সে যাইহোকতখন এই যাদবপুরে কুড়ি পঁচিশটা এইরকম জবরদখল কলোনি গড়ে উঠেছিল। সে সব কলোনির বাড়িঘর নির্মাণে মুর্শিদাবাদের মুসলমান রাজমিস্ত্রি পূর্ব বাংলার নমঃ পোদ পশ্চিমবঙ্গের কাওড়া বাগদিদের একটা বড় ভূমিকা ছিল।
আমার বাবা রোজ রাত তিনটে সাড়ে তিনটের সময় যখন আকাশে ধ্রুব তারা দেখা দেয়–ঘুম থেকে উঠে ঝুড়ি কোদাল আর গামছা নিয়ে ঘোলা দোতলা থেকে সাত আট মাইল পথ পায়ে হেঁটে এসে পৌঁছাতেন ঘুটিয়ারি শরিফ রেল স্টেশনে। এই পথ হেঁটে আসতে তার প্রায় দেড় দু ঘন্টা লেগে যেত। তখনও ক্যানিং লাইনে দ্রুতগামী ইলেকট্রিক ট্রেন চালু ছিল না। চলত টিকিস টিকিস করে চলা কয়লার ট্রেন। সিঙ্গল লাইনের সে ট্রেন একবার কোথাও দাঁড়িয়ে পড়লে কখন যে নড়বে কোন ঠিকঠিকানা ছিল না। বাবা ভোর পাঁচটা নাগাদ ঘুটিয়ারি শরিফ থেকে ট্রেনে চেপে ছটা সাড়ে ছটা নাগাদ পৌঁছাতে পারতেন যাদবপুর স্টেশনে। তারপর আবার মাইল দুই আড়াই হেঁটে পৌঁছতেন বাঘাযতীন মোড়ে। এই মোড়ে শতশত মজুর জমা হতে কাজের আশায়। মোড়ের সেই ভিড়ের উপর পথচলতি মানুষ আর স্থানীয় দোকানদারদের রাগ ছিল ভীষণ রকম। পরে যখন আমিও কাজের সন্ধানে ওই মোড়ে গিয়ে দাঁড়াতাম তখন দেখেছি, বাঘাযতীন মোেড় থেকে বাঘাযতীন স্টেশনে যাবার যে রাস্তা তার ডান দিকে মোড়ের মাথায় একটা মিষ্টির দোকান ছিল। সেই দোকানের সামনে দাঁড়ালে ঢাকা জেলার দোকানদার মগে করে গায়ে জল ঢেলে দিত। সর সর, সরে যা। দোকানের সামনে দাঁড়াবি না।
বাবা সেই মোড়ের মাথায় একটা কোণ খুঁজে নিয়ে কালীঘাটের ভিখিরির মতো সামনে ঝুড়িকোদাল রেখে বসে থাকতেন, যদি কেউ কাজে নিয়ে যায় সেই আশায়। এদেশে সর্বক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কম। সে তুলনায় কর্মীর সংখ্যা বহুগুণ বেশি। সব মানুষের তাই সবদিন কাজ হয়না। যদি বাবার সেদিন কাজ না হয়, না খেয়ে অথবা শুধু জল খেয়ে সারাটা দিন বসে বা গামছা বিছিয়ে শুয়ে থাকতে হতো রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। তারপর খালি হাতে ওই একই পথ পাড়ি দিয়ে একই রকম কষ্ট করে অনেক রাতে একবুক হাহাকায় নিয়ে ঘরে ফিরে আসতেন। ইচ্ছা থাকলেও বাবা দিনের বেলা ট্রেনে চাপতে পারতেন না। কারণটা আর কিছু নয়, তিনি যে বিনাটিকিটের যাত্রী। দিনের বেলা ট্রেনে চেকার থাকে। চেকার বিনা টিকিটের যাত্রী ধরতে পারলে জেলে নিয়ে যায়। সে কারণে তার সাহস হতো না ট্রেনে চড়বার।
যেদিন বাবাকে কেউ কাজে ডেকে নিয়ে যেত সেদিন দুপুর বেলায় মালিকের কাছ থেকে আটআনা পয়সা আগাম চেয়ে নিয়ে একটা পাউরুটি এক প্লেট আলুর দম দিয়ে দুপুরের খাওয়া। সারতেন। বাদবাকি যা মজুরি সেটা কাজের শেষে হাতে পেয়ে অনেক রাতে বাজার করে বাসায় ফিরতেন। সেদিন আমাদের ঘরে রান্না হতো, আমরা খেতে পেতাম।
