আমি এক সময় গল্প লিখতাম। লেখার কাজটা আমার বড় প্রিয় ছিল। যখন কেউ আমাকে লেখক বলত ভীষণ ভালো লাগত। বাংলা ভাষার মূল ভূখণ্ড থেকে বহুদূরে থাকার জন্য বাংলা সাহিত্য জগতের সঙ্গে আর কোন গভীর সম্পর্ক রাখতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে জীবন আমাকে একটা সুযোগ দিচ্ছে সেই ছিন্ন সূত্রকে সংযুক্ত করার জন্য।
ছত্তিশগড়ে থাকলেও মাঝে মাঝে বাংলার কোনো কোনো কাগজে একটা আধটা লেখা ছাপা হত। যে কারণে একজনাবিলবড়মানুয়ের চক্ষুশূল হয়ে গিয়েছিলাম। সেই প্রথম জেনেছিলাম আপনজনও পর হয়ে যায়, ঈর্ষায় পোড়ে যদি সে এমন কিছু করে ফেলে যা বড়োর বড়ত্বকে ছাপিয়ে যায়।
লেখার জন্য প্রথম যাদের কোপে পড়িতারা একস্কুলের শিক্ষক এবং রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী। লেখার বিষয়বস্তু তাদের মনঃপূত ছিল না। এই প্রথম দেখলাম বামপন্থীরাও স্বপক্ষের সহকর্মীর শত্রু হতে পারে যদি সেই সহকর্মী সামাজিক মর্যাদায় তার সমকক্ষ হয়েও কোনো বিশেষ গুণে তাকে ছাড়িয়ে যায়।
আমি থাকতাম বস্তার জেলায়। সেখানেই সংগঠনের কাজকর্ম দেখাশোনা করতাম। মাসে এক দুবার দল্লী গিয়ে দেখা করে আসতাম নিয়োগীজির সাথে। একদিন সকাল বেলায় গেছি নিয়োগীজির বাসায়, উনি তখন গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি পরে বসে চা খাচ্ছেন আর পেপার পড়ছেন। আমাকে দেখে চোখ চক চক আর মুখে ফুটে উঠল সাদর হাসি। আসুন ব্যাপারীজি বসুন; আমি বসার পর বলেন তিনি, আপনার দূর্গ গল্পটা পড়লাম।
কেমন হয়েছে?
অসাধারণ।
শুধু এইটুকু বলে থেমে গেলে পারতেন। কিন্তু তিনি এখন আরও এমন অনেক কথা বললেন যা শুনলে যে কোনো নবীন লেখকের আনন্দে উড়তে ইচ্ছা করবে।
সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন এক গুণবান ডাক্তার, তিনি সত্যিই গুণবান। উনি এমন একজন চিকিৎসক যিনি কলকাতায় থাকলে কাঁড়িকাড়ি টাকা কামাতে পারতেন। তা না করে দরিদ্র আদিবাসী শ্রমিকদের সেবা করবেন বলে সর্বসুখ বর্জন করে এসে পড়ে আছেন এই দল্লীর শহিদ হাসপাতালে। মাইনে নেন মাত্র দুহাজার টাকা। নিজেই বলেন–আর টাকা কী হবে এতেই যখন চলে যায়।
একদিন রাত তখন প্রায় বারোটা, কনকনে পাহাড়ি শীতে উনি চান করছেন। শীতে আমার সর্বাঙ্গ জমে যাচ্ছে, আর উনি চান করছেন, ব্যাপার কী? পাগল হয়ে গেল নাকি।
বলেন তিনি একটা অপারেশন করতে হবে। প্রেসে গিয়েছিলাম। মিতান পত্রিকার ছাপার কাজ চলছে। বাইকে ফিরেছি, পথে কত ধুলো। চান না করলে ইনফেকশান হয়ে যাবে।
আমি আমার বুদ্ধি বিবেচনা অনুসারে বলি–অপারেশনটা কাল করলে কী হতো!
