কিছু না। বিব্রত জবাব দাসের।
তবে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।
উনি কইলেন কান ধর। ধরলাম।
পরে শুনেছি, একা এই দাস নয়, এই রকম অকে বড় সাহেব কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখেন। ওঠবস করান। এটা তার একটা প্রিয় খেলা। সব ক্ষমতাবানদেরই এই রকম এক একটা প্রিয় খেলা থাকে। যা করে তারা মজা পান। মন ভালো করেন।
সত্যি মিথ্যা জানি না, আমি শুনেছি নবাব সিরাজউদৌল্লা নাকি হাজার দুয়ারির গবাক্ষ থেকে পাশের নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া নৌকার যাত্রীদের মৃত্যু দৃশ্য দেখতে খুব ভালোবাসতেন। সৈন্যরা তার নির্দেশে অকারণে বহু নিরীহ লোককে এই জন্য ডুবিয়ে মারে।
এখন আমার কেন জানিনা মনে হয় দাস মরে গেল। আত্মসম্মান হারিয়ে ডুবে গেল অবমাননার অতল তলে।
.
আমি যেদিন এই বোবা স্কুলে আসি আমার ধারণায় ছিল যাদবপুর থেকে এতদুরে এত বছর পরে আমাকে কেউ চিনবে না। সেটা ছিল ভুল ধারণা। এই দাস আমাকে চিনত।
সে যখন মাছ বাজারে এক মাছের দোকানে কাজ করত আমি সে সময় রিক্সা চালাতাম। যারা মাছের কারবার করে তাদের একটা অতি প্রিয় শব্দ আছে সেটা হল ডান্ডিমারা। সেই যে এক সময় কাঠের দাড়িপাল্লা ছিল তখন থেকে কথাটার প্রচলন। যার নিহিতার্থ–মাপে কম দেওয়া। সেই কাঠের ডান্ডার পাল্লাকে মাছ ব্যাপারীরা এমন শকুনির পাশার মত বশ করে ফেলেছিল যে চোখের সামনে তিন পোয়া মাছকে এক সের বানিয়ে দিতে পারত। কারো ক্ষমতা ছিল না ধরার।
এরপর এল কাটা পাল্লা। সেই পাল্লাকেও বশ করে নিল তারা। তবে কথাটা আর কাটামারা না হয়ে সেই ডান্ডিমারাই রয়ে গেল। কী রে খুব তো ডান্ডি মারলি, চা খাওয়া।
সেদিন সেই মাছের দোকানে এক অনুষ্ঠান বাড়ির জন্য প্রচুর মাছমাপা হচ্ছিল। বেশ প্রাণভরে ডান্ডা মারছিল সে। আমি সেখানে ছিলাম। হঠাৎ আমার চোখে পড়ে যায় পাল্লার তলার দিকে একটা ছোট চুম্বক সাঁটানো রয়েছে। ওজনে প্রায় একশো। ক্রেতাকে আমি সেটা দেখিয়ে দিই। তারপর যা হয় আর কী, দাসের বেইজ্জতির একশেষ। সেই দিন সে আমার মুখটা চিনে রেখেছিল। রিক্সা চালাতাম, ফলে পথেঘাটে বহুবার আমাকে দেখেছে। মনের মধ্যে একেবারে গেঁছে গিয়েছিল আমার মুখটা। তাই প্রথম দিনই আমাকে দেখে চিনতে পেরে গিয়েছিল। এই সেই বদমাশ। সেদিন ছিল তার দুটো দশটার ডিউটি, আমাকে দেখেছিল বিকেল চারটে নাগাদ। তখন থেকেই ছটফট করছিল কতক্ষণে আমার পরিচয় সবাইকে বলবে। মনোরঞ্জন–ওর আসল নাম মদন। শালা আগে রিক্সা চালাত। মহা বদমাশ। আমাদের ছেলেরা একবার ঝাড় দিয়েছিল।
