তাছাড়া ওয়ার্ডে চাকরিটাও পুলিশে পায়নি। বয়স পার হয়ে গিয়েছে। আর অফিসার হতে হলে যে ডিগ্রি দরকার তাও সময় মতে যোগাড় হয়নি। এখন চাকরি করতে হচ্ছে ওয়ার্ডেনের। বাধ্য হয়ে মনের ক্ষোভ মনে চেপে রাখেন। আর মাঝে মাঝে তেমন সুযোগ হাতে এলে স্কচের নেশা তাড়ি দিয়ে মেটান। পদ ওনার যাইহোক-নিজেকে উনি মনে করেন সব পদের ঊর্ধ্বে।
যদিও এই স্কুলের সবাই কোন না কোনভাবে সিপিএম পার্টির সাথে যুক্ত, কেউ সরাসরি পার্টি করে, কারও দাদা কাকা মামা পার্টির নেতা, কেউ এসেছে কোন পার্টির কর্মীর পরিচয় সুত্রে। যে কারণে লোকে বলে বড় সাহেব এই স্কুলটা বানিয়েছে নিজের লোকদের করে কম্মে খাবার জন্য। বোবার সেবা–ওটা তো একটা ছুতো।
***
সে যাই হোক এই স্কুলের যিনি টিচার ইনচার্জ তিনিও এসেছেন দক্ষিণবঙ্গের এক তাবড় নেতার সুপারিশে। পদ এবং নেতার কারণে তার ধারণা হয়েছিল আমিই একমাত্র সেই ব্যক্তি যার কাছে বাঘ বশ করানো হান্টার আছে। সে জানত না অমন হান্টার সবাই লুকিয়ে নিয়ে ঘুরছে। দরকার পড়লেই চালাবে।
উনি যে পদে বর্তমানে আসীন ওনার আগে আর একজন ছিল। তখনও স্কুলের স্থায়ী ভবন নির্মাণ হয়নি। অন্যত্র অস্থায়ী ভাবে চালানো হচ্ছিল বোবা স্কুল। তখন থেকে তিনি ছিলেন ওই দায়িত্বে। এরপর স্থায়ী ভবন হল। সেখান থেকে স্কুলকে সরিয়ে আনা হল এখানে। আর তার কিছুদিন পরে কী যে হল–কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ ইস্তফা দিয়ে বাড়ি চলে গেলেন। শোনা যায় উনি সৎ, পরিশ্রমী, দরদী এক শিক্ষক ছিলেন। যে-কোনো ভাউচারে চেকে সই করার আগে খোঁজ নিতেন টাকাটা যথার্থ জায়গায় খরচ হচ্ছে কিনা। এর ফলে তার বিরুদ্ধে একটা চক্র গড়ে ওঠে। তারা ওনাকে অপমান, হেনস্থা করতে থাকেন। উনি একা, ওরা অনেক। তাই তাদের সঙ্গে পেরে না ওঠায় চাকরি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। শোনা যাচ্ছে বর্তমানে খুবই আর্থিক অনটনে আছেন। তবে আছে সেই সতোর সঙ্গেই। নিজের বিশ্বাসের প্রতি অমর্যাদা না করে।
আমি এখানে আসার কয়েক মাস পরে ঘটেছিল একটা ঘটনা। তখনও উনি ফোলানো বেলুনের উপর বসে আছেন। গ্রামবাংলার এক মফঃস্বল টাউন থেকে শহরে এসে মাথা ঘুরে গেছে ওনার। পুকুরের পোনা সমুদ্রে গিয়ে পড়লে যেমন হয়। আমি এই স্কুলের বড়দি-কত সম্মান আমার। অফিসে ঢুকছি, যে বসেছিল উঠে দাঁড়াচ্ছে, যে বিড়ি খাচ্ছিল বিড়ি লুকাচ্ছে। বেল বাজাচ্ছি–লোক ছুটে আসছে। ধমক দিচ্ছি সে কঁপছে। আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। উনি তখন নিয়ম করে রোজ কাউকে না কাউকে ধমকান ‘শোকজ করে দেব।
