কিন্তু সেই সব নেতা, যারা নারীবাদী আন্দোলনের দিকে ঝুঁকেছে, তারা তো শ্রেণি সংগ্রাম চায়। চায় শ্রেণি সম্বন্বয়। তাই খানিকটা আবেগ খানিকটা সুড়সুড়ি খানিকটা নাটুকে দরদ গলায় ফুটিয়ে জনমানস তাতিয়ে তোলার তাড়নায় মঞ্চ গড়ে মাইক বেঁধে গলার শিরা ফুলিয়ে হাঁক পাড়ে নারী শক্তি জিন্দাবাদ। নারীরা সব ওঠো, জাগো। পুরুষতন্ত্রের অত্যাচার মেনে নিও না। সংগ্রাম করো সাবলীল হও, স্বাধীন হও।
এর ফলে ধনী আর দরিদ্রের যে ব্যবধান তা আর থাকে না। সব বিভেদ বিদ্বেষ মুছে যায়, অনৈক্য দূর হয়। বণিক বাড়ির সেই স্বামী দ্বারা নিগৃহীত মহিলা যে লিমুজিন কার-এ চেপে পাঁচ হাজার টাকা দামের শাড়ি পরে কোন পাঁচ তারা হোটেলে ক্যান্ডেললাইট ডিনার সারে। আর খালপাড়ের সেই বাবুবাড়ির বাসন মাজা, ঝুপড়ি ঘরের মেয়েছেলেটা, যার রিকশাওলা বর মদ খেয়ে রোজ তাকে পেটায়, দুজনে এক মিছিলে হাঁটে একই শ্লোগান দিয়ে–পুরুষতন্ত্র মুর্দাবাদ।
তখন সেই ঝি মেয়েছেলেটার আর মনেও থাকে না, যে বাড়িতে সে বাসন মাজে সেই বাড়ির এই রকম এক বিত্তবান গৃহিনী তার স্বামীর কাছে যা অত্যাচার পায় তার দশগুণ তাকে ফিরিয়ে দেয়। তখন তার মনেও থাকে না যে সে এক মহিলা। আর যাকে সে নিপীড়ন করছে সে-ও তাই।
নারী আন্দোলনের আর একটা প্লাটফর্ম গড়া হয়েছে যৌনকর্মীদের নিয়ে। যৌনকর্মী নামটা হালফিলের। এর আগে বেশ্যা রেন্ডি বারবণিতা খানকি এমন সব শতাধিক নাম ছিল এদের। এই সব মেয়েদের নিয়ে গড়া সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে আর পাঁচটা পেশা–যেমন নার্স, আয়া, রাধুনি, পরিচারিকা, কারখানার কর্মী এদের মতো তাদের পেশাকেও একটা সামাজিক স্বীকৃতি দিতে হবে। পুলিশি ধরপাকড় চলবে না। মাস্তান, বাড়িউলি এবং অভদ্র কাস্টমার–এদের জুলুম থেকে সরকার তাদের রক্ষা করার ভার নেবে। নিয়মিত ডাক্তারি পরীক্ষা, বিনামুল্যে ঔষধপত্র এবং বিমা সেবা প্রদান করতে হবে।
এ অতি মানবিক দাবি। এ দাবির বিরোধিতা করার প্রশ্নই ওঠে না। তবে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সুচারু রূপে সেই কাজটি সুসম্পন্ন করা যাচ্ছে। তা হল ওই শ্রেণি সমন্বয়। এখন বিলাসবহুল নামী হোটেলে রাত্রি যাপন করা সেই যৌনকর্মী যার মজুরি পঁচিশ-পঞ্চাশ হাজার আর হাড়কাটার গলিতে দাঁড়ানো পঁচিশ-পঞ্চাশ টাকার খেদি এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে একই সরণিতে। দুজনেই আকাশে হাত ছুঁড়ছে–পুলিশি জুলুম বন্ধ কর। ন্যায্য পারিশ্রমিক দাও। সামাজিক স্বীকৃতি দাও।
