আর পশ্চিমবঙ্গে? এখানে বামফ্রন্টের সুশাসন চলছে। এখানে অনাহার তো বহুদুর–কিছু লোক অতি ভোজনে স্থলবপু হয়ে গেছে। এখন তারা বাড়তি ওজনের কারণে কঠিন সমস্যায় ভুগছে।
বিশ্বকবি বলেছেন–আমি দেখছি তাই চাঁদটা ওখানে আছে। না দেখলে নেই। বলেছেন আমার চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ।
ওনার ওই মহাপ্রাজ্ঞ বাণীর সমর্থন আমাদের ধর্মগ্রন্থেও পাওয়া যায়। যাহা নাই ভান্ডে তাহা নাই ব্রম্মান্ডে। এর সরল সোজা মানে–আমি যা জানি সেটাই সঠিক যা জানি না সেটা ভুল। তাহলে আমি যে জানি–আমার মতো বহু বহু মানুষ যারা নিজেরাই স্বীকার করে বামফ্রন্ট ক্ষমতা আসার আগে ভিখারির বাচ্চা ছিলুম, এখন তাদের ফ্রিজ ভর্তি খাবার পচে যায়। সে ক্ষেত্রে কী করে মেনে নেব না খেয়ে লোক মরে। সব ঝুট হ্যায়।
এখন পাকার মুড়ি চানাচুর ঢেকে ফেলেছে পত্রিকার পাতার সেই বামফ্রন্ট বিরোধী মিথ্যাচার। মুড়ি খাচ্ছে আর গল্প করছে কজন সুখী লোক। সেখানে গিয়ে কোনো ভনিতা না করে জানায় সেই দুঃখিত দাস-বড় সাহেব এ কারে নিয়া আইল আমাগো মইধ্যে! আমরা যারা আছিলাম, বেবাক আছিলাম একই রকম। একটা উটকা লোক। কী দরকার আছিল আনার।
কার কথা বলছ? জানতে চায় ওয়ার্ডেন।
ওই যে আইজ রান্নার কামে আইছে।
চেনো নাকি ওকে?
তিরিশ বছর আগে থিকা চিনি।
মুড়ির পরে গরম চা। আমি গরম চায়ের কেটলি নিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালে দুজনে তখনকার মতো কথা বন্ধ করে। তোমারে পরে সব কমু। জানিয়ে রাখে দাসদা।
***
০৯. ছয় লিটার দুধ
আমাদের দেশে এখনও অল্প কিছু লোক অবশিষ্ট আছে যারা বিশ্বাস করে অন্ধ আতুর বোবা খঞ্জদের দান করলে অশেষ পুণ্য হয়। সেই রকম এক সজ্জন বোবাদের জন্য রোজ ছয় লিটার দুধ পাঠায়। মাত্র ছয় প্যাকেট দুধে এত বাচ্চার কী হবে? তাই দুধটা নষ্ট না করে কিছুটা মাদার নিয়ে গিয়ে দই বসায়। কিছুটা রেখে দেয় সারাদিনের অসংখ্য কাপ চায়ের জন্য। আর তারপরে যেটুকু থাকে জল মিশিয়ে এক দুটো রুগ্ন বাচ্চাকে দেওয়া হয়।
আমি চা দিয়ে চলে যাবার পর আমার বিষয়ে যতটুকু সেই দাসদা জানে সব গুছিয়ে বলে দেয়। আর তখন আবার তিনজনে আলোচনা চলে–”কী করিতে হইবে”।
সেই ১৯৭৭ সালে যখন বামফ্রন্ট প্রথমবার ক্ষমতায় আসে এই রুনু গুহ নিয়োগীর আত্মা ভর করা ওয়ার্ডেনের বয়স ছিল আঠারো কুড়ি বছর। তখন থেকেই সে দেখে আসছে তার দুই এল.সি.