কিছুকাল আগে সারা পৃথিবী জুড়ে সাম্যবাদ স্থাপনার একটা জোয়ার এসেছিল। শ্রমিক কৃষক ছাত্র যুবক ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই আন্দোলনে। যার রেশ আমাদের দেশেও এসে পৌঁছেছিল। উত্তাল হয়ে উঠেছিল আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু সেই আন্দোলন কয়েক বছর যেতে না যেতে ক্রমে নির্জীব হয়ে গেছে। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক এর অনেক কটা কারণ আবিষ্কার করেছেন। তবে সবচেয়ে বড় কারণ যেটা তা হল ওই আন্দোলনের বড় নেতারা মনে প্রাণে কেউ সাম্যবাদী ছিলেন না। ছিল না তাদের সত্যিকারের জনদরদ আর আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা। আসলে এরা ছিল ক্ষমতালোভী উচ্চাকাঙ্খী ভ্রষ্ট রাজনেতা। ক্ষমতা হাতে পেয়েই এদের পা ভোগবাদের বিষ্ঠা গহ্বরে পতিত হয়েছিল। এরা হয়ে উঠেছিল দর্পী দম্ভী অহঙ্কারী আর অত্যাচারী। তাই অন্য দেশ তো দুরের কথা, ভেঙে গিয়েছিল বার্লিনের প্রাচীর, পতন ঘটেছিল সাম্যবাদীদের তীর্থভূমি সোভিয়েত রাশিয়ার। সে দেশের সাধারণ মানুষ লেনিনের মুর্তি পর্যন্ত ভেঙে গুঁড়ো, গুঁড়ো করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল।
কিছু লোক আছে যারা চাকরি করে, ব্যবসা করে বা বিশাল পৈত্রিক সম্পত্তি আছে। তারা নিজের কাজ সামলে অবসর সময়ে রাজনীতি করে। এদের রাজনৈতিক জোয়ার ভাটা অগ্রগমন বা পশ্চাদপসারণ পদ গ্রহণ বা পদ বর্জনে মূল ক্ষমতার বিশেষ একটা তারতম্য ঘটে না। কিন্তু যাদের রাজনীতিটাই চাকরি ব্যবসা সম্পত্তি সবকিছু তাদের পাশে-পিছনে জন জমায়েত হ্রাস পেলে তার অস্তিত্বেরই সংকট দেখা দেয়। প্রাপ্তিসুখের ভাঁড়ারে টান পড়ে।
আগে যখন বিশ্বজোড়া মার্কসবাদ লেনিনবাদের মোহময় বিস্তার ছিল, শ্রমিক কৃষক ছাত্র যুবাদের শ্রেণিসংগ্রাম, বিপ্লব, শোষণমুক্ত সমাজ এই সব খুড়োর কল ঝুলিয়ে আশেপাশে জন। জমায়েতকরা নেতাদের পক্ষে খুবই সহজ ছিল। কিন্তু এখন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর উল্টোযাত্রার ঢেউ এদেশেও এসে পড়েছে। এখন আর শ্রেণিসংগ্রাম বলে মানুষকে চেতানো যাচ্ছে না। বিশ্বায়নের এই যুগে আগেকার সে শ্লোগানও তার প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলেছে।
আগে আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিষ্ট পার্টির উঁচুতলার কিছু নেতাকে বাদ দিলে মাঝারি বা ছোট নেতাদের সবারই আগমন ঘটেছিল শোষিত বঞ্চিত দরিদ্র পরিবার থেকে। ফলে তখন তাদের সত্যিই শোষক এবং তাবেদার শাসক শ্রেণির প্রতি চরম ঘৃণা আর শোষণহীন সমাজ গড়ার একটা আন্তরিক আকুলতা ছিল। কিন্তু এখন বঙ্গে পাকেচক্রে কমিউনিস্টরা শাসন ক্ষমতায় পৌঁছে সুদীর্ঘকাল শাসন ক্ষমতায় টিকে যাওয়ায় এই দলের বড় মেজ সেজ ছোট কোন নেতা কর্মী আর দরিদ্র নেই। প্রমোটারি, দালালি, ঠিকেদারি, তোলাবাজী করে সব টাকার পাহাড় জমিয়ে ফেলেছে। এমন অবস্থায় তাদের আর পুঁজিবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রতি কোন আগ্রহ নেই। কে আর কালিদাস হতে চায়। যে, যে ডালে বসবে সেই ডাল কাটবে।
