মাদার …. কাপে চা ঢালবার আগেই হোস্টেল সুপার এসে গেল। উনি জানতেন তিনি আসবেন। তাই ওয়ার্ডেন এবং সুপারের জন্য দুটো কাপ এনেছেন। নিজের জন্য এনেছেন একটা গেলাস।
এই স্কুলের ছোট বড় সব কর্মচারী সিপিএম দলের কর্মী বা সমর্থক! হয় আগে থেকে তা ছিল নয় পরে দায়ে পড়ে হয়েছে। লোকে ব্যঙ্গ করে বলে হিন্দু যদি মুসলমান হয় তাহলে গরু খাবার যম হয়। আরবি জানে না তাই কোরান পড়তে পারে না, অভ্যাস নেই তাই নামাজ পড়ে না। খিদেয় কষ্ট হয় তাই রোজা রাখতে চায় না। এই অবস্থায় নিজেকে মুসলমান প্রমাণের সহজ পথ কিলো কিলো গরু খাওয়া।
নব্য সিপিএমরাও তাই। পাটি ক্লাসে যেতে মন চায় না। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ নিয়ে মাথা ঘামায় না। পত্র পত্রিকা পড়ে না। মার্কসবাদ কী বুঝতে চায় না। শুধু তাদের একমাত্র কাজ সিপিএম পার্টির পক্ষে জোর গলায় পেঁচানো আর বিরোধীদের বিরুদ্ধে আরো জোরে চেঁচানো। এই দিয়ে প্রমাণ করতে চায় পুরোনোদের চেয়েও আমি কট্টর সিপিএম।
এই ভিড়ে একমাত্র ব্যতিক্রম হোস্টেল সুপার গাইনবাবু। উনি সেই চুল ভেজাবো না গো আমি বেনি ভেজাবো না গোছের পণ করে–আছেন তো সিপিএমের সাথে, সিপিএমের কাজে। তবু নিজের রাজনৈতিক পরিচয় দেবার বেলা বলেন, আমি জাত কংগ্রেসি বাপের ছেলে। আমার রক্ত কংগ্রেসের রক্ত।
সত্যিই হোস্টেল সুপার দক্ষিণবঙ্গের এক প্রাক্তন এম.এল.এ.-র ছেলে। যে সময়ে তিনি এম.এল.এ হন সেই সবদিনের এম.এল.এ-রা আজকের মতো এত চালাক চতুর ছিল না। কিছু এম.এল.এ তো এমন ছিল যারা সম্পূর্ণ নিরক্ষর। টিপছাপ দিয়ে এম.এল.এ ভাতার টাকা তুলত। ফলে তারা জানত না বালি নিঙড়ে কী করে তেল বের করতে হয়।
বহুদিন পূর্বে একখানা ছেঁড়া নবকল্লোলের পাতায় একটা কার্টুন দেখেছিলাম। একজন মোটা লোক ধুতি গেঞ্জি পরে বসে বসে তেলেভাজা ভাজছে। পাশে বোর্ড ঝোলানো, প্রাক্তন এম.এল.এ-এর তেলেভাজা। বক্তৃতার মতোই ঝাঝালো এবং গরম। সেই প্রাক্তনকে কার্টুনে ব্যঙ্গ করা হলেও একটু লুকানো সত্য ছিল। তা এই যে সেই লোকগুলো আজকের নেতাদের মতো শঠ ধূর্ত ছিল না। তাই এম.এল.এ গিরি চলে গেলে ভয়ানক আর্থিক অনটনে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হতো।
আর আজ? এম.এল.এ. তো অনেক বড় পদ! সামান্য পঞ্চায়েত মেম্বার হতে পারলেই ছোটখাটো জমিদারি কিনতে পারে।