তখন পর্যন্ত উনি লোককে চমকানি দেন। নিজে চমকানি খাননি। উনি লোককে কাদান, নিজে কাঁদেননি। সে কাঁদবেন পাঁচ সাত বছর পরে–যখন বড়সাহেব তার একজন স্নেহধন্যাকে এখানে এনে শিক্ষিকার চাকরিতে ঢোকাবেন। সে তার ডিগ্রির জোরে এক সময়, তাকে অপসারিত করে টিচার ইনচার্জ হয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেবে। তখন এই বড়দি নিজের পোস্ট আঁকড়ে রাখার তাড়নায় এক ডিগ্রি প্রদান সংস্থায় গিয়ে ভর্তি হবে ছাত্রী হয়ে। আর পরীক্ষার সময় চোতা মারতে গিয়ে ধরা পড়ে যাবেন। তখন সেই সংস্থা থেকে ফোন করে বড় সাহেবকে জানাবেন–আপনার স্কুলের মাস্টার, একে কী করব? বড় সাহেব বললেন–আপনারা কিছু করবেন না, যা করার আমি করব।
এরপর তিনি একদিন টিচার ইনচার্জকে তার ঘরে ডেকে একটা পবিত্র ঝাড় দেবেন। আর তিনি একঘর অধস্তন কর্মচারির সামনে ঝাড় খেয়ে কাঁদবেন। লজ্জায় মাথা হেঁট করে থাকবেন। সেই যে ধোনা শুরু হবে। এরপর নানাবিধ কারণে মাঝে মাঝে বড় সাহেব ধুনতেই থাকবেন।
***
সেটা ছিল এক পনেরোই আগস্ট। আগের দিন টিচার ইনচার্জ বলে গেলেন শিক্ষক অশিক্ষক সব কর্মচারিকে সকাল আটটার মধ্যে স্কুল প্রাঙ্গণে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। পতাকা তোলা এবং স্বাধীনতা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হবে। যে উপস্থিত না থাকবে শোকজ করে দেব।
ওয়ার্ডেন সাহেব নিজের কাজের ক্ষতি করে আটটাতে এসে গেলেন স্কুলে। অন্যদিন দশটায় আসেন। একটা বিল্ডিং নির্মাণ চলছে, মিস্ত্রিমজুর খাটছে। সেখানে থাকাটা স্বাধীনতা দিবসের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এসে বসে রইলেন। এদিকে বড়দি আর আসে না। কেমন করে যেন তার ট্রেন ফেল হয়ে গেছে তাতেই বিলম্ব। তিনি এলেন পাক্কা চল্লিশ মিনিট দেরিতে।
চল্লিশ মিনিট। অর্থাৎ এক মিনিটকে ষাট দিয়ে গুণ করলে যত সেকেন্ড তত সময়। প্রাঙ্গণের পাশেই বড় সাহেবের বড় ছেলের ভাড়া খাটানো গোটা কয়েক গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। এত সময় বরবাদ হয়ে যাওয়ার রাগে একটা গাড়ির মধ্যে বসে ফুঁসছিল ওয়ার্ডেন। এমন সময় এলেন টিচার ইনচার্জ। চারদিকে তাকালেন। অনেককে দেখতে পেলেন তিনি কিন্তু ওয়ার্ডেন নজরে এল না। তিনি তাই স্বভাবসুলভ গ্রাম্যতায় গর্জে উঠলেন, অমুককে দেখছি না। আসেনি নাকি? একটা দিন আসতে পারল না। এ আমি সহ্য করব না।
আরও কিছু তিনি বলতেন হয়তো, বলা হল না। গাড়ির দরজা খুলে নীচে নেমে এল ওয়ার্ডেন। বিয়ের রাতে বেড়াল মারো নীতি গল্পটা তার জানা। বুঝল এই হচ্ছে সঠিক সময়, এবার বেড়াল মারা দরকার। ছয় আট মাস হয়ে গেছে উনি এখানে এসেছেন, বড় পদ পেয়ে নিজেকে বৃন্দা কারাত ভাবছেন। এখন সেই বেলুনে পিন ফোঁটানো দরকার।
