ক্রমে ক্রমে তার সাথে একটা মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। বৈরী ভাবতে থাকে সে আমাকে। আগে বস্তার থেকে দল্লী এলে ডেকে কথা বলত এখন পাশ কাটিয়ে চলে যায়। দেখেও না-দেখার ভান করে। আমি গায়ে পড়ে আলাপ করতে চাই, সে আমল দেয় না।
একদিন দল্লীতে একটা মুখিয়া মিটিং চলছে। চেয়ারে বসে আছে সেই ডাক্তার। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি বিকৃত হেসে সবাইকে বললেন, এ আদমি কভি দাদা লোগকে সাথ হুয়া করতা থা। দাদা লোক মানে নকশাল। তারপর আমাকে প্রশ্ন করলেন, কটা খুন করেছেন? আমার লেখা লেখক সত্তা নিয়ে কোনো কথা নয়, তার আগ্রহ সবার সামনে আমাকে একটা খুনি প্রতিপন্ন করা।
এরপর।
এরপর থেকে যখনই তার সাথে দেখা হয়, আমি যদি তার কাছে জানতে চাই-কী লিখছেন এখন! সে জিজ্ঞাসা করে আমি এখনও মদ খাই কিনা!
এইভাবে কেটে গেল কিছুদিন। ঘরের মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন শঙ্কর গুহ নিয়োগী। তখন কলকাতার একটা বিশিষ্ট পত্রিকা অনুষ্টুপ’নিয়োগীজির উপর একখানা পুস্তক প্রকাশের পরিকল্পনা নেয়। যার নাম রাখে সংঘর্ষ ও নির্মাণ। যাদের সাথে নিয়োগীজিকাজ করেছেন, সংগঠনের সকল কর্মকর্তা, শ্রমিক কৃষক বহু মানুষের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ হতে থাকে, যারা লিখতে পারে লিখে দেয়, যারা পারে না, শুনে অন্য কেউ লিখে নেয়।
আমি বস্তারে বসে সে খবর পাই। কলকাতার এক বন্ধু চিঠি দিয়ে জানায়। এরপর আমি একটা লেখা তৈরি করি। লেখা তো মনের মধ্যে হয়ে বসেছিল, অপেক্ষা ছিল খাতার পাতায় নামানো। সেটা করতে যেটুকু সময়। উনিই ছিলেন এ অঞ্চলের লেখা সংগ্রহের দায়িত্বে। দিয়ে এলাম দল্লীতে গিয়ে ওনার কাছে লেখাটা।
কিছুদিন পরে, পুস্তক প্রকাশিত হবার পর দেখলাম প্রায় একশো লোকের লেখা ওই সংঘর্ষ ও নির্মাণ’বইয়ে আছে, শুধু আমার লেখাটা অনুপস্থিত। মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল আমার।নিয়োগীজি আমার নেতা, আমি তার একজন সহকর্মী, এত লোকের এত লেখা! অনেক লোক তো জীবনে এই প্রথম লিখল–সবার সব লেখা রইল, শুধু আমারটাই বাদ! আমার প্রিয় নেতার জীবন ইতিহাসের আকরগ্রন্থে আমার কোনো নাম রইল না!