দেরি হয়ে যাবে। বলেই জল ঢাললেন মাথায়।
একজন হতদরিদ্র মজুর, তার হাইড্রোসিল অপারেশন। সেটা আজই করতে হবে। কাল করলে দেরি হয়ে যাবে। তাই এক ডাক্তার বরফ জমা শীতের দুপুর রাতে সাবান দিয়ে চান করে পরিচ্ছন্ন হচ্ছেন। কেউ সাক্ষী নেই, কেউ তার এই কাজের জন্য কোনো পুরস্কার দেবেন না। সব কিছু করছেন নিজের কর্তব্য বিবেচনাবোধ আর মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা থেকে। একমাত্র আমি তার সাক্ষী। শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এল আমার সেদিন। যে রাজনৈতিক দর্শন মানুষকে এমন মানবিক করে তোলে সর্ব দর্শন তার কাছে খাটো পড়ে যায়।
আবার এই মানুষকেই কদিন পরে দেখি আর এক ভূমিকায়। কর্মকাণ্ডে যার কোনো ব্যাখ্যা হয় না।
নিয়োগীজি সেদিন যখন আমার লেখার ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন চোখ পড়তে দেখলাম তার মুখ থমথমে হয়ে উঠেছে। যেন আষাঢ় মাসের আকাশে কালো মেঘ। নিয়োগীজির কথার ফাঁকে একবার তিনি বলে উঠলেন ডুলুংয়ের ওই সংখ্যায় আমারও একটা লেখা আছে। নিয়োগীজি সে কথায় কর্ণপাত করলেন না। এতে তিনি আরও ক্ষুব্ধ হলেন।
পত্রিকার এই সংখ্যায় আমি লিখেছি গল্প উনি লিখেছেন প্রবন্ধ। সত্যিইনর্মদা বাঁচাও আন্দোলন প্রসঙ্গে ওনার সেটা পরিশ্রমী লেখা। তবু সে লেখা বিষয়ে কোনো কথা না বলে, শুধু আমার লেখার প্রশংসা কেন করেছিলেন বিচক্ষণ নেতা শঙ্কর গুহনিয়োগী?
আমার ধারণায় উনি হয়তো ভেবেছিলেন একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত মানুষ সে তো ভালো লিখবেই। সেটাই তো স্বাভাবিক।কিন্তু যে লোকটা কোনোদিন কোনো স্কুলে যেতে পারেনি, জীবন কাটছে অনাহার, অর্ধাহারে, পাগলা কুকুরের মতো তাড়া খেয়ে খেয়ে, তাকে যদি একটু প্রশংসা করি, প্রেরণা যোগাই–সে একটা মানসিক জোর পাবে জীবন যুদ্ধে। কিন্তু সেই নর্মান বেথুনের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ডাক্তার ভুল বুঝলেন।
ওই ডাক্তার কলকাতার জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের এক নেতা ছিল। কলকাতার যতো পত্র-পত্রিকা তাদের সাথে একটা গভীর নিবিড় সম্পর্ক ছিল তার। কলকাতার মানুষ দল্লীর এক বঙ্গ সন্তানের কর্মকাণ্ড নিয়ে বরাবর কৌতূহলী ছিল। ওই ডাক্তার দল্লীর শহিদ হাসপাতালের কাজের ফাঁকে ফাঁকে এখানকার আন্দোলনের গতি প্রকৃতি নিয়ে কলকাতার পত্র পত্রিকায় লিখতেন। এছাড়া ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার মুখপত্র ‘মিতান’-এর সম্পাদনা এবং বই পত্র প্রকাশনার দায়িত্ব ছিল ওনার। এই সব করতে করতে একটা একাধিকারবোধ মনের মধ্যে থানা গেড়ে বসে গিয়েছিল। ছত্তিশগড় থেকে বাংলা কাগজে লেখার মতো আর তো কেউ ছিল না।
আমি লিখি। এখন আমি ছত্তিশগড়ে চলে যাওয়ায়, ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার সাথে যুক্ত হওয়ায় তার একাধিকার খর্ব হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টলে যাচ্ছে আসীন আসন। এটাই তার মনোকষ্টের কারণ।
