এখন সে ওয়ার্ডেনকে জিজ্ঞাসা করে গোপাল নগরে যাবার পথ। বলে, পাহেলে একদিন গ্যায়া থা। লেকিন আভি রাস্তা পহচান নেহি পা রহা।
ভ্যানে একটা চৌকি চেয়ার, বড় বড় কটা টিনের বাক্সো মুখ বাঁধা কটা বস্তা, খান কুড়ি ইট, এইসব। বোঝা যায় খুব ভারি হয়েছে ভ্যান। তার উপর গ্রীষ্মকালের গনগনে রোদ। লোকটা বহুদূর থেকে ভ্যান টেনে এসেছে, ঘামে ভিজে গেছে তার শরীর, হাঁফাচ্ছে জিভ বার করা কুকুরের মতো। এমন মানুষকে দেখলে যে-কোনো মানুষের মনে কিছু করুণা আসা স্বাভাবিক। সে তো মানুষের। কিন্তু যার মনে আছে এক হার্মাদি আত্মার অপচ্ছায়া, যে মানুষকে বিপদে ফেলে আনন্দ উপভোগ করে তার কেন ওসব মানবিক দুর্বলতা থাকবে।
এটা একটা চৌরাস্তার মোড়। দক্ষিণ থেকে উত্তরে চলে গেছে গড়িয়া থেকে দমদম এয়ারপোর্টে যাবার রাস্তা। আর পশ্চিম থেকে পুবে চলে গেছে যাদবপুর থেকে এঁকে বেঁকে গোপাল নগর যাবার পথ। ভ্যানটা এসেছে উত্তর দিকে থেকে। বদবুদ্ধি চাগাড় দিল ওয়ার্ডেনের মাথায়, সে হাত উঁচু করে দক্ষিণ দিকটা দেখিয়ে দিল সোজা যাবে। দেখবে সামনে একটা মোড়। কাউকে জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই। বেঁকে যাবে বাঁদিকে। মাইল দুয়েক গেলে গোপালনগর। ভুল পথ দেখিয়ে মনে মনে একচোট হেসে নিল সে। ভ্যানঅলা এই গরমে হাঁসফ্টস করতে করতে ভ্যান টেনে যাবে। ফের ফিরে আসবে। তখন নিশ্চয় আধমরা হয়ে যাবে। কী মজা!
একে মা মনসা তার উপর ধুনোর গন্ধ। এমনিতে যে তোক স্বভাব নিপীড়ক তাকে আবার তাতিয়ে দিয়েছে দাসদা। ওয়ার্ডেনের যেমন তেতে ওঠা স্বভাব দাসদার স্বভাব লোককে তাঁতানো। ওই মহিলাকে মাদার কিলার তারই দেওয়া নাম। এতে মহিলা তেঁতে যায় খেপে ওঠে-গাল পাড়ে। এটাই নির্মল মজা।
দুপুর বেলা প্রথম যখন আমাকে দেখে ভালো লাগেনি ওয়ার্ডেনের। দণ্ডকারণ্য থেকে এসেছি, সেটা একটা গভীর বন। ফলত আমার চেহারাটা বুনো বুনো। ওয়ার্ডেনের বাড়িতে রান্নার লোক কাজের মাসি আছে। তারা যেমন বাবু শ্রেণির সামনে কুঁকড়ে থাকে, চোখ তুলে তাকাতে সাহস পায় না, আমার চোখের দৃষ্টি তেমন নয়। তবে ভালো না লাগলেও কী বা করার আছে। আমাকে বড় সাহেব এনেছে!
