ওয়ার্ডেনও গর্জে উঠলেন, অন্যের বেলা আইন নিয়ম দেখাচ্ছেন–আপনার নিজের বেলা আইন নেই কেন? কটা বাজে এখন? কটায় আসবার কথা ছিল আপনার? এতগুলো লোকের এত সময় নষ্ট, এর পেনাল্টি কে দেবে?
অধস্তন এক কর্মীর এমন অভাবিত আক্রমণে কেমন যেন কুঁকড়ে গেলেন টিচার ইনচার্জ। ভেবে পেলেন না উধ্বর্তনকে কড়কানি দেবার শক্তির উৎস কোথায়? আমি তো জেলা কমিটির নেতার সাথে যুক্ত একী রাজ্য কমিটির? তা না হলে ওয়ার্ডেন হেড অব দি ইনস্টিটিউটকে কী করে এমন রুক্ষ ভাষায় আক্রমণ করতে পারে?
বলে টিচার ইনচার্জ, আমার ট্রেনটা ফেল হয়ে গেল বলে–
ওসব কোনো যুক্তি নয়। বিষয়টা বোঝা উচিত ছিল, কত বড় দায়িত্ব আপনার কাঁধে। এতগুলো লোক আপনার অপেক্ষায় থাকবে। একঘন্টা আগে কেন বাড়ি থেকে বের হলেন না? সবদিন লেটে আসেন, একটা দিন তো একটু আগে আসবেন। আপনি নিজেই যদি এই রকম হন, অন্যরা তো করবেই। আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও বলে একটা কথা আছে। আগে সেটা করুন, সবাই দেখে শিখবে।
বেড়াল মরে গেল, বেলুন চুপসে গেল। আর কোনদিন টিচার ইনচার্জ অন্যকে ধমকালেও ওয়ার্ডেনের উপর হম্বিতম্বি করার সাহস পাননি। নামের শেষে বাবু যোগ করে ডাকা শুরু করেন।
এখন পর্যন্ত ওয়ার্ডেন তেমন কোনো প্রবল প্রতিপক্ষের সামনে পড়েনি। ছোট্ট একটা সীমাঞ্চলে ঘোরাঘুরি। সে সবাইকে চেনে, সবাই চেনে তাকে। মানুষ বোঝে এই লোকটার পিছনে একটা সংগঠিত দল আছে। যে দল সরকার চালায়। যে সরকারের পুলিশ আছে। যে পার্টির প্রচুর ক্যাডার আছে। একে কিছু বললে বা করলে সেই সব শক্তি আমাকে পিষে মেরে দেবে। ফলে সর্বত্র ওয়ার্ডেন সহজে জয় পেয়ে যায়। এইভাবে বিনা প্রতিরোধে জয়ী হয়ে যাবার ফলে দম্ভ দর্প ঔদ্ধত্য আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেছে। তার এখন আর কাউকে অপমান করতে মুখে যা আসে বলতে বাধে না। পুরোপুরি দারোগা স্বভাব গ্রাস করে নিয়েছে তাকে।
জীবন আমাকে দিয়ে কত কিছু যে করিয়ে নিয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। ছাগল গরু চরানো, চায়ের দোকান, হোটেলের থালা গেলাস বোয়া, মুটে-মজুরি, ট্রাকের খালাসি, রাত পাহারার পাহারাদার, শ্মশান ডোম, পায়খানা পরিষ্কার করা জমাদার, রান্নার রাঁধুনি, রিক্সাঅলা থেকে চাকু বোমা হাতে দৌড়ানো, জেলখাটা আসামি আরও কত কী। এইসব করতে করতে হাজার ধরনের লোকের সঙ্গে আলাপ পরিচয়। যা থেকে আহরণ করেছি হাজার রকম জ্ঞান, ধীরে ধীরে ভরে উঠেছে অভিজ্ঞতার ছেঁড়া ঝুলি-ঝোলা।
