানো দরকার।
অনু এখন পিত্তেপুরিয়া বলে একটা আদিবাসী গ্রামের আই.সি.ডি.এস. প্রকল্পের অন্তর্গত এক স্কুলে বাচ্চাদের পড়ায়। দুশো পঁচিশ টাকা বেতনে ঢুকেছিল। এখন বেতন বেড়ে চারশো পঁচাত্তর হয়ে গেছে। তবে এই বেতনে একটা ছেলে একটা মেয়ে নিয়ে সেকি খেয়ে পরে বাঁচতে পারে? একটা ভরসা, আদিবাসী মানুষেরা ওকে খুব ভালোবাসে। আদিবাসীরা এমনিতে সভ্য জগতের মানুষকে বিশ্বাস করে না। ভালোবাসে না। দূরত্ব বজায় রেখে চলে।কিন্তু যাকে একবার ভালোবেসে ফেলে তার জন্য জান কোরবান।
শঙ্কর গুহ নিয়োগী আমাদের শিখিয়েছিলেন মানুষকে ভালোবাসতে। ভালোবাসা দিলে ভালোবাসা পাওয়া যায়। তবে ওই–বুঝে নিতে হবে লোকটা মানুষ তো। আদিবাসীরা মানুষ। যদিও একটা দুটো অমানুষ হয়ে গেছে সে ওই সভ্য জগতের সহবতের কুফল।
আমি দীর্ঘদিন আদিবাসী অঞ্চলে ছিলাম। আমি সেই ভাগ্যবানদের একজন যে তাদের উজার করে দেওয়া ভালোবাসায় আকন্ঠ অবগাহন করে কৃতার্থ হয়ছি। আমার স্ত্রী অনুও সেই ভালোবাসা পাচ্ছে। তাদের যার ক্ষেতে যে নতুন ফসল ওঠে “মাদাম’ কে না দিয়ে খাবে না। মুরগি ডিম দিলে একটা দুটো তার জন্য রাখা থাকে। লাউ ধরেছে গাছে, একটা অনুর। জ্বালানি কাঠ নেই মাদামের বাসায় একজন সাইকেল করে ফেলে দিয়ে চলে যায়। ওদের ভরসায় কিছুদিন যদি অনু চালিয়ে নিতে পারে, আমি একদান ভাগ্যের সাথে জুয়া খেলে দেখতে পারি। যদি জিতে যাই আবার ওরা ফিরে আসবে এখানে। যদি হেরে যাই আমি চলে যাব ওখানে। তারপর যা হয় হবে।
চান করা খাওয়া আর হল না। রুনুর ছোট সংস্করণ এসে দাঁড়াল আমার সামনে। দুটো চোখের তারায় ধক ধক্ করছে চেপে রাখা জিঘাংসা। বলে সে সব কাজ হয়ে গেছে?
হ্যাঁ, এবার চান করব।
চান পরে। নীচে চলুন।
কেন?
গেলেই দেখতে পাবেন।
নীচে যাবার পর দেখি একটা শাবল একটা দাঁ, হাতুড়ি কিছু পেরেক রাখা আছে। বলে সে তুলুন এগুলো। আমি তুলে নিই। সে আগে আগে হাঁটে আসুন। পিছন পিছন গিয়ে দাঁড়াই একটা ফাঁকা জায়গায়। সেখানে কিছু বাঁশ পড়ে আছে। বাঁশগুলো ফেড়ে মাঠের চারদিকে খুঁটি পুতে বেড়া দিয়ে দিন।আদেশ দেয় সে। এখানে সবজি চাষ করা হবে। যেন বেড়া মজবুত হয়, না হলে গরু ঢুকে পড়বে।