ওই প্রাক্তন এম.এল.এ. ছিল সেই শ্রেণির মানুষ যে আখের গুছিয়ে নিতে জানতেন না। ওনার পরে ওই সিটে কংগ্রেস যে প্রার্থী দাঁড় করায় তার কাছে আমাদের বড় সাহেব বিগত দুই নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পরাজিত হয়েছেন। সামনে আর এক নির্বাচন আসছে। কংগ্রেস এমন একটা দল যার মধ্যে উপদলীয় কোন্দল চিরদিন ছিল আছে এবং থাকবে। পরের বারে ভোটে জেতার জন্য বড় সাহেব সাম দাম দণ্ড এবং ভেদ সব কটি ব্রহ্মাস্ত্রের প্রয়োেগ করে চলেছেন। উনি জানতেন বর্তমান কংগ্রেস এম.এল.এ-এর সাথে ওই প্রাক্তন এম.এল.এ-র বিশেষ সদ্ভাব নেই। তা ছাড়া পদ হারিয়ে তিনি বড় অভাবে দিন কাটাচ্ছেন। তাই একদিন গিয়ে ধরলেন তাকে, আপনাকে কংগ্রেস টিকিট দেয়নি। বেইমানি করছে আপনার সাথে। এবার তার বদলা নিন। হারিয়ে দিন কংগ্রেসকে এই সিটে। জিতিয়ে দিন আমাকে। পুরোপুরি তরমুজ হয়ে যান। থাকুন ওই দলে, কিন্তু কাজ করুন আমার। আমি তার উপযুক্ত দাম দেব।
কথাটা তার মনে ধরে। তবে জাতে বাঙাল বর্ণে বামুন রাজনীতিতে সিপিএম। এদের কোন বিশ্বাস নেই। তাই শর্ত রাখে সে–আগে দাম, পরে কাম। এখন তো আপনাদের সরকার। ইচ্ছা করলে আপনি পারবেন। আগে আমার ছেলেকে একটা চাকরি দিন। কথা দিচ্ছি আমি আপনার হয়ে প্রকাশ্যে প্রচারে যাবো।
এই কারণে সেই প্রাক্তন কংগ্রেস এম.এল.এ-এর ছেলে এই স্কুলে হোস্টেল সুপারের চাকরিটা পেয়ে গেছে। সেই যে একদা রামকৃষ্ণ দেব রাণী রাসমণির চাকরি করে পেটের অন্ন যোগাড় করতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে সারা জীবন নিজের ভাগ্যকে আর মা ভবতারিণীকে দোষারোপ করতেন, কী পাপ করেছিলুম যে ছোট জাতের অন্ন খেতে হচ্ছে, ইনিও তেমনই নিজের বাপ আর কংগ্রেসকে দোষারোপ করেন।
চাকরি তো পেয়েছে এম.এল.এ.-র ছেলে। তবে সেই প্রাক্তন যদি চলেন ডালে ডালে আমাদের বড় সাহেব চলেন পাতায় পাতায়। এখনও তিনি সুপারকে কোন নিয়োগপত্র দেননি। সে দেবেন ভোট ফোট মিটে যাবার পরে, প্রাক্তনের সক্রিয় ভূমিকার পর্যালোচনা করে।
সুপার আর ওয়ার্ডেনের জন্য দুটো কাপে চা ঢালবার পরে মাদার… এর চোখে পড়ল আর একটা লোক বসে আছে। এ কে? আগে তো কোনদিন দেখিনি।
বলে ওয়ার্ডেন–বড় সাহেব পাঠিয়েছে। রান্নার লোক।
নাম কী?
প্রশ্নটা আমাকে। আমি জবাব দিই, মনোরঞ্জন ব্যাপারী।
ব্যাপারী। কীসের ব্যাপার তোমাদের? এই রকম পদবি আগে কোনোদিন শুনিনি।
বলি–আগে আমাদের পদবি মণ্ডল ছিল। ঠাকুরদার সময় থেকে বদলে গেছে। কেন তা জানি না।
বামুন না?
না! আমি নমঃশূদ্র।
সে আবার কী জাত? বামুন কায়েত বদ্যি শুনেছি, পোঁদ কাহার বাগদি শুনেছি, চাড়াল শুনেছি, নমোশূদ্র তো শুনিনি।
মাদারের কথা বলার ধরণ আমার ভালো লাগে না। ভালো লাগেনা বামপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত এক সংস্থায় জাত পাত নিয়ে খোঁচাখুঁচি। এই জাতের কারণে এক সময় আমাকে চরম অপমানিত হতে হয়েছিল এক অন্নপ্রাশন বাড়িতে রান্নার কাজে গিয়ে। সে কথা আজও ভুলিনি। এখন আমি সেদিনের মতো দুর্বল নই। প্রতিপক্ষ সামনে পেয়ে তোপ দাগি–আমাদের আগে চাড়াল চণ্ডাল এই সব বলা হতো। এখন নমঃশুদ্র বলা হয়।