এখন দেখছি এমন একজনকে যা না দেখলে মানুষ দেখা আমার অসম্পূর্ণ রয়ে যেত। আমি জেলখানায় ছিলাম, বহু দাগি অপরাধী দেখেছি, তাদের সাথে মিশেছি। তাদের কাউকে কোনদিন অকারণে মানুষকে অত্যাচার করে আনন্দ পেতে দেখিনি। আজ দেখছি এমন একজনকে যে বামপন্থী। পরিবারের সন্তান। কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের রচনাবলী থেকে উদ্ধৃতি দেয়। রামকৃষ্ণের কথামৃত পড়েছে আবার সেই লোকই মনে প্রাণে রুনু গুহ নিয়োগী হতে চায়। মানুষকে নিপীড়ন করে মজা পায়।
যাহ নাই ভান্ডে তাহা নাই ব্রহ্মান্ডে। আমি আমার কথা বলছি। আমি রাধুনি মানুষ। এক হাঁড়ি ভাতের একটা টিপে বুঝে যাই সব ভাতের হাল হকিকৎ} সেই জ্ঞানভাণ্ড নিয়ে এই লোকটাকে যতবার দেখছি নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করেছি, যে পার্টির পরিমণ্ডলে এমন বিষাক্ত প্রাণীর বিকাশ সে পার্টির অন্তঃসার কেমন। কিছুদিন পরে এই লোকটা সম্বন্ধে একটা গল্প শুনেছিলাম। সেটা আগে বলি, তারপর বলব আজকের কথা।
সেদিন বেলা দশটার হাজিরা দিতে স্কুলে আসছিলেন। উনি আসেন সাইকেলে। ওনাকে কে যেন বলেছেন, সাইকেল চালনা স্বাস্থ্যের পক্ষে একটা ভালো ব্যায়াম। তাই সব সময় সাইকেলেই চড়েন। বাড়ি থেকে স্কুলের দুরত্ব চার কিলোমিটার। দুবার আসা যাওয়ায় ভালোই ব্যায়াম হয়ে যায়। সেদিন এসে দেখেন বাইপাসে একটা মাল বোঝাই ভ্যান রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আর ভ্যান চালক একে তাকে ঠিকানা জিজ্ঞাসা করছে–গোপালনগর কিধার হ্যায় থোরা বাতা দিজিয়ে।
বাইপাশ থেকে সোজা পূর্ব দিকে আকাশের যতদুরে চোখ যায় এই সবটা জুড়ে ছিল একটা হোগলা বন–বড় বড় মাছের ভেরি। যার মালিক ছিল বিহারি মণ্ডল খগেন নস্কর পরিবার। সেই জমি কেড়ে সিপিএম পার্টি কিছু মৎসজীবী কিছু ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিলি বন্টন করে দেয়। এখন আবার ওই পার্টির লোক সেই জমি মৎস্যজীবী, ভূমিহীনদের কাছ থেকে নিয়ে ছোট ছোট প্লট করে বেচে দিচ্ছে।
যাদের উচ্চমূল্য দেবার ক্ষমতা আছে তারা সব উচ্চদামে ভাল প্লটগুলো কিনে নিয়েছে। যারা গরিব তারা চলে যাচ্ছে পথঘাট, জল বিদ্যুৎবিহীন গোপালনগর রানাভূতিয়া কাটিপোতা এইসব দিকে। গড়ে উঠছে গরিব মানুষের পাড়া। এখানে হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান আছে। বাঙাল, বাঙালি, বিহারি, উড়িয়া আছে। তবে সবই সেই খেটে যাওয়া মানুষ। এদের মেয়ে বউরা বাবু বাড়ি বা কোনো ছোট কারখানায়, কেউ কোন নার্সিংহোমে আয়ার কাজ করে। পুরুষেরা কেউ মিস্ত্রি, কেউ মজুর, কেউ রিক্সা চালায়। ভাড়া ঘরের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এরা একটা যেমন তেমন দোচালা বানিয়ে পুরো পরিবার নিয়ে তার মধ্যে মাথা গুঁজেছে। এই ভ্যান চালক তেমন কোনো পরিবারের ঘর গেরস্থালির মালপত্র কোন এক ভাড়া বাড়ি থেকে তুলে পৌঁছে দিতে চাইছে গোপালনগরে। সেই মালের মালিকের ঠিকানায়। সদ্য গড়ে তোলা গৃহে।
