এ এমন এক ঘর, এ ঘরে যে সব মানুষ বাস করে নত হতে হতে সারা জীবনের মতো বেঁকে যায়। আর সেই বাঁকা মেরুদণ্ড সোজা করে কোনদিন উঠেদাঁড়াতে পারে না। রেল বস্তি খালপাড়ের এই সব ঘরে সুশিক্ষা সুস্বাস্থ্য সভ্যতার কোন আলো অনুপ্রবেশ করতে পথ পায় না। তাই মানুষ বুনো হয়ে যায়, মানবেতর প্রাণী হয়ে যায়।
আর মাত্র কয়েকটা বছর, বছরও নয়, মাস, তারপর চাঁদের মাটিতে পড়বে পৃথিবীর মানুষের পথচিহ্ন। বিজ্ঞানের জয় জয়কার হবে। আর সেই পৃথিবী গ্রহের আর একদল মানুষ ক্রমে পিছোতে পিছোতে পরিণত হয়ে যাবে ইঁদুরতুল্য এক গর্তবাসী জীবে।
সে সময় দিনে দিনে গ্রামবাংলায় আকালের হা মুখ এতখানি প্রশস্ত হল যে সরকার মৌনিবাবা হয়ে বসে থাকলেও দয়ালু মানুষের পক্ষেচুপ হয়ে থাকা সম্ভবপর হয়নি। তারা বেশ কিছুসমাজসেবী সংস্থার মাধ্যমে কিছু কিছু স্থানে লঙ্গরখানা খুলেছিল। চাল ডাল গমের কুচি মিলিয়ে তা দিয়ে পাতলা খিচুড়ি বানিয়ে এক এক হাতা মেপে বিলানো হয়েছিল বুভুক্ষু মানুষের মধ্যে। সেই এক হাতা খিচুড়ির জন্য এক দেড় মাইল লম্বা লাইন পড়ে যেত। সূর্য ওঠার সময় লাইন দিয়ে সূর্য মাথার উপর এলে খিচুড়ি মিলত। তাও দিনে মাত্র একবার। দিন দশ পনের চলবার পর সে লঙ্গরখানা বন্ধ হয়ে যায়।
একটু পরের কথা আগে বলা হয়ে গেল। ফিরে যাই ৬৪ সালে। আমার বাবা সে সময়ে যাদবপুরে মজুরের কাজে যেতে শুরু করেছিলেন। তখন দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুরের বহু অঞ্চল দখল করে একের পর এক জবর দখল কলোনি গড়ে উঠেছিল। দখলকারীরা উচ্চবর্ণ কায়িকশ্রমে পরাজুখ বাবুশ্রেণির মানুষ। কাজেই তাদের ঘরবাড়ি পথঘাট নির্মাণে চিরকালই যাদের সহায়তা নিতে হয়, সেই নমঃ পোদ কাওড়া বাগদি মুসলমানদের এখানেও সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
এটা একটা ওকে কী বলে–উলঙ্গ সত্য, যে, সে সরকার পক্ষই হোক বা বিরোধী পক্ষ সব দলের শীর্ষে বসে আছে একমাত্র উচ্চবর্ণের লোকেরা। যারা সেই বেদের কালের বর্ণঘৃণায় এখনও আচ্ছন্ন। সেই ঘৃণ্য মানসিকতার কারণে ক্যাম্পবাসী নিম্নবর্ণের মানুষদের প্রতি সেদিন যতটা নির্মম নির্দয় অমানবিক ব্যবহার করেছিল, নিজের আপন আত্মীয় স্বজাতির জবরদখলকারীদের প্রতি ততটা হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গের জবরদখল কলোনি পত্তনের দিকদিশারী–সর্ব প্রথম জবর দখল কলোনির নাম বিজয়গড়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদের জন্য ইংরেজ সরকার এদেশীয় জমিদারের কাছ থেকে বিশেষ এক আইন বলে এই বিশাল মাপের জমিটা অধিগ্রহণ করে। ফলে এই জমির উপর জমি মালিকানার কোন আইনি অধিকার দেশীয় ভূস্বামীদের আর ছিল না। যুদ্ধ শেষ হবার পর মার্কিন সেনা দেশে ফিরে যায়, আর শহর কলকাতার মধ্যে বিশাল ওই ভূ-ভাগ যেটা বহুমূল্যবানও বটে, সেটা খালিই পড়ে থাকে। যেহেতু এখানে মিলিটারি ক্যাম্প ছিল পথঘাট জল বিদ্যুৎ আবাগমন সুবিধা সবকিছু উন্নত ছিল। এক দু কিলোমিটারের মধ্যে দু দুটো বাস রুট, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস–কী ছিল না?
