এর কিছুদিন পরে আমার এক বন্ধু আফিফ কলকাতা থেকে চিঠি লেখে ছত্তিশগড়ে আমার ঠিকানায়। জানায় ‘অভিমুখ’ নামে এক পত্রিকা নিয়োগীজির উপর একটা বিশেষ সংখ্যা করতে চাইছে। আমার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি চিঠি দিয়ে জানাই চলে এসো ছত্তিশগড়ে। এই কাজে আমার যথাসাধ্য সহযোগিতা থাকবে। কথা দিলাম।
কথামত নির্দিষ্ট দিনে আফিফ আর তার বন্ধু অভিমুখ পত্রিকা সম্পাদক–এসে গেল ছত্তিশগড়ে। সেই বন্ধুকে ওই ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে দল্লীতে রেখে আফিফ গেল বস্তারে আমার ঠিকানায়। বহুদিন পরে দেখা, দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ হাসলাম, কিছুক্ষণ কাঁদলাম। আফিফ আগে রানার নামে একটা দেওয়াল পত্রিকা চালাত। পরে সেটা মুদ্রিত পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। এই পর্বে আমি সেই কাগজের লেখক ছিলাম। এরপর আফিফকে নিয়ে আমি চারদিন ধরে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ালাম। দেখা করলাম ভারত জন আন্দোলনের নেতা ড. ব্রহ্মদেও শর্মার সাথে, চেতনা মণ্ডলের সুরেশ মোড়ে, একতা পরিষদের রত্নেশ্বর নাথ, কাকেরের বাঙালি উকিল বিষ্ণুপ্রসাদ চক্রবর্তী, মুরলী মোহন উপ্ৰেতি আর নাজীব কুরেশির সাথে। এরা সবাই নিয়োগীজির আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। খুব কাছ থেকে দেখেছে তাকে। সবাই বলল লেখা দেবে। তারপর আফিফকে দল্লীতে পৌঁছে দিলাম। একদিন ওখানে থাকলাম। ওরা চলে গেল কলকাতা। আমি ঘুরে ঘুরে লেখাগুলো সংগ্রহকরলাম। হিন্দি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে পাঠিয়ে দিলাম অভিমুখের ঠিকানায়। আজ আর সঠিকভাবে মনে নেই, খুব সম্ভব চারটে লেখা পাঠিয়েছিলাম বস্তার থেকে। যার মধ্যে একটা আমার নিজের লেখা, আর একটা নিয়োগীজির ‘শহিদ বীর নারায়ণ সিং’–এর বাংলা অনুবাদ।
কিছুদিন অপেক্ষার পর হাতে পেলাম অভিমুখ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা। পাঠিয়েছে আফিফ। পত্রিকা খুলে আমি হতভম্ব। কোথাও আমার কোনো নাম নেই। নিয়োগীজির লেখা–আমার অনুবাদ শহিদ বীরনারায়ণ সিং ছাপা হয়েছে বটে তাও আমার নামোল্লেখ ছাড়া। আফিফের নাম দেখলাম অতি ক্ষুদ্র অক্ষরে এক কোণে ম্রিয়মান হয়ে পড়ে আছে। সম্পাদকীয় পড়তে গিয়ে আমি আরও অবাক। সেখানে লেখা রয়েছে, যে লেখার উপরে নাম নেই তা অমুক ডাক্তারের লেখা বা অনুবাদ করা।
এর কারণ কী? একটা চিঠিতে সেটাও খোলসা করেছে আফিফ, সে যখন দল্লীতে তার বন্ধুকে রেখে বস্তারে আমার কাছে যায়, চারদিনের মধ্যে তাকে পটিয়ে ফেলে গুণধর ডাক্তার। প্রস্তাব দেয়, যদি মনোরঞ্জন ব্যাপারী পত্রিকায় যুক্ত না থাকে তবেই সে নিয়োগী বিষয়ক তথ্য-লেখা