রোজ রাত আটটায় স্কুলে একটা জমাটি আড্ডা বসে। সে আড্ডায় হোস্টেল সুপার থাকে, থাকে স্পোর্টস টিচার, ওয়ার্ডেন আর এক অন্য শিক্ষক। ইনি আবার বড় সাহেবের ডান হাত। হাত তার অনেকগুলো। প্রত্যেককে এক একটা এলাকার দায়িত্বে রাখা হয়েছে। এই হাত স্কুলের কাজকর্ম দেখাশোনা করেন। অনেক কটা নির্মাণ প্রকল্প চলছে। তৈরি হচ্ছে কয়েকটা বড় বড় বিল্ডিং। তার ইট, বালি, সিমেন্ট, রড কোথা থেকে কেনা হবে সে সব ভার তার। এছাড়া সে বড় সাহেব এখানে এলে, কখন কী লাগে না লাগে, কী বলে আর না বলে, তারই জন্য বড় সাহেবের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।
আজ অবশ্য আড্ডায় স্পোর্টস টিচার নেই। আর ওয়ার্ডেনও একটু আগে এসে গেছে। সাধারণত সে সাড়ে আটটার আগে আসতে পারে না। তাদের অনেকগুলো পারিবারিক ব্যবসা। প্রমোটারি, ক্যাটারিং, ক্যাডবেরির, মোবাইলের ডিলারশিপ। সব ভাইয়েরাই সামলায় তবে তাকেও কিছু কিছু দায় দায়িত্ব বহন করতে হয়। এই সব করে ডিউটিতে আসতে একটু দেরি তো হবেই।
তবে এটা ঠিক যে রোজ দু’বেলাই তিনি আসেন। প্রথম আসেন বেলা দশটা নাগাদ। থাকেন ঘন্টা খানেক। বাচ্চারা খেয়ে ক্লাসে চলে গেলে তারপর উনি বাড়ি যান। রাতে আসেন সাড়ে আটটায়। এবেলা থাকেন প্রায় দেড় ঘন্টা। বাচ্চারা খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লে দরজায় তালা দেওয়া হলে সেদিনের মতো শেষ হয় তার কাজ। এই দুবেলাই তিনি নিয়ম করে বাচ্চা গোনেন। দেখেন সব ঠিক আছে না কেউ পালিয়েছে।
শোনা যায় কোথায় কোন এক রাজার নাকি এক মন্ত্রী ছিল। যার কাজ ছিল নদীর ঢেউ গোনা। এখানে এক নেতার দুজন কর্মচারি আছে যাদের কাজ বাচ্চা গোনা। সেই রাজার গল্প শুনে লোকে যেমন বিশ্বাস করবে না সত্যিই তার এমন কোনো মন্ত্রী ছিল, না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। বোবা স্কুলে এমন এক ওয়ার্ডেন আছে। আছে একজন আয়াও। যাদের কাজ বাচ্চা গোনা।
আজ আকাশে গোলাকার পূর্ণিমার চাঁদ ছিল। এই চাঁদ ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে দেখা সেই ঝলসানো রুটি মার্কা চাঁদ নয়। এই চাঁদ বড় মোহ মদির আলো ছড়ানো মায়াবি চাঁদ। এক কিশোর কবি ঘুন ধরা বুকে গভীর যন্ত্রণায় কবিতায় একদা যে চাঁদের ছবি এঁকেছিল। যে কবিতা একদিন বামপন্থী পার্টির কর্মীদের মুখে মুখে ফিরত, সে কাল–অনেক কাল আগে কবরে গেছে। অনেক ভেবেচিন্তে তাকে কবরে দফন করা হয়েছে। আজকের চাঁদ চকচকে রূপোর টাকার প্রতিরূপ। এই চাঁদ তাই উচ্চাশা প্রিয় মানুষের উপাস্য। পার্টির অদৃশ্য প্রতীক।
সেই প্রিয় চাঁদের আলোয় বেঞ্চির উপর খবরের কাগজ বিছিয়ে তার উপর মুড়ি চানাচুর মাখা হয়েছে। সকালবেলা দিনের আলোয় একাগজখানা সব সিপিএম কর্মীর কাছে একটা বিরক্তির কারণ ছিল। প্রথম পাতাতেই পরিবেশন করেছিল একটা চরম মিথ্যা সংবাদ। আমলাশোলে অনাহারে নাকি মানুষ মারা যাচ্ছে। সব বকেয়াস। স্বাধীনতার পর এ দেশের কোথাও কোন লোক না খেয়ে মরেনি। মরলে মরেছে অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে। কেন ওসব খায়?