এই জমি জনৈক সন্তোষ দত্তের নেতৃত্বে দখল করা হয় এবং যে কলোনি এশিয়া মহাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম কলোনির স্বীকৃতি পায়। প্রথমটির সম্মান থাকে ইজরাইলের ললাটে।
যখন এই জবরদখল ঘটে, সরকারের পক্ষ থেকে কোন বাধা তো আসেইনি উপরন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৎকালিন মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়, রাজ্যপাল মি. কাটজু, ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহেরু, মেজর জেনারেল সত্যব্রত সিংহ, এ ছাড়া ত্রিগুণা সেন, সমর মুখার্জী, সরোজিনী নাইডু, সহ বহু বড় বড় মানুষ স্বজাতি প্রেমে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে অভয় বাণী দিয়ে গেছেন। যাদের প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী অভয় দেন, তাদের এমন কে আছে যে একটা চুল ছিঁড়ে নেয়?
নিম্নবর্ণের মানুষদের জন্য কার বুকে এমন উথলে ওঠা দরদ ছিল? আজ যখন এই ঘটনার পাশে রেখে মরিচঝাঁপির সেই পৈশাচিক হত্যালীলার বিচার বিশ্লেষণ করতে যাই ক্রোধে দিশেহারা হয়ে পড়ি, কোন হিসাব মেলাতে পারি না। একই কারণে একদেশ থেকে একই সময়ে বিতাড়িত একদল মানুষ। যাদের একদলকে জামাই আদরে কলকাতা শহরের মধ্যের বহুমুল্য জমি বিনা বাধায় দিয়ে দেওয়া হল। আর একদল মানুষকে সুদূর সুন্দরবনের এক দ্বীপ মরিচঝাঁপির নামমাত্র মূল্যের জমি থেকে নৃশংসতায় হত্যা ধর্ষণ অগ্নি সংযোগে লুঠপাট দ্বারা ভীত সন্তস্ত্র করে উৎখাত করে দেওয়া হল। প্রায় তিরিশ হাজার পরিবার গিয়েছিল সেখানে বসবাস করবার জন্য, যাদের দু হাজার মানুষের আজও কোন হদিশ মেলেনি। এর মধ্যে কতজনকে বাঘের পেটে কত জনকে কুমিরের পেটে আর কতজনকে পাথর বেধে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে তা কেউ জানে না। আমার বাবাও গিয়েছিলেন ওই চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হত্যাকারীদের উল্লাসভূমি, মরিচ ঝাঁপি দ্বীপে। বুকের হাড় ভেঙে গিয়ে ছিল তার। সে লোমহর্ষক কাহিনী পরে বলব।
এখন একটাই প্রশ্ন, শাসকশ্রেণি দু দল মানুষের প্রতি এই দু-ধরনের মনোভাব কেন দেখিয়ে ছিল? এর পিছনে রয়েছে সেই চিরকালীন বর্ণঘৃণা। ওই মানুষগুলো যদিনমঃ পোদ জেলে না হয়ে বামুন কায়েত বদ্যি হতো, সে যে সরকার তোক কোনদিন এদের উপর এমন পাশবিক অত্যাচার চালাতে পারত না, তখন কলজে পড়ত।