অভিমুখকে দেবে। অন্যথায় নয়। আর যদি তা করা হয়, কলকাতায় তার বন্ধুমহলে একটা বিশাল সংখ্যার পত্রিকা বিক্রির ব্যবস্থা করে দেবে। দেবে আগাম কিছু আর্থিক সহযোগ মিতান তহবিল থেকে। বন্ধু সেই লোভনীয় টোপ গিলে নেয়।
ট্রেনে যেতে যেতে সে আফিফকে বলে এই প্রস্তাবের কথা। তা নিয়ে দুই বন্ধুতে তুমুল ঝগড়া হয়ে যায়। ট্রেন থেকে নেমে দুই বন্ধ হেঁটে যায় দুই পথে। ছিন্ন হয়ে যায় সব সম্পর্ক। একটা বিশেষ সংখ্যা করার জন্য যতটুকু যা দরকার, সব তো বন্ধু পেয়ে গিয়েছিল। সব গোছানো ছিল তার ব্যাগে। আর আফিফকে না হলেও চলবে। আমাকেও দরকার নেই। তবে আমার লেখাগুলো ডাক মারফত তার কাছে পৌঁছে যাবার পর ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিকে দৃষ্টি রেখে বীর নারায়ণ সিংকে বাদ দিতে পারে না। তাই ওই কৌশল–সব লেখা অমুকের।
পরে আফিফ একা একটা পত্রিকা করে দিবা রাত্রির কাব্য’। ভালোই চলছে সেটা। সেরা লিটল ম্যাগাজিনের সম্মানও পেয়েছে একবার।
২০১৫ সালের বইমেলায় সংঘর্ষ ও নির্মাণ বাংলা পুস্তকখানি অনুষ্টুপ থেকে নবপর্যায়ে পুনঃ প্রকাশ হয়েছে। দুজন সম্পাদকের একজন সেই গুণধর ডাক্তার। এবারও আমার সেই লেখাটি অভিমুখ থেকে নিয়ে এই পুস্তকে রাখা হয়েছে। তবে অন্য যে সব লেখা আছে তার কে লেখক, কে অনুবাদক নাম থাকলেও নাম নেই ‘আগামী প্রজন্ম ও শহীদ বীর নারায়ণ সিং’–এই লেখাটি যে হিন্দি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছিল। তবে এবার আর সব লেখা অমুকের’ এমন দাবিও করেন নি।
পরিশেষে যেটা বলার–একটু খারাপ তো লাগছে। তবে মানুষ লেখাটি পড়ছে, বীর নারায়ণ শঙ্কর গুহ নিয়োগী বিষয়ে জানছে এটা কম পাওনা নয়।
আর একটা কথা–যার গর্ভে জন্ম নিক, আর যাকেই বাপ ডাকুক তাতে কী! আমি তো জানি, আমিই ওর জন্মদাতা। আর জানে সেই অন্ধকার রাত, যে রাতে মেতেছিলাম–সৃষ্টি সুখের। উল্লাসে। সেই আনন্দ স্মৃতির ভাগ কে নেবে! সে একা আমার।
ওই ডাক্তার ওই আফিফের বন্ধু এরা একা বা বিচ্ছিন্ন নয়, এটা হল সমগ্র বাঙালি মধ্যবিত্ত বামপন্থীদের মানসিকতা। আমরা উচ্চ আমরা শ্রেষ্ঠ এটা স্বীকার করে নিয়েই আমাকে কমরেড ভাববে। এর বাইরে কী কেউ নেই? আছে, সে হচ্ছে ব্যতিক্রমী বিরলের মধ্যে বিরলতম। শঙ্কর গুহ নিয়োগী ছিলেন বিরলতমের একজন।
আমি আমার কর্মক্ষেত্রে অনেক গড়পড়তা মধ্যবিত্ত বামপন্থী পেয়ে গেছি, তারা রাজক্ষমতার অংশী বটে, তবে কেউ এতোটা আক্রামক নৃশংস নির্দয় নয়, যতটা ওয়ার্ডেন। এক অর্থে এ-ও বিরলের মধ্যে বিরলতম। দাসদার মুখে আমার কিছু পরিচয় জেনে ঠিক করে ফেলেছেন তিনি, আমাকে দুমড়ে দেবেন।