এম. দাদাদের এলাকা জোড়া দাপট। যাদের মাথার উপর বিরাজমান প্রবল প্রতাপ বড় সাহেবের অভয় ছত্র। শুধু এরাই নয়, অন্য সব পার্টি কর্মীদেরও–পার্টি যেভাবেই হোক একটা পর একটা ভোটে জিতেছে আর তাদের বেড়ে গেছে দর্প দম্ভ অহঙ্কার। এক সময় তাদের মনে হতে থাকে যে, আমাদের পার্টির টিকিটে গরু ঘোড়া গাধা যাকেই ভোটে দাঁড় করানো হোক–জিতিয়ে আনতে পারি। পয়সা আর পেশি শক্তির উপর নির্ভরতা যত বেড়ে যায় জনগণের উপর তাদের ততো কর্তৃত্ব করার দমিয়ে রাখার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। শেষে এক সময় এমন মনে হয় মানুষ যেন লকআপে বসে থাকা কোনো কৃপাভিক্ষু আর পার্টির ছোট বড় নেতা কর্মী-সব যেন থানার ছোট বড় দারোগা। এই রকম এক পরিবেশে ওয়ার্ডেন বড় হয়ে ওঠে। সে দেখে আমি যদি কাউকে মারি দাঁড়িয়ে মার খায়। কাউকে যদি ধমকাই মাথা নীচু করে কাঁদে। যদি কারও কাছে বিড়ি চাই সে চা সিগারেট খাওয়ায়। যদি রিক্সায় চাপি রিক্সাঅলা ভাড়া চায় না, চায় দয়া কৃপা করুণা।
মানুষের মধ্যে আলো আছে, অন্ধকার আছে, শয়তান আছে, ‘ভগবান’ আছে। সে কাকে আশ্রয় করে এগুবে সেটা নির্ভর করে তার মানসিক গঠন–শিক্ষা সংস্কৃতি, বংশগতি, সহবত, রক্তের গ্রুপ এবং আরও বহু বিষয়ের উপর। তাই চম্বল নদীতে চান করলেও বহু মানুষ ডাকাত হয়
আবার অনেক মানুষ পুরোহিত পরিবারে জন্মেও জহুদ হার্মাদ হয়ে যায়। সবটাই নির্ভর করে স্থান কাল পাত্রের উপর। ধরা যাক কুখ্যাত পুলিশ অফিসার রুনু গুহ নিয়োগী যদি ওই চাকরিটা না পেতেন, যদি সরকার তাকে খোলা ছুট না দিত যদি নিজের পাড়ায় একটা মুদিখানা খুলে পেট পালতে হতো–সে কী তার বিকৃত প্রবৃত্তি চরিতার্থতার এমন লাগামহীন প্রয়োগ করতে পারত? পারত না। সেই সুযোগ নাগালে এনে দিয়েছিল তার চাকরি আর অনুকূল সময়। সে ইচ্ছেমত সেটাকে ব্যবহার করেছে।
মানুষকে মারায়, মানুষকে অত্যাচার করায় একটা অদ্ভুত আনন্দ আছে। সে জানত নাদিরশাহ, তৈমুর লঙ, হিটলার, পুলিশ অফিসার গুহ নিয়োগী। আর জানে এই ওয়ার্ডেন। সে কারণে তার বন্ধুরা তাকে রুনু নামে ডাকে। এই নামকে সে নিজের নামের সাথে সেই গর্ব অহঙ্কারে বহন করে চলে–যেমন ভাবে সুভাষ বোস ‘নেতাজি’, মোহন দাস গান্ধি বাপুজি’, স্যার আশুতোেষ বাংলার বাঘ’, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘গুরুদেব’ বহন করে গেছেন। তবে সেই সত্তরের দশক থেকে নব্বই দশকের শেষপাদ পর্যন্ত মনের সুখে বিরোধী ঠেঙাবার সুযোগ থাকলেও এখন আর তা নেই। সময়টা যে বদলে গেছে। এখন চারধারে আর বিরুদ্ধতা করার লোক নেই। সব সিপিএম। মালিক শ্রমিক জোতদার বর্গাদার বাড়িঅলা ভাড়াটে ধনি-দরিদ্র শোষক শোষিত শাসক শাসিত সবাই তাদের চিরকালীন আন্তঃ সম্পর্ক ভুলে, সংঘর্ষ মুলতুবি রাখে, এক পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে এক সুরে গান গাইছে।
