উনি সেই কাপটা তুলে কেটলি থেকে সামান্য চা ঢেলে কাপটা দুবার গোল গোল করে ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন অর্থাৎ কাপটা ধুয়ে নিলেন। এরপর তাতে চা ঢেলে এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। নাও চা খাও। আমি আজই এসেছি তাই এখনও এই কাপটার জীবন যাপন জানি না। সেটা জানব দুদিন পরে। কিন্তু এখন যে অনাদর আর অবজ্ঞায় চা দেওয়া হল তাতে মনটা তেতো হয়ে গেল আমার।
মনকে বোঝাই ওরে পাগল দুঃখ করিস না। নীলকণ্ঠ হ, গরল গিলতে শেখ। দেখবি তোর পাকস্থলিতে পড়ে গরল অমৃত হয়ে যাবে একদিন। তোর মতো কত মানুষ ডাস্টবিন খুঁটে খেয়ে বেঁচে থাকে। যদি বাঁচতে চাস সবকিছু খেতে শেখ। তা না হলে খিদে তোকে খেয়ে নেবে।
***
অনুর বেতন এখন বেড়ে চারশো পঁচাত্তর টাকা হয়ে গেছে। তাছাড়া গ্রামের আদিবাসী মানুষরা ওকে ভালোবাসে। যার ক্ষেতে যা নতুন ফসল ওঠে ওকে না দিয়ে খায় না। ওদের ভরসায় যেভাবে হোক অনু দুটো বাচ্চা নিয়ে দিন চালিয়ে নেবে। এই অবস্থায় আমি একদান জুয়ো খেলে ভাগ্য পরীক্ষা করে নিতে পারি। যদি দান লেগে যায়–ওদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারব স্বভূমিতে স্বদেশে শিকড়ের কাছে। তাই স্থির করি করব কাজটা।
জীবন আমাকে দিয়ে কত কিছুই তো করিয়ে নিল, ছাগল চড়ানো থেকে ভিক্ষে। যা করেছি মনে একটা বিশ্বাস সর্বদা ছিল, এই শেষ নয়। এরপরও কিছু একটা আছে। অন্ধকারই চরম সত্য নয়–এরপর আছে উজ্জ্বল দিন। এ আমি গভীর ভাবে বিশ্বাস করেছি যে স্থবির হয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমাকে চলতে হবে–আর চলতে চলতে যেখানে গিয়ে থামব অবশ্যই তা হবে মহৎ মঙ্গলময় সুন্দরতম।
আমাদের বেদ উপনিষদ প্রতিটা ধর্মগ্রন্থ বলেছে–প্রত্যেকটা সৃষ্টির পিছনে সৃষ্টিকর্তার নিগূঢ় কোন উদ্দেশ্য থাকে। আস্তিক্যবাদী যদি নাও বা হই তবু আমার অটল ধারণা, আমার জীবনের নিশ্চয়ই একটা উদ্দেশ্য আছে, পরিণতিআছে। সারা জীবন ধরে যে এইকষ্টসাধ্য সঞ্চয় তা একেবারে ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে না।এক না একদিন এই অর্জন কোন না কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-অভীষ্ট পূরণের নিমিত্ত হবে।
হাজার হাজার কুইন্টাল সোনা মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। কজন মানুষ তার কথা জানে? মানুষ জানে আর চেনে সেটুকু যা অলঙ্কার হয়ে সুন্দর অঙ্গের শোভা বাড়ায়। আমার ছেঁড়া থলিতে “সোনা” আছে, ধুলো বালি মাটি পাথর মেশানো। খনি থেকে তোলর পর যেমন থাকে। একে গলিয়ে অলঙ্কার বানাতে হবে। যে সোনা চেনে তার কাছে নিয়ে যেতে হবে। তবে এর যথার্থ মূল্য পাবো। এ কাজ বস্তারের ঘন জঙ্গলে বসে হবে না।