মানুষ দুজন লোকের প্রতি বিশেষ মনোযোগী থাকে—যাকে সে ভালোবাসে আর যার উপর বিরূপ। দাসদা, আমার উপর বিরূপ ছিল ফলে পথে ঘাটে আমাকে দেখলে আমার বিষয়ে কিছু জেনে বুঝে নেবার চেষ্টা করত। খুব একটা শান্ত নম্র ভদ্র লোক তো ছিলাম না। যাদবপুর রেল স্টেশনে ছিল আমার ঠেক। যেটা দাসদার দুবেলা যাওয়া আসার পথ। সে দেখেছে আমাকে মদ খেয়ে মাতলামো করতে মারপিট করতে, মার খেতে। পুলিশে ধরে নিয়ে যেতে। সে জেনেছে আমি এককালে নকশাল ছেলেদের সাথে মিশতাম। সিপিএম আমাকে ‘কেস ফাইল’ করে দেবে বলে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। রিক্সা ইউনিয়ন সংক্রান্ত কারণে সিটুর লোকেরা আমাকে ঝাড় দেয়। আমি পালিয়ে যাই যাদবপুর থেকে।
রাগ আমার উপর ছিল তার কিন্তু সে নিজে কিছু করবে অতটা সাহস শক্তি শরীর মনে নেই। আর সে সময় তার নিজের দলেও আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা চরমে উঠেছিল। কামারপাড়া, যার নেতা ছিল এক চৌধুরি, যে কামারপাড়া দক্ষিণবঙ্গের বিরোধী দমনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিল, যে কামারপাড়া প্রবল কংগ্রেস-পুলিশের আক্রমণের মুখেঝাণ্ডা বাধা লাল ডাণ্ডা তুলে রাখতে পেরেছিল, যেখানে পা রেখে পার্টি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুরাতন স্বভাব বদলে ফেলতে রাজি ছিল না। সেই আগের মতো বুনো মোষতুল্য চারদিকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। যাকে তাকে মার, তোলা আদায়, জমি জবর দখল এসব চালাচ্ছিল। ফলে জনগণ বিরূপ হচ্ছিল পার্টির উপর। এরা অন্য তো অন্য নিজের দলের দুর্বলকেও গিলে খাচ্ছিল। টিবি হাসপাতালে মহাজনি ব্যবসা কে চালাবে, কার টাকা সুদের খাটবে সেইনিয়ে বিবাদে এক সিপিএম মার্ডার করে দিয়েছিল আর এক সিপিএম-কে।
বড় সাহেব চাইতেন কামারপাড়া তার অনুগত বাধ্য বিনীত হয়ে থাকুক। তিনি যা বলবেন–সেই মত চলুক। কিন্তু কামারপাড়া যারা মার্কসবাদ লেনিনবাদ পড়েনি পার্টির গঠনতন্ত্র কর্মসূচি জানে না, জানে শুধু খুন জখম, জানে হাতে বন্দুক থাকলে পৃথিবী আমার পদানত, তারা নিজেকে ছাড়া আর কাউকে কুর্নিশ করতে রাজি ছিল না। ফলে কামারপাড়া এবং বড় সাহেবপন্থীদের মধ্যে ঠাণ্ডা গরম লড়াই চলছিল।
যতদিন চৌধুরিবাবু, খোকা দাস, সহ একগাদা নেতা কর্মীকে দল থেকে তাড়িয়ে না দেওয়া হয় ওই অবস্থা জারি ছিল। বিতাড়ন পর্ব সমাধা হলে সমগ্র যাদবপুর জুড়ে কায়েম হয়ে যায় বড় সাহেবের একচ্ছত্র আধিপত্য। মুকুটহীন সম্রাট হয়ে ওঠেন তিনি। এমন সম্রাট যে ইচ্ছা করলে যে কোনো লোককে কান ধরে ওঠবস করাতে পারেন।
এখন আমার বিষয়ে অনেক কিছু জেনে নেবার পর ওয়ার্ডেন মনস্থির করে ফেলেন, বিয়ের রাতে বেড়াল মারবেন। একটা গাছ মাটিতে পোর পরে যতদিন যায় একটু একটু করে সে তার শেকড় মাটির গভীরে বসিয়ে দেয়, আকাশে মাথা তোলে। তখন তাকে উপড়ে ফেলা কঠিন। এখনই তাকে নাড়িয়ে দিতে হবে। নাড়াতে থাকতে হবে, মাটিতে শেকড় বসাবার সুযোগ সময় না পায়।
***
যাদবপুর থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম চলতে চলতে আবার সেখানেই পৌঁছে গেছি। রান্নার কাজ থেকে শ্রমজীবনের শুরু। এখন আবার রান্নার কাজ পেয়েছি। এখন মনে হচ্ছে একটা বিশাল পরিক্রমার অন্তিম পর্বে পৌঁছে গেছি। এবার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটতে চলেছে।
