আমার জাতি পরিচয় শুনে মুখটা বিকৃত হয়ে যায় মাদার কিলারের। আমি এই বর্ণবাদী হিন্দু ধর্মে জল অচল-অচ্ছুৎ। আমাকে ছুঁলে উচ্চবর্ণের লোককে স্নান করে শুদ্ধ হতে হয়।
মনের ক্ষোভ মনে চেপে রাখতে পারেন না মাদার, উগড়ে দেন–ভাই কী আর কোনো রান্নার লোক পেল না। শেষকালে চাড়াল? এখানে সবাই তো আর ছোট জাত নয়। বাচ্চাদের মধ্যে বামুন বদ্যি আছে। তারা কী করে এর হাতের রান্না খাবে?
কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে আমার। এ আমি কোথায় কাদের মাঝখানে এসে পড়লাম। আমি যে জানি বামপন্থীরা কোন্ জাতপাত মানে না। ভাগ্য ভগবান মানে না। বিশ্বাস করে সব মানুষ সমান–সব মানুষ সমান সম্মানীয়। তাহলে এখন এ আমি কী শুনছি! যা শুনছি, কেন শুনছি। হেসে হেসে বলে ওয়ার্ডেন–খেলে কী হবে?
পাপ হবে। বলে মাদার।
আজকাল এসব কেউ মানে না।
যে মানে সে মানে, যে মানে না সে মানে না। ভাই পার্টি করে বলে চাড়াল ডোম মানে না। অজাত কুজাত সবার হাতে খায়। ভাইয়ের বউ কী তা করে? ভাই তো গলায় পৈতে রাখে না পূজার্চনা করে না। বউদি সব করে। ঘরে কত বড় কালী ঠাকুর।
ভাই মানে বড় সাহেব। কয়েক মাস আগে ভাইফোঁটা গেছে। সেদিন মাদার বড় সাহেবের বাড়ি গিয়ে তার কপালে ফোঁটা দিয়ে এসেছে। সেই থেকে তার নাম নয়–ভাই বলে সম্বোধন করছে। এতে মানুষের কাছে কিছু বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
মাদারের পদবি সাহা। সেটা কোনো কুলীন জাতি নয়। তবে উনি দীর্ঘকাল এক নিষ্ঠাবান ভট্টাচার্য বামুনের বাড়িতে কাটিয়ে এসেছেন। যে কুলীন বামুনের পূর্ব পুরুষেরা পুরোহিত দর্পণের প্রণেতা। এটা ঠিক যে এই ভট্টাচার্য পরিবারের কেউ বামপন্থী ঘরানার কিছু কবিতা টবিতা নাটক টাটক লিখেছেন। সেসব একান্তভাবে বাড়ির বাইরের বিষয়। বাড়িতে এনারা পূজাপাট, উপনয়ন, উপবীত ধারণ, শ্রাদ্ধ শান্তি সব ক্রিয়াকর্ম যথাযথ মেনে চলেন। ফলে, লোহা যেমন চুম্বকের সংস্পর্শে থাকলে চুম্বক হয়ে যায়, উনি কুলীন বামুনের স্পর্শ পেয়ে মানসিক দিক থেকে পুরোপুরি ছোঁয়াচে বামনি হয়ে বসে আছেন।
তবে সেটা শুধু আচার-বিচারের ক্ষেত্রে। আহারের ক্ষেত্রে নয়। খাদ্যদ্রব্যের বেলায় উনি আমিষ-নিরামিষ কারও প্রতি ভেদভাব রাখেন না। সবার প্রতি সমদৃষ্টি–সম সমাদর দেখান।
মাদারের মনোভাবে হাসি চওড়া হয়ে যায় ওয়ার্ডেনের। বলে–এখন তাহলে কী করবেন মাসিমা। বড় সাহেব পাঠিয়েছে এখন এতো থাকবে। এর হাতের রান্না যে না খেয়ে উপায় নেই।
বলে মাদার, কী করব সে বুন্ধি আমার আছে।
কী করবেন?
বলব?
বলুন না, শুনি।
অগ্নি সর্বদোষ বিনাশক। আমি ভাত তরকারি নিয়ে আগুনে ফুটিয়ে নেব। আর কোন দোষ থাকবে না।
রোজ ফোটাবেন?
