একজন ধনবান আর একজন নিঃস্বনির্ধন, দুজন সেই পুরনো শ্রেণি দ্বন্দ্ব ভুলে অঙ্গহানি জনিত কষ্ট এবং সমস্যার কারণে এসে দাঁড়িয়েছে এক সংগঠনের ছাতার তলায়। একজনের দাবি রেলে প্রতিবন্ধীদের ভাড়া মুকুব করার। অন্যজনের? আমি ঠিক জানি না, হতে পারে রাজ্য সভায় প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন।
আমি এক প্রতিবন্ধী স্কুলে কাজ পেয়েছি।
এই স্কুলে চারজন দারোয়ান! একজন সেই বিহারি। যে এখনও কোনো বাসস্থানের ব্যবস্থা না করতে পারায় চব্বিশ ঘন্টাই স্কুলে থাকে। হোস্টেলে খায়, অফিস ঘরে ঘুমায়।
একজনের নাম পালদা, তার বাড়ি যাদবপুর স্টেশনের দক্ষিণদিকে এক পাড়ায়। লোকটা খুবই সাদাসিধা কারও কোনো সাতে পাঁচে থাকে না। আসে, ডিউটি করে, চলে যায়। লোকটার ছোটবেলায় পোলিও হয়েছিল। সেই রোগে শরীরের একটা দিক পঙ্গু হয়ে গেছে।
আর একজন-এর নাম সাহা। সে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ থেকে দালাল ধরে চোরা পথে ভারতে এসেছিল। তখন এক ভাড়া বাসায় থাকত আর মজুরের কাজকর্ম করত। সে কেমন করে কী ভাবে কে জানে একদিন পৌঁছে যায় বড় সাহেবের প্রাসাদোপম ভবনে। যেখানে কাজ পেয়ে যায় বাগান পরিচর্যার। চালাক লোক। বুঝতে পারে এই সাহেবকে ধরে থাকলে বিদেশ বিভূঁইয়ে কোনো বিপদ আপদ স্পর্শ করতে পারবে না। পাসপোর্ট নেই ভিসা নেই এদেশের ভোটার লিস্টে নাম নেই রেশন কার্ড নেই। সব নেই আছে হয়ে যাবে, যদি বড় সাহেবের কৃপাদৃষ্টি পড়ে। ইতিহাস বলে হজরত মহম্মদ, আকবর বাদশা, বীর শিবাজী, রামকৃষ্ণ পরমহংস এনারা সব নাকি সেই অর্থে শিক্ষিত ছিলেন না। তবু তাদের কেউ নির্বোধ বলতে পারবে না। বিদ্যা বুদ্ধিতে এরা যে কোন বোদ্ধার চাইতে শ্রেষ্ঠ মহান।
ওই বাংলাদেশী সাহাও জীবনে সাক্ষরতা মিশনের কোনো ক্লাশে একদিনও যাবার সদিচ্ছা দেখায়নি। তবু তাকে বোকা বা অশিক্ষিত বলা যাবে না। জীবনের যে শ্রেষ্ঠ পাঠ তা পেয়েছে জীবনেরই কাছ থেকে। হিন্দিতে একটা কথা আছে–চাহে মরদ বনো ইয়া তো মরদকা বনকে রহো। যদি তুমি সমাজে যোগ্য হতে পারে অতি উত্তম। যদি তা না পারো একজন শীর্ষস্থানীয় কারও পদপ্রান্তে বসে পড়ো, শরণাগত হও। সমস্যা কেটে যাবে। বুদ্ধিমান সাহা তাই করেছিল। সেবা-আনুগত্যে হৃদয় জয় করে ফেলেছিল বড় সাহেবের। তার ফল মিলেছে হাতে হাতে। চাকরি পেয়ে গেছে এই স্কুলে। নদীর ওপারের এক গ্রাম্য স্কুল থেকে এসে গেছে একখানা অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ মার্কসিট। এখন সে রাত দশটায় স্কুলে আসে। বিছানা করে পাখা চালিয়ে শুয়ে পড়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে আগে যায় বড় সাহেবের বাড়ি, কিছুক্ষণ সেখানে থাকে। কিছু ফাঁই ফরমায়েস ঘাটে। তারপর নিজের বাসায়। বেশ সুখে আছে সে এদেশে এসে।