এই রকম আর একটি আন্দোলন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে গড়ে তোলা হয়েছে খেলা নিয়ে। এ খেলা রাজার খেলা, খেলার রাজা–নাম ক্রিকেট। আলালের ঘরের এগারো জন দুলাল একটা বল আর একটা কাঠের তক্তা দিয়ে যা খেলে। যখন এই খেলা চলে–টেলিভিশন-পত্রিকায়-রেডিওতে এমন মাতামাতি শুরু হয় যেন দেশে আর কোন সমস্যাই নেই। বেকার সমস্যা মিটে গেছে। দ্রব্যমূল্য কমে গেছে।বন্ধ কলকারখানা খুলে গেছে। আর আমলাশোলে কেউ না খেয়ে নেই। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে।
ক্রিকেট খেলা যখন চলে, তখন শুধু খেলা চলে। যখন খেলা চলে না, রাজনীতি চলে। একবার ইণ্ডিয়ান টিম থেকে এক বঙ্গ সন্তান বাদ পড়েছিল। তা নিয়ে তখন বিধান সভায় পর্যন্ত আলোচনা হয়। পানীয় জল নেই, বিদ্যুৎ নেই, বিপিএল কার্ড নেই, একশো দিনের কাজ নেই, ও সব পরে–আগে খেলা।
সারাদেশকে এই খেলায় এমন মাতিয়ে দেওয়া গেছে যে নিঃশব্দে এখানেও ঘটে গেছে শ্রেণি সমন্বয়। সৌরভ গাঙ্গুলি দল থেকে বাদ গেলে সল্টলেকের সেই মূল্যবান বাড়ির বাসিন্দা যেমন গর্জে ওঠে–এটা অন্যায়, সমস্ত বাঙালি জাতির প্রতি অবিচার। গর্জায় রেল লাইনের ধারের ঝুপড়িবাসি–আমাগার ময়রাজারে নেয়নে, ঠিক করেনে।
এই শ্রেনি সমন্বয়ের এক অপূর্ব নিদর্শন দেশজোড়া উথাল পাতাল দলিত আন্দোলন। আর কেউ নয়–শুধু উচ্চবর্ণ মানুষেরাই আমাদের সব দুর্ভোগ সব অপমানও পিছিয়ে পড়ার কারণ। চাকরি বাকরি ব্যবসা রাজনীতি শিল্প সাহিত্য সব কিছুতে আমাদের বঞ্চিত করে, দখল করে নিয়েছে মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণ। ওদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হবে। কেড়ে নিতে হবে অধিকার। এই আন্দোলনও কিছু মানুষকে নেতাগিরির ব্যবসা চালানো ধূর্ত লোকের পাশে-পিছনে এনে দাঁড় করিয়েছে। তারা জানে না যে ব্রাহ্মণ্যবাদ আসলে পুঁজিবাদেরই খণ্ডিত রূপ। যার বৃহৎ এবং বিকশিত রূপ সাম্রাজ্যবাদ। যদি সঠিক নেতৃত্বে সঠিক দিশায় পুঁজিবাদ বিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করা হয়–সব শোষণ আপনা আপনি মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। তা জানা না থাকায় এই দলিত আন্দোলনের যে নেত্রী–কোটি কোটি টাকার মালকিন সেই চামার কি বেটি–আর রাস্তার মোড়ে বসে জুতায় পেরেক ঠোকা রুইদাস হয়ে গেছে এক লড়াইয়ের সহযাত্রী। কিন্তু যদি কোনদিন রুইদাস তার বহিনজির বাড়ি যায়–ভিতরে ঢুকতে পারবে না, যতই এক জাত হোক। ঢুকবে সে যার চেহারায় চটক থাকবে। জাত যাই হোক।
এই রকম আরও একটি দুটি সংস্থা বা সংগঠন গড়া হয়েছে প্রতিবন্ধী মানুষজনদের নিয়ে। এই সব কর্মকাণ্ডের মূলেও রয়েছে সেই শ্রেণি সমন্বয়। বহুতল বাড়ির বিত্তবান সেই বাসিন্দা, হতে পারে যার একটা পা বা একটা হাত প্লেন দুর্ঘটনা বা দামি মোটরকারের রেসে খোয়া গেছে। আর অন্য একজনের পা বা হাত গেছে সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে কুমির কামটের ধারালো দাঁতে অথবা কাঠ বা মধু সংগ্রহ করতে গভীর জঙ্গলে গিয়ে বাঘের থাবায় কিংবা কামড়ে।