আমি জানি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি একদিন আমার সঞ্চয় সম্পদ জীবনের কাজে লাগবে। অন্ধকার রাতে অকুল দরিয়ায় মাঝি যেমন ধ্রুব তারার দিকে চোখ রেখে নদী পার হয়ে যায়। আমি সেই আশার ছোট চারাটি বুকে আগলে ভবিষ্যতের দিকে চোখ পেতে বসেছিলাম। আজ সেই সুবর্ণ সুযোগ এসে গেছে। যে ভাবেই হোক এসে পৌঁছেছি সেই মানুষদের পাড়ায় যারা সোনাকে সোনা বলে চেনে।
আমি এক সময় গল্প লিখতাম। লেখার কাজটা আমার বড় প্রিয় ছিল। যখন কেউ আমাকে লেখক বলতো ভীষণ গর্ববোধ হতো। মনে হতো আমি একজন শিল্পী একজন স্রষ্টা। বাংলা ভাষার মূল ভূখণ্ড থেকে এতদূরে থাকার জন্য বাংলা সাহিত্য জগতের সঙ্গে সব সম্পর্ক প্রায় ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এবার ছিন্ন হয়ে যাওয়া যোগসূত্রটা আবার নতুন করে স্থাপন করতে পারব। আমার দুর্গ গল্পটা এক সময় খঙ্গাপুরের কাগজ ডুলুংয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। যেটা পড়ে নিয়োগীজি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। উবু দশ পত্রিকার সম্পাদক দণ্ডকারণ্যে চিঠি লিখে তাদের কাগজের জন্য গল্প চেয়ে নিয়েছিলেন। এখন মনে হচ্ছে আমার ভাগ্য যেন আমার জন্য সব দরজা বন্ধ করে এই দিকে ঠেলে এই জন্য নিয়ে এসেছে–আমি যেন আবার লিখি। আমার ভবিতব্য নির্দেশ দিচ্ছে–লেখো। আর তোমার কোন কাজ নেই, বিশ্বের কাজ থাক বিশ্ব পরে, তুমি শুধু লেখো। লিখবে বলেই আমি তোমাকে পরিণত করেছি অভিজ্ঞ করেছি এত অভিজ্ঞতায়। সারাটা জীবন ধরে যে দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনা যা ছিল তোমার একার সঞ্চয়, তার স্বাদ-ভাগ মানুষকে দাও–তাকে শরিক করো। তা যদি পারো তোমার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য সার্থক হবে। শেষ নিঃশ্বাস পড়বার আগে গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারবে–জীবন তোমাকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করতে পারেনি। বলতে পারবে আমি সেই পরম এবং চরম সুখের সন্ধান পেয়ে গেছি, যা পাওয়ার পরে অপ্রাপ্তি অপূর্ণতা বলে তার কিছু থাকে না। জীবন সফল ও সার্থক হয়ে যায়।
আমি তোমাকে সেই সুযোগটা দিয়েছি। বাংলায় থাকার সুযোগ বাংলা ভাষায় লিখবার সুযোগ। বাংলা পত্র পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক পাতাবার সুযোগ। এ সুযোগ গ্রহণ করো।
এটা সেই সময়–যখন সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এমন ঘোরালো হয়ে ওঠেনি। তখন যে এমন সংগঠিত শক্তিমান বামফ্রন্ট সরকার উচ্ছেদ হতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা কারো দুরতম কল্পনাতেও ছিল না। সাধারণ সব মানুষদের ধারণা ছিল এরা আছে এরা থাকবে। সোভিয়েত রাশিয়ার পতন ঘটুক ভেঙে যাক বার্লিনের প্রাচীর। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের লাল দূর্গ টিকে থাকবে অনন্তকাল।
এই ভাবনার বাইরে যে সব লোক, তারা সাধারণ নন–দূরদর্শী প্রাজ্ঞ।