অন্যজনের নাম দাসদা, সে আগে এক মাছের দোকানে কাজ করত। আরও আগে বালক বেলায় বড় সাহেবের সাথে এক স্কুলে একই ক্লাসে পড়ত। তারপরে এক সাথে পাটি করেছে, বাহাত্তরে পাড়া ছেড়ে পালিয়েছে এক সাথে। ভাগ্য খারাপ সে এখনও রয়ে গেছে পার্টির এক সাধারণ সদস্য হয়ে আর বড় সাহেব তরতর করে উঠে গেছেন একেবারে শীর্ষে। সে জন্য তার মনে পার্টির প্রতি একটা চাপা রাগ আছে। কী পেলাম এত বছর পার্টি করে। শেষকালে এই বুড়ো বয়সে একটা দারোয়ানের চাকরি। ছ্যাঃ
শোনা যায় যখন সিরাজদৌল্লা নবাব হন, প্রথম দিনই ডেকে পাঠান তার বাল্যকালের শিক্ষককে। নবাবের ডাক পেয়ে বৃদ্ধ শিক্ষিত তো মহাখুশি। ভাবলেন সিরাজের জীবনে আজকের দিন সবচেয়ে আনন্দের দিন। এই দিনে আমাকে ডাকছে নিশ্চয় কোন পুরস্কার দেবে, সম্মান জানাবে। কিন্তু একি। যেই সেই শিক্ষক গিয়ে দরবারে দাঁড়ালেন, নবাব সিরাজ তার গালে কষিয়ে দিলেন পেল্লায় এক চড়। কী? না, কবে সেই শিক্ষক সিরাজকে চড় মেরেছিলেন তারই প্রতিশোধ।
কে জানে বড় সাহেবের এককালের বাল্যবন্ধু দাসের উপর কী কারণে খুব রাগ। হতে পারে সেই বালক বেলায় কিছু একটা হয়েছিল। এখন বড় সাহেব তার বদলা নেন। তিনি মাঝে মাঝে তাই দাসকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখে দেন।
আমি এই বোবা স্কুলে রান্নার কাজে বহাল হয়েছি তখন প্রায় এক মাস হয়েছে। এখন পর্যন্ত জনা চল্লিশ বাচ্চা ভর্তি করা হয়েছে। বলা হয়েছে সর্বমোট পঞ্চাশজনকে রাখা হবে।তাদের খাওয়ানো দাওয়ানোর দায়িত্ব আমার। খোঁজ চলছে, পাওয়া গেলে আমাকে একজন সহকারি দেওয়া হবে। দিন কয়েক আগে একজন এসেছিল। সে উড়িয়া রাঁধুনি, বড় সাহেবের চেনা। সে ঘন্টা খানেক ঘুরে ঘুরে কাজের জায়গায় পরিবেশ, কর্মচারিদের আচার ব্যবহার প্রত্যক্ষ করে যা বোঝার তা বুঝে ‘আসছি’ বলে সরে পড়ে। আর আসে না। বাধ্য হয়ে আমি এখনও একাই বঁদির গড় রক্ষা করে চলেছি।
.
রান্নাঘর তিনতলার ছাদে।বাথরুম একতলায়।দুটো সর্বসাধারণের জন্য। একটা বড় সাহেবের আলাদা। সেটায় তালা মারা থাকে। উনি এলে তালা খোলা হয়। আজ উনি এসেছেন। বাথরুমের তালা খোলা হয়েছে। উনি বড় বাথরুমে গেছেন।
আমারও বাথরুমে যাবার প্রয়োজন। ছাদ থেকে নীচে নেমে দেখি অনেক লোক। সব বড় সাহেবের কাছে এসেছে। আর এককোণে কান ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দারোয়ান আধবুড়ো দাসদা।
একজন লোক যার বয়স কবে ষাট পেরিয়ে গেছে, যদিও চাকরি পাবার প্রয়োজনে কোনো স্কুল থেকে যে সার্টিফিকেট বানানো হয়েছে তাতে বয়স তিরিশ বত্রিশ। সেই বুড়ো লোকটা কান ধরে স্কুলের দুষ্টু বাচ্চার মতো দাঁড়িয়ে আছে দেখে আমি হাসব না কাঁদব ভেবে পাই না। জানতে চাই–কী হয়েছে দাসদা?