দু-বেলাই।
আপনার কষ্ট হবে।
হোক। ওটুকু কষ্ট আমি পারব।
এর চেয়ে সবাই যে রকম খাবে আপনিও খান। কিছু হবে না। ছাড়েন তো ওসব ছুৎ অচ্ছুৎ।
না না। শেষ বয়সে আর অধর্ম করব না।
এখন মাদার বড় সমস্যায় পড়ে গেলেন। আমি সামনে বসে আছি। সবাই চা খেলে এক কাপ যে আমাকেও দিতে হয়। চা তো অনেক আছে, কাপ নেই। কাপ আছে ছাদের চিলে কোঠায়, রান্না ঘরে। কে এখন সিঁড়ি ভেঙে ছাদে যায়। চারদিকে তাকান তিনি। হঠাৎ তার চোখ যায় একটা জানলার দিকে। আছে, ওখানে একটা ডাণ্ডাভাঙা চটা ওঠা ফাটা কাপ রাখা আছে। এই কাপে জল নিয়ে এক মেদিনীপুরের সিংহ মাস্টার দাড়ি কামায়। সে ছুটিতে বাড়িতে গেছে। কাপটা আছে।
সেই মাস্টার অনেক দিন আগে মেদিনীপুর থেকে এসে সাহেবের বাড়িতে বাজার হাট-রান্না এইসব কাজ করত। উদ্যমী লোক, কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিল। আজকাল তো এমন বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে ভর্তি হলে পাশের গ্যারান্টি থাকে। আর রোজ ক্লাসেও যেতে হয় না, মাসেকী সপ্তাহে একদুবার গেলেই চলে। সেইভাবে সে শিক্ষিত হয়ে ওঠে। ব্যবহারটা তার বড় ভালো। বড় সাহেব তার উপর খুবই প্রীত থাকেন। ফলে এখানে এনে একটা চাকরিতে ঢুকিয়ে দেন। পদটার নাম স্পোর্টস টিচার।
স্পোর্টস-এর মানে ক্রীড়া। এর সাথে শিক্ষাদীক্ষার খুব একটা সংশ্রব না থাকলেও চলে। টিচার তো অতি তুচ্ছ পদ, এই সরকারের প্রথম দিকে এমন একজন লোক ক্রীড়ামন্ত্রী হয়ে গিয়েছিল যে মাত্র এইট পাশ। তার জীবনের সাথে খেলাধূলার কোনো যোগ আছে এমন অপবাদ বোধহয় তার চরম শত্রুও দেবে না। সে ছিল এক নিখাদ মাস্তান। সে যদি মন্ত্রী হতে পারে ইনি মাস্টার হতে পারবেন না কেন? তবে তফাৎ একটা আছে, মন্ত্রীত্ব করতে সার্টিফিকেট লাগে না মাস্টারগিরি করতে লাগে। এ সেটা যোগাড় করেছে। এই জমানায় ওটা যোগাড় করা কোনো সমস্যাই নয়। এই তো কদিন আগে এক কোর্টে প্র্যাকটিশরত পাঁচ ছয় জন উকিল পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেছে যাদের এল.এল.বি. সার্টিফিকেট জাল। কটা ডাক্তারও ধরা পড়েছে যাদের এম.বি.বি.এস ডিগ্রি ভুয়ো। আর জনৈক পবিত্র পেশার এক বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক তো ভুয়ো পি.এইচ.ডি ডিগ্রির জোরে বহাল তবিয়তে চাকরি করে গেলেন বহু বছর। কিছু বাম বিরোধী পুলিশ বামফ্রন্ট সরকারকে বদনাম করার অপচেষ্টায় ধরপাকড় না চালালে এসব গুপ্ত ব্যাপার চির দিন গুপ্তই রয়ে যেত। কাক পক্ষীতে টের পেত না।
এখন মাদার…. আমাকে চা দেবার জন্য সেই স্পোর্ট টিচারের কাপটা বেছে নিলেন। এটা করতে কোনো উচ্চবর্ণ হিন্দুর বিবেক দংশন হবার কথা নয়। কারণ মহান হিন্দুধর্মের পুস্তকাদিতে পরিষ্কার ভাষায় বলা আছে যদি কোনো চণ্ডালকে খাদ্যদ্রব্য প্রদান করা হয় তবে তা করতে হবে ভগ্ন পাত্রে এবং অবশ্যই তা যেন উচ্ছিষ্ট বা ভুক্তাবশেষ হয়।