এখন বিপ্লব হলে তাদের পাবার কিছু নেই, হারাবার অনেক কিছু আছে। তাই তারা বিপ্লব নয়, চায় যেন তেন প্রকারে ক্ষমতায় টিকে থাকতে। এর জন্য নৈতিক অনৈতিক যে কোন পথ পন্থা গ্রহণে এদের আপত্তি নেই।
সেটা এরা সুচারুরূপে করেও থাকে। কে লোকটা? বিরোধী দলের! দে ওর নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে। আর এই লোকটা? আমাদের। এর নাম চার কেন্দ্রে লিস্টে তুলে দে। এক কেন্দ্রে ভোট দিয়ে আসবে, ক্যামিকেল দিয়ে আঙুলের দাগ তুলে দিবি, আর এক কেন্দ্রে চলে যাবে ভোট দিতে। আর এই লোকটা? ঠিক বোঝা যায় না আমাদের না ওদের। ওকে বলে দে, আমাদের বিরোধী দলের বোতামে সেন্ট দিয়ে রাখা আছে। যদি আঙুল ঠেকায় গন্ধ পাওয়া যাবে।ভোট দিয়ে যাবার সময় যেন আঙুল শুকিয়ে যায়। যদি গন্ধ পাই রে….! আরে ওকে? ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে কেন! বলে দে বাড়ি চলে যাক, ওর ভোট পড়ে যাবে। যদি না যায় বন্দুক দেখা। বউকে থান কাপড়ের কথা বল। এমন আরো শতেক রকম ফন্দি ফিকির।
ভোট মানে যুদ্ধ। যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য ছলে বলে কলে কৌশলে জয়। আর কিছু নয় একমাত্র বিজয়। রক্তের নদী বয়ে যাক, লাশের পাহাড় জমুক কোন পরোয়া নেই, জয় পেলেই হবে।
তবে এটা ঠিক যে একমাত্র নির্বোধ ছাড়া আর কেউ এমন ধারণা পোষণ করে না যে মানুষ সবদিন এই দমন-পীড়ন-ভয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে থাকবে। কোনদিন মাথা উঁচু করে সামনে হেঁটে যাবে না। যাবে, যায়। যায় যে তার প্রমাণ ২০১১।
জাহাজ ডোবার আগে যেমন ইঁদুরেরা টের পায়, তেমনই যারা রাজনীতি দ্বারা করে কম্মে খায় তারা সমাজদেহের অভ্যন্তরে অন্তঃশীলা ফল্গুর চোরাস্রোত অনেক আগে ধরতে পেরেছিল। তাই তারা সংগোপনে শুরু করে দিয়েছিল শ্রেণি সমন্নয় ও জনসাধারণকে নিজের বৃত্তে আবদ্ধ রেখে নেতাগিরির ধান্দা চালিয়ে যাবার কাজ। এই পদ্ধতির একটার নাম নারীবাদ।
যার হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে যায়, সে যে দুর্বল অক্ষম অসহায় মানুষকে নিপীড়ন করে–এটা হাজার হাজার বছরের প্রচলিত সত্য। রাষ্ট্র দেশের জনগণকে, মালিক শ্রমিককে, জমিদার তার প্রজা-কৃষককে, পুরুষ নারীকে, গৃহকর্তা বা কর্তী বাড়ির কাজের লোককে।
একটা বাড়ি যেমন দাঁড়িয়ে থাকে চার কোণের চার পিলারের ক্ষমতায়, এবং বাড়িটা ভেঙে ফেলতে হলে ওই পিলারগুলো ভাঙা দরকার। যা দাঁড়িয়ে আছে এই ধনবাদী রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় অটল পাহাড় হয়ে। যদি কেউ নারীকে নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতে চায়, তবে তাকে স্বাধীনমুক্ত স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ওই ব্যবস্থাটাকে অটুট রেখে করা সম্ভব নয়। আর সেটা করতে হলে সেই দাড়িওলা বুড়ো লোকটার দর্শনের শরণাপন্ন না হয়ে অন্য কোন উপায় নেই। গোদা বাংলায় যার অর্থ বিপ্লব। এ ছাড়া হবে না।