ঘোলা দোলতলা আসবার কিছুদিন পরে আমার আর একটি বোনের জন্ম হয়েছে। আমাদের সেই আটজনের পরিবার একা বাবার রোজগারের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাবার সবদিন কাজ না হবার কারণে আর তার সারাদিন না খেয়ে থাকার ফলে একদিন পেটে ব্যথার রোগ ধরে গেল। প্রথম প্রথম কিছুদিন চিনচিনে থেকে শেষে দাউদাউ হয়ে উঠল সেই ব্যথা। তখন আর বাবা কাজে যাবার মতো অবস্থায় রইলেন না। বিছানায় শুয়ে কাটা ছাগলের মতো ছটফট করতে লাগলেন। ঘরে আমাদের কোন টাকা পয়সা তো ছিল না যে বাবাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাই। বিনা ওষুধ পথ্যে রোগ সারে না, দিনে দিনে বেড়ে চলে।
যে রোজগেরে মানুষ সে যদি বিছানায় পড়ে থাকে তবে তার ঘরের উনুন কী করে জ্বলে? আমাদের খাবার দাবার যোগাড়ের কোন পথ না থাকায় শুরু হয়ে গেল অরন্ধন-অনাহার। না খেতে পেয়ে শুকিয়ে আমরা সব চিমসে মেরে গেলাম। আমার বড় বোন মঞ্জু মরে গেল।
লোকে বলে দারিদ্র্য, গরিবি, অভাব অনটন। কিন্তু এই সব নরম কোমল সাহিত্যের শব্দ দিয়ে আমাদের সেই সময়কার দুরবস্থাকে কোনভাবেই বর্ণনা করা সম্ভব নয়। শুধু বাংলা কেন, বোধ হয় পৃথিবীর কোন ভাষার মধ্যে এমন শব্দ নেই যা আমাদের জীবনের সেই দুঃসহ সময়ের চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম।
তখন বাজারে এক আনা দামের প্রায় একশো গ্রাম ওজনের গোল কালো একটা সাবান পাওয়া যেত। আমাদের সেই এক আনা দামের সাবান কেনার মতো সামর্থ ছিল না। ধুলোমাটি পড়ে মাথার চুল এঠেল হয়ে জট বেধে যেত। তখন পুকুর পাড় থেকে মাটি তুলে মাথা ঘসে ঘসে সাফ করতাম। আমাদের ছোট চুল এভাবে সাফ হলেও মায়ের হবে কী করে। শুনেছি আমার মায়ের মাথার একরাশ ঘনকালো চুল দেখেই নাকি আমার ঠাকুরদা তাকে নিজের পুত্রবধূ করে নিয়ে এসেছিলেন। সাবান তেলের অভাবে সে চুলে এমন জট পাকাল যে আর খোলা গেল না। শেষে সব চুল গোড়া ঘেসে কঁচি দিয়ে কেটে ফেলে দিতে হল। মায়ের গায়ের রঙ এক সময় বেশ ফরসা ছিল। সে রঙ এখন রোদে জলে অযত্নে তামাটে আর খসখসে হয়ে গেল। সেই শিরোমণিপুর ক্যাম্পে থাকাকালে সরকার বছরে একবার কিছু কাপড় চোপড় দিত। সেই শেষ। তারপর আর কারও জন্য পরিধানের কিছু কেনা যায়নি। এখন বস্ত্রাভাবে আমার তিনভাই বোন সব উদোম হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আমি আমার পেছন ছেঁড়া প্যান্ট পড়ে লোকের সামনে যেতে হলে হাত দিয়ে ঢাকতে লাগলাম ছেঁড়া স্থান।