কেন এমন হয়েছে সেটুকু বুঝে নিতে আমার খুব বেশি মাথা ঘামাবার দরকার ছিল না। সত্যি বলতে কী, সেই প্রথম আমি বুঝতে শিখলাম যে, বামপন্থা হোক আর দক্ষিণপন্থা, কোনো পন্থাই মানুষকে তার ষড়রিপু থেকে বাইরে আনতে পারে না। হিংসা, দ্বেষ, ঈর্ষা, ক্লেদ, কলুষতা সব কিছু বহন করেই মানুষ সমাজে বিচরণ করে। যেমন গেরুয়া অঙ্গে ধারণ করলেই কোনো মানুষ সাধু হয়ে যায় না, যদি না তার অন্তঃকরণ শুদ্ধ-পূত পবিত্র হয়, তেমনই কেউ যদি কোনো বাম দলে যোগ দেয় সে খুব দরিদ্র দরদী হয়ে গেল, তেমনটা সচরাচর হতে দেখা যায় না।
আমরা অতি সাধারণ মানুষ। সাধারণত আমাদের অর্থের প্রতি আকর্ষণ অতিতীব্র।কারণ অর্থ দিয়ে জীবন ধারণের উপযোগী সম্পদ ক্রয় করা যায়। ক্রয় করা যায় অনেক সুখ। তাই যদি কারও অর্থের প্রতি তীব্রতম লালসা দেখি অবচেতনে তার উপর মনটা বিরূপ হয়ে ওঠে। যে অনেক অর্থ সম্পদের মালিক তাকে ভাবতে শিখি শত্রু বলে। ধরেই নিই যে লোকটা অসৎ। তার উপার্জন অন্যায় অবৈধ উপার্জন। অন্যকে ঠকিয়ে সে এসব কুক্ষিগত করেছে। অন্যকে শোষণ-দোহন বঞ্চনা করেই বাড় বাড়ন্ত। আমাদের সেই ক্রোধের তাওয়ায় বামদলগুলো তাদের স্বার্থের রুটি সেকে নেয়। তখন আমাদের মনে পড়ে না যে এইসব দলের নেতারাও এসেছে ধনবান পরিবার থেকে। সে ধন কোনো সৎ উপার্জনে জমা হয়নি। এসেছে সেই একই শোষণ দোহনের চোরাপথে। এরাও আমার শ্রেণি শত্রু।
আর আমাদের সেই আর্থ-সামাজিক বুভুক্ষা দৃষ্টি দিয়ে যখন কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে কিছু কিঞ্চিৎ অর্থের প্রতি অনীহা দেখি তিনি আমাদের চোখে মহান হয়ে যান। সন্ত বনে বসেন। সেই দুর্বল ফাঁক দিয়ে মানুষের মনের কন্দরে ঢুকে হাতিয়ে নিতে চান এমন কিছু যা অর্থের চেয়ে অনেক অনেক বড়।
ওই ডাক্তার সেটাই করতে চেয়েছিলেন। নিয়োগীজির মৃত্যুর পরে তার শূন্য আসনে উঠে বসতে চেয়েছিলেন। পুরো সংগঠনটাকে কবজা করে নিতে চেয়েছিলেন। সেটা অবশ্য পেরে ওঠেননি। দল্লী থেকে বিতাড়িত হয়ে যান। সেসব কিছুদিন পরে ঘটে। সে যাই হোক, তখন আমি আমার হৃদয় নিংড়ে বের করে আনা লেখাটার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। বাংলায় থাকি না, সে হলে একটা কিছু নিশ্চয় করা যেত। এখন একে কী করি! জীবন সুস্থির নয়, আজ এখানে কাল ওখানে। লেখাটা হয়তো হারিয়ে যাবে। শেষে কী ভেবে কে জানে ওটা মহাশ্বেতা দেবীর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলাম। তখন উনি সেটা প্রতিক্ষণ পত্রিকায় দিয়ে দেন। ১৯৯১-এর ডিসেম্বর সংখ্যায় লেখাটা ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে যায়। আমার ধারণায় লেখাটা আমি ভালোই লিখেছিলাম। মহাশ্বেতা দেবীও বলেছিলেন, নিয়োগীকে নিয়ে এখন পর্যন্ত যত লেখা হয়েছে। তোমারটা সর্বোত্তম। কে জানে এই অপরাধেই ওই লেখাটা অনুষ্ঠুপের দপ্তরে গেল না হয়তো।
এরপর মহাশ্বেতা দেবী লেখাটার ইংরাজি অনুবাদ করে ফ্রন্টিয়ার পত্রিকাতে পাঠান এবং ১৯৯২,১ ফেব্রুয়ারি ওটি পুনঃপ্রকাশ হয়। ফের ওই লেখা হিন্দিতে অনুদিত হয়ে ওই বছরের সেপ্টেম্বর দিল্লির রাজকমল প্রকাশনার পুস্তক সংঘর্ষ আউর নির্মাণ-এ স্থান পায়। এই সব কারণে গুণধর ডাক্তার আমার উপর আরও খেপতে থাকে।
